মার্লি যেদিন মারা গেলেন

0
152
বব মার্লে

মূল: রিটা মার্লি ।। অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
অদ্ভুত প্রতিভা তিনি। র‍্যেগেই মিউজিকের বরপুত্র। ক্ষুধা, দারিদ্র, খুন, রাহাজানি, বখাটেপনায় জর্জরিত বস্তি পরিবেশে তিনি এক দারুণ মালি। গান-বাজনায় ফুটিয়েছেন একেকটি আশ্চর্য বনফুল। যে ফুলের সুবাস ছাড়িয়ে গেছে কাটাতারের বেড়া। ভাষার ঘেরাটোপ ছিড়ে হয়ে উঠেছে সার্বজনীন। ফলে, অকালপ্রয়াণের পরও তিনি ও তাঁর গান-বাজনা এখনো পৃথিবীর নানা প্রান্তে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিলি করছে মানবিক পৃথিবীর বার্তা। তিনি রবার্ট নেস্টা মার্লি। মায়ের আদুরে নেস্টা। স্ত্রীর প্রিয়তম বব। আমাদের বব মার্লি।

৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫, জ্যামাইকার স্যান্ট আন প্যারিশের নাইন মাইল অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এবং রাজধানী কিংসটনের অন্ধকারাচ্ছন্ন ট্রেঞ্চ টাউন বস্তির ধূলি-ধুসরতায় বেড়ে উঠে ১১ মে ১৯৮১, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার মায়ামির এক হাসপাতালে ক্যানসার রোগীর বিছানায় চিরতরে চোখ বোঝা এই মহাতারকার ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল? কী করে হালের একদল কিশোর মিউজিশিয়ানের একজন হিসেবে যাত্রা শুরু করে তিনি পরিণত হয়েছিলেন পৃথিবীর আধুনিক মিউজিকের ইতিহাসের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে? মানবতার দোহাইয়ে, আজীবন লড়াইয়ের দৃপ্ত বার্তাগুলো গানে গানে প্রচার করার দুর্নিবার প্রেরণা তিনি কোথায় পেলেন? কী করে জানলেন পরবর্তীকালে আজীবন লালন করা রাস্তাফারাই মতাদর্শের খোঁজ? তাঁর প্রেম, বিয়ে, সন্তান উৎপাদন, গাঁজা ও মাদকাসক্তি, জীবন নিয়ে জুয়া খেলার তরিকা ও পরিণামই-বা ছিল কেমন?

এমন সব প্রশ্নের বোধকরি সবচেয়ে বিশ্বস্ত জবাব দিতে পারবেন তাঁরই প্রিয়তমা প্রেমিকা, একমাত্র স্ত্রী ও প্রথমটিসহ চার সন্তানের জননী অ্যালফারিটা কনস্টানশিয়া রিটা অ্যান্ডারসন, ওরফে রিটা মার্লি [২৫ জুলাই ১৯৪৬–]। দিয়েছেনও রিটা। লিখেছেন স্মৃতিগ্রন্থ ‘নো ওম্যান, নো ক্রাই : মাই লাইফ উইথ বব মার্লি’।

আমেরিকান সাহিত্যিক হেটি জোনসের [১৫ জুন ১৯৩৪–] সহায়তায় লেখা ইংরেজি এই গ্রন্থটির প্রথম বাংলা অনুবাদ– ‘আমার বব মার্লি’ শিগগিরই প্রকাশিত হবে। তার আগে, প্রিয় রক পাঠক, চলুন ওই বইয়ের ‘ওম্যান ফিল দ্য পেইন ম্যান সাফার, লর্ড’ অধ্যায় থেকে জানা যাক ববের শেষ মুহূর্তগুলো…


বব মার্লি
বব মার্লি

১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরে, ফুটবল খেলার সময়, স্পাইক-অলা জুতো পরা এক খেলোয়াড় ববের ডান পায়ের বুড়ো আঙুল মাড়িয়ে দিলো। ইনজুরিটা মারাত্মক হলেও বব পাত্তা দিতে চাইল না। কেননা বব তো ববই; ব্যথাকে সে কখনোই পাত্তা দেয় না। সামনে যত কাজ আছে, যেগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার– সেগুলোর তুলনায় পায়ের আঙুলের এই ক্ষত তো ওর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু না! ফলে ব্যাপারটিকে সে খুব হালকাভাবে নিলো। এই পা নিয়েই এমনকি খেলতেও থাকল। যদিও ডাক্তাররা বলে দিয়েছিলেন, যেন পা’টিকে কিছুদিনের জন্য একটু বিশ্রাম দেয়; দৌড়ঝাঁপ না করে।

অধিকাংশ সন্ধ্যায়ই এ কাণ্ড সবচেয়ে বেশি দেখা মানুষটি আমি: সে বাড়ি ফিরত, নিজের স্নিকার্স ও মোজা খুলে রাখত। এতটাই ব্যথা পেয়েছিল, মাঝে মধ্যে ‘উফ!’ করে উঠত। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, আঙুলটা সারছে না। বারবার বলেছি, ‘বব, দেখে কিন্তু ভালো মনে হচ্ছে না। তোমাকে এইসব [ফুটবল খেলার] জুতো পরা বন্ধ করতেই হবে; ফুটবল খেলা ছাড়তেই হবে কিছুদিনের জন্য।’ সে বলত, ‘ঠিক আছে।’ দুয়েকদিন হয়তো থেমেছেও। কিন্তু তারপরই আবার নেমে পড়ত মাঠে।


‘বব যদি আমাকে ওর আঙুলটা কেটে ফেলে দিতে দেয়, তাহলে এই অসুখটাকে আটকাতে পারব।’

পরবর্তীকালে, ১৯৭৭ সালে সেই একই আঙুলে আবারও ব্যথা পেল বব। এবার নখ উপড়ে গেল। তারপর আক্রান্ত হলো ম্যালিগন্যান্ট মেলানোমায়; পরিহাসের বিষয়, এই অসুখটি কালোমানুষদের বলতে গেলে হয়ই না। কিন্তু ববের মনে হলো, ডাক্তারদের রোগনির্ণয় ভুল হয়েছে। এমনকি ড. বেকন– মায়ামির সেই কৃষ্ণাঙ্গ ডাক্তারটি, যিনি ববকে ভালোবাসতেন, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘বব যদি আমাকে ওর আঙুলটা কেটে ফেলে দিতে দেয়, তাহলে এই অসুখটাকে আটকাতে পারব।’

ডাক্তার আমার সঙ্গে কথা বলার পর ববকে জানালাম। কিন্তু ওর মনে হলো, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। কেননা সে বিশ্বাস করত, সে যদি এটির সম্মতি দেয়, তাহলে পারফরম্যান্স করার সময় আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না: ‘আমি কী করে মঞ্চে উঠব? তারা [দর্শক] নিশ্চয়ই কোনো খোঁড়া লোকের দিকে তাকাবে না!’ আমার সঙ্গে রেগেই কথা বলল সে, যেন আমি ইচ্ছে করে নেতিবাচক কথা বলছি। তাই ভাবলাম, ঠিক আছে, আমার সম্পর্কে ওর এ রকম অনুভব করার জন্য যথাযোগ্য সময় নিশ্চয়ই এটা নয়।

মনে হলো, ওর ইচ্ছেটাকেই আমার সমর্থন করা উচিত। কেননা যখন ওর সবচেয়ে বেশি শক্তি দরকার, সেই মুহূর্তে ওকে আমি দুর্বল করে দিতে চাচ্ছি– আমার সম্পর্কে এমন অনুভূতি ওকে দিতে চাইনি।

কোনোভাবেই সিদ্ধান্তটি আমার উপর থাকেনি। সেই সদাউত্তপ্ত বাড়িতে, সেই সুপারস্টার পরিমণ্ডলে– যেখানে ওর অসুস্থতা নিয়ে নানা গুজব ডালপালা মেলছিল আর লোকজন এসে ওকে এটা-ওটা বলছিল– সেখানে আমার প্রভাব আরও, আরও বেশি সীমিত হয়ে পড়ল। স্বভাবতই কিছু কিছু ব্যাপারে আমি নিজ মন্তব্য জানিয়েছিলাম; কিন্তু নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ্যে এনে ফিসফাস তৈরি করার চেষ্টা করিনি।

ববকে বলা হয়েছিল, ডা. বেকন মিথ্যে বলেছেন। কেবল ওর একটা আঙুলেই একটু সমস্যা হয়েছে, আর সেটা খুব সহসাই সেরেও যাবে। ফলে এই রোগনির্ণয় যেখানে করা হয়েছে, সেই হাসপাতাল থেকে ওর বেরিয়ে যাওয়া উচিত। সে-ও সেটাই করল।

***

বব মার্লি
বব মার্লি

ফলে আমাদের চূড়ান্ত ট্যুরটি এগিয়ে চলল। আমরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক শহর থেকে আরেক শহরে ভ্রমণ করে সেই একই কাণ্ডকীর্তি করে বেড়ালাম– যা করছি প্রায় সাত বছর ধরে। রাতের পর রাত, শহরের পর শহর, ভক্তদের ভীড়, হাজারও মানুষ ছুটে এলো ববকে দেখতে। তাদের কাছে সে হয়ে উঠেছিল স্রেফ একজন গায়কের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। তারা ওর মিউজিকের বার্তা শুনতে চেয়েছিল; জানতে চেয়েছিল– সে আসলে কী বলতে চায়। যা কিছুই সে করেছে, যা কিছুই সে ভেবেছে, যা কিছুই তাকে নিয়ে অন্যরা ভেবেছে– ওর জীবনের সবগুলো দিকই সমীক্ষা করতে চেয়েছিল তারা।

তার মানে, একটা অবাধ ব্যাপার ছিল। বহু লোকেরই সরাসরি আনাগোনা ছিল ওর কাছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে যখন সে এত সহজপ্রাপ্য হয়ে উঠল, দৈহিক ও নৈতিকভাবে আমি ওকে ততই হারাতে থাকলাম। ওর উপস্থিতিকে আমার এ রকম হারিয়ে ফেলার কারণে বহু কিছুর প্রতিই নিজের অনুভূতিও হারিয়ে ফেলতে থাকল সে। মনে হলো, আমার প্রতি ওর শ্রদ্ধাবোধ, ওর মনোযোগ, ওর মূল্যবোধ খুঁইয়ে ফেলেছি।

সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ব্যক্তিগত মানুষদের চেয়ে এইসব পাবলিক ডিমান্ড যখন ওর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল, আমার অবস্থান ওর কাছে তখন আর স্ত্রী নয়, বরং আই-থ্রির একজন সদস্য হয়েই রইল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, এটি পরিস্থিতির ডিমান্ড। সে যে খুব খুশি ছিল, তা নয়। আঙুলটি কোনোদিনই সারেনি ওর। সারানোর জন্য কোনো সময়ই সে রাখেনি।

স্বভাবতই ট্যুরের সময় আমরা আলাদা রুমে থেকেছি। আর সেটি প্রথমদিকে আমার কাছে উপভোগ্যই ছিল। তবে এ বেলা, সাক্ষাৎকার দেওয়াসহ আরও বাড়তি কিছু দায়িত্বভার ছিল ববের। তাছাড়া রেকর্ড কোম্পানিটিই নিয়ন্ত্রণ করছিল ওর দৈনন্দিন জীবন: কখন ঘুমোতে যাবে, কখন ঘুম থেকে উঠবে, কখন খাবে, কখন বের হবে। ফলে বব ছিল বিশ্রামহীন। অপেক্ষাকৃত অধিক চাপের সিডিউল ছিল ওর এ বেলা। যখন কোনো একটি কনসার্ট শেষে বাকি সবাই সকালে খানিকটা বিশ্রাম নিতে পারত, সেখানে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ওকে উঠতে হতো সকাল সাতটায় কিংবা নয়টায়। দুনিয়ার অপর প্রান্ত থেকে যেহেতু ফোন আসত, তারা তাদের সময়মতো ওকে ধরতে চাইত, এমনকি সে মাত্রই ঘুমোতে গেলেও।

জীবনযাপন এভাবে বদলে যাওয়ার ফলে, ওর কাছে নারীরা আসতেই থাকল– ‘এই’ বিউটি কুইন কিংবা মিস ‘এটা’-‘ওটা’! যত শহরেই আমরা গিয়েছি, সবখানেই মিস অমুক-তমুকের সঙ্গে ওকে ফটোশুট করতে হয়েছে। এটা ছিল অ্যালবামের প্রচারণার অংশ: ‘হ্যালো বব, অমুক-তমুকের রানী আপনার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য হোটেলে আসছেন।’ তারপর আমি দেখতাম, নারীটি দিনের বেলা আসত ছবি তুলতে, কিন্তু রাতের বেলাও হাজির হতো, বেডরুমে। এমনকি পরের রাতেও ববের সঙ্গে দেখা করতে চাইত। ওর স্বাস্থ্যের কারণে এটা একটা পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছিল। ওর স্বাস্থ্য নিয়ে নিজের অনুভূতি আমি দমাতে পারছিলাম না।

এ নিয়ে তখনো আমার উৎকণ্ঠা ছিল। এই পুরোটা সময় অসুখটি ক্রমেই ছড়িয়ে গেছে– ঠিক যেমনটা পরবর্তীকালে বলেছিলেন ডাক্তার। প্রতি রাতে পারফরম্যান্সের জন্য বুটজুতা পড়ার কারণে, সেই চাপে আঙুলটির অবস্থা আরও যাচ্ছেতাই হয়ে গিয়েছিল। কখনো কখনো এক রাতে আমাদের দুটি শো-ও করতে হয়েছে। তারপর হাজির হতে হয়েছে শো-পরবর্তী পার্টিগুলোতে। পরের রাতেও একই ব্যস্ততা।

এক রাতের কথা মনে আছে। সম্ভব প্যারিসের ঘটনা। আঙুলে তীব্র ব্যথা নিয়ে, পা টানতে টানতে হোটেলে ফিরেছিল বব। পরের সকালে ডাক্তার না ডেকে কোনো উপায় ছিল না আমাদের। ডাক্তারের সঙ্গে সঙ্গে, পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি ছবিও এলো– বিউটি কুইনের সঙ্গে নৃত্যরত বব। আমি বললাম, ‘এসব করার বাধ্যবাধকতা তোমার সত্যি নাই। নিজের এই বিক্ষত আঙুল নিয়ে, কনসার্টের পর নাচতে যাওয়ার কোনো দরকারই নাই তোমার। আর একান্তই যদি নাচতে যাও, তাহলে স্লিপার পরে যেও।’

বব ও রিটা মার্লি, ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, বিয়ের দিন

একজন মানুষের যেহেতু আত্মসুরক্ষার কথাই সবার আগে ভাবা উচিত, সেই বিবেচনায় তখনই আমি উপলব্ধি করলাম, নিজেকে নিয়ে বব আর একদমই ভাবছে না। এইসব একরাতের সম্পর্ক, এইসব আত্মবিনাশ সম্পর্কে ওকে আমি বলেই ফেললাম, “তুমি যদি ‘এটা’ করো, তাহলে ‘ওটা’ করতে পারবে না; কেননা নিজের একটা দিককে তুমি ভঙুর করে ফেলছ। আর এই ভঙুরতার কারণে তুমি তোমার প্রতিরোধক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। যতই বিশ্রাম নিতে পারো, তোমার জন্য ততই মঙ্গল।’


‘আচ্ছা, তার মানে তোমার ঈর্ষা হচ্ছে এখন! এখন তুমি বউয়ের মতো আচরণ করছ, না?’

সে জবাব দিলো, ‘আচ্ছা, তার মানে তোমার ঈর্ষা হচ্ছে এখন! এখন তুমি বউয়ের মতো আচরণ করছ, না?’

এ রকম বিবাদ আমাদের লাগতই। লোকেরাও ওকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিতে চাইত। কিন্তু তখন নিজেকে বলতাম, যথেষ্ট হয়েছে। আমাকে নিয়ে যদি এত বাজেভাবেই ভাবা হয়, এত বাজে আচরণই করা হয়, তাহলে আমি আর মাথা ঘামাচ্ছি না। তুমি যেহেতু নিজেই নিজের খেয়াল রাখছ না, তার মানে তুমি নিজেকে ভালোবাসো না, বব। আর যদি তুমি নিজেকেই ভালো না বাসো, তাহলে আমাকেও ভালোবাসতে পারবে না। কেননা নিজেকে তোমার ভালোবাসতেই হবে। তুমি নিজেকে যতটা ভালোবাসো, তারচেয়ে বেশি অন্য কোনো মানুষকে তোমাকে ভালোবাসতে দিয়ো না। এটা ভুল। যদিও কিছু সত্যিকারের অনুরাগী আছে– যারা তোমাকে তোমার বার্তার জন্য ভালোবাসে; বাকিরা আসলে ভ্যাম্পায়ারের মতো তোমার রক্ত, তোমার দম চুষে খাচ্ছে। আর তারা তোমাকে ভালোবাসে– এ কথাটি তাদের বলার একমাত্র কারণ, তোমাকে নিয়ে প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় ছাপা হয় খবর।

তারপর বুঝতে পারলাম, এ রকমটা সাধারণত তখনই ঘটে, যখন আপনি শেষ পর্যন্ত নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন। নিজের যতটুকু নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ছিল, সবটুকু খুইয়ে ফেলছিলাম আমি। স্রেফ শুরুর দিকে যে হুমকিটি পেয়েছিলাম, সেটিই আবির্ভূত হলো সাফল্যের সঙ্গে, স্টারডমের সঙ্গে, আর ‘তোমাকে নিয়ে ভাবার মতো সময় আমার নেই’– এই বোধ নিয়ে।

অজুহাতগুলো ছিল : “করার জন্য প্রচুর কাজ জমে আছে আমার, সেগুলো আমাকে ‘করতেই’ হবে, ‘কেউ একজন’ হয়ে উঠতেই হবে, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য টাকা আমাকে কামাতেই হবে। আমাকে এভাবেই কাজ ‘করতে’ হবে।”

যদিও জানতাম বব একটা অভিযানে রয়েছে; তবু সে বিভিন্নভাবেই লাইনচ্যূত হয়ে যাচ্ছিল সেইসব ‘ইয়েস পিপল’দের কারণে– যারা, সে যা-ই করুক, ভুল কি ঠিক, সবসময়ই ওকে বলেছে– হ্যাঁ, বব ঠিকই করেছে। তবু বললাম, ‘আমরা আমাদের স্বপ্নগুলোর মরমী দিকটি খুইয়ে ফেলছি।’

তারপর একটা সময় এলো, যখন পুরো অনুরণনটি বদলাতে শুরু করল। ববের ম্যানেজারের পদ থেকে ডন টেইলর চাকরিচ্যূত হওয়ার পর এর শুরু। এরপর থেকে অ্যালান কোল’কে নিয়ে ট্যুরটি ম্যানেজ করছিলেন ড্যানি সিমস্। সেই ড্যানি সিমস্– যিনি বছরের পর বছর আমাদের ডেমোগুলো ধারণ করে নিয়ে সেগুলো বিক্রি করেছিলেন, এবং শুরুর দিকে ববের প্রকাশনা সত্বের বেশিরভাগ অংশেরই দাবী করেছিলেন। আমি ভাবলাম, ‘আরে, হচ্ছেটা কী?’ ‘আইল্যান্ড’-এর সঙ্গে বব চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর ওর আর্থিক ব্যবস্থাপনীয় সিদ্ধান্তগুলোতে আমি আর অংশ নিইনি।

সব জট খুলতে শুরু করল। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে, আমরা নিউইয়র্কে পৌঁছলাম, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কমাডোরস ব্যান্ডের সঙ্গে একটা শো করতে। গ্রুপের অন্য সদস্যদের ববের কাছ থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা উঠেছিল ডাউনটাউনের গ্র্যামারসি পার্ক হোটেলে, আর সে উঠেছিল সেন্ট্রাল পার্ক সাউথের এসেক্স হাউসে। এ রকমভাবে এর আগে কখনোই আমাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় হোটেল বুক করা হয়নি। পরে শুনেছি, ব্রকলিনের কিছু বারবণিতা, কিছু জঘন্য লোক ট্যুরটির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছিল। ওকে তারা কিছু একটা [মাদক] গ্রহণের কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। যদিও সেটি সে গ্রহণ করেছিল কি না– জানি না।

সেই শো শেষে বব সারাটা রাত জেগেই ছিল– এ কথা পরে আমাকে নিজে বলেছে। পরের দিন সকালে তাকে ফোন করলাম। সেদিন রোববার। আমার জানার ইচ্ছে, সে গির্জায় যেতে চায় কি না। কেননা কোনো শহরে গিয়ে যদি আমরা জানতাম সেখানে ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চ আছে, তাহলে সেখানে রোববারের প্রার্থনায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতাম। ফোন ওঠাল গ্যাবোনের রাজকন্যা পাসকেলিন। ফোন তুলতেই আমি ভাবলাম, বাহ, এই সাত-সকালে সে ওখানে কী করছে? এরপর বব ফোন ধরল। আমাকে জানিয়ে দিল, গির্জায় সে যেতে চায় না। ওর তরফ থেকে এ একেবারেই অস্বাভাবিক ব্যাপার। শুনে মনেও হচ্ছিল না এটা ওর কণ্ঠ। তাই বললাম, ‘কী হয়েছে? সারারাত ঘুমোওনি?’

বলল, ‘একদমই না।’ তারপর বলে যাচ্ছিল সে ঠিকই আছে, কিন্তু গির্জায় যেতে পারবে না; আমার [যাওয়ার] জন্য লিমুজিন গাড়িটি সে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তবু ওর কণ্ঠে এমন কিছু ছিল– যা শোনাচ্ছিল অচেনা ও দূরবর্তী।

স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে বব

মিনি আমার সঙ্গে ছিল। আমার বারবারই মনে হতে লাগল, কিছু একটা ঠিক চলছে না। মিনিকে বললাম, ‘আমরা মনটা কেমন যেন কু-ডাক ডাকছে। তুমি ববের ওখানে গিয়ে দেখ কী চলছে।’ সব মিলিয়েই মনে হচ্ছিল, কিছু একটা গোলমাল যেন।

মিনি আপটাউনে গেল। ববের রুমে, ববের দিকে তাকিয়ে যা দেখেছিল, সেই গল্প মিনি আমাকে বহুকাল পরে বলেছে : সে দেখেছিল ‘সাক্ষাৎ মৃত্যু’! ববকে ওর কাছে ভূতের মতো লাগছিল। পরবর্তীকালে আমি জানতে পেরেছিলাম সেদিনের আসল ঘটনা : সেন্ট্রাল পার্কে দৌড়াতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল বব। নিজেকে ‘চনমনে’ করে তুলতে, বব আর অ্যালান কোল সেদিন জগিংয়ে গিয়েছিল। দৌড়ের মাঝপর্যায়ে ববের হঠাৎ মনে হয়েছিল, শরীর যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে– বলার জন্য সে যখন অ্যালানের দিকে ঘুরতে চাইল, তখন না নিজের মাথা ঘোরাতে পারছিল, না পারছিল মুখে কিছু বলতে; আর পড়ে গিয়েছিল মুখ থুবড়ে। তারপর তারা ওকে ড্যানি সিমসের ডাক্তারকে দেখানোর অপেক্ষা করছিল। তবে বব চাইছিল আমরা যেন পরবর্তী কনসার্টের লোকেশন, পিটসবুর্গের দিকে পা বাড়িয়ে দিই; সে পরে সেখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে।

ববের পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে আমাকে কেউই কিছু জানায়নি– এ ব্যাপারটি খুবই অপমানজনক ও সন্দেহজনক লাগল। কিন্তু পরে ধরে নিলাম, জীবনযাপন এতই বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল, এত বেশি মানুষ আমাদের উপার্জনের উপর পেট চালাচ্ছিল– কাকে কখন কোন খবরটা জানানো দরকার, সেসবে কোনোই নিয়ন্ত্রণ ছিল না ববের। ওর জীবনের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই অন্য লোকেরা নিয়ে নিয়েছিল। আমি নিশ্চিত নই, তবে সম্ভবত সে নিজেও জানত না আসলে কী খাচ্ছে বা কী ফুঁকছে। এখনো জানি না, তবে বছরের পর বছর ধরে এমন প্রচুর কাহিনি শুনে আসছি– যেগুলো আমার অজ্ঞাতসারেই ঘটে চলেছিল।

ফলে যদিও জানতাম কিছু একটা ঠিক চলছে না, তবু পিটসবুর্গে গেলাম আমি। রাতে স্বপ্নে দেখলাম, বব এক বেড়ার ভেতর আটকে আছে– জায়গাটি সম্ভবত কোনো হাসপাতালে, কিন্তু সেটিতে হুকড়া ছিল, আর ওর মাথায় কোনো চুল ছিল না। বেড়াটির কাছে এসে কিছু একটা বলতে চাইল সে। কিন্তু আমাদের দুজনকে আলাদা করে রেখেছিল গ্রিলের মতো জিনিসগুলো।…

ঘুম ভাঙার পর বারবার ভাবতে থাকলাম, বব আমার দিকে সরাসরি তাকাচ্ছিল না; নিশ্চয়ই কিছু একটা এখনো গোপন রয়েছে আমার কাছে। সকাল বেলা ফোনে মার্সিয়া আর জুডিকে জানালাম স্বপ্নটির কথা। তারপর ঠিক করলাম, নিউইয়র্কে ফোন করে খোঁজ নেব– ওখানে কী চলছে। ববের সেখানকার নম্বরটা যখন পেলাম, ফোন তুললেন ফিটজ্ নামের এক জ্যামাইকান সাংবাদিক– যিনি ট্যুরটিতে জনসংযোগের কাজ করছিলেন। যখন বললাম, ‘ফিটজ্, ওখানকার খবর কী?’, তিনি বললেন, ‘কী বলব, ঠিকঠাক মনে হচ্ছে না!’

আমি আঁতকে উঠলাম : ‘ঠিকঠাক মনে হচ্ছে না বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন? ববের কী বালটা ছেড়া যাচ্ছে, বলবেন? কী হয়েছে আমার স্বামীর?’

ফিটজ্ আবার বললেন, ‘আরে, কিছু একটা ঠিকঠাক না; ওরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়।’

এবার আমি অভিশাপ দেওয়া শুরু করলাম। বললাম, ‘শুনুন! আপনারা সবাই ওখানে থাকা অবস্থায়ও ববের যদি কিছু হয়, সবাইকে কিন্তু আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে! কারণ একটা বালের খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে, আর আপনারা কেউই আমার কাছে সত্যটা বলছেন না!’

ফোন রেখে দিলাম। মুষড়ে পড়লাম। প্রবল আতঙ্কগ্রস্ত আমি। এর কয়েক ঘণ্টা পর বব এসে পৌঁছল; আর তারা জানাল, এখন সাউন্ড চেকের সময় হয়েছে। ফলে আমি ট্যুর বাসটিতে উঠে বসলাম; সেখানে বব আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল, দেখতে লাগছিল ভয়ানক ফ্যাকাসে। শান্তভাবে বললাম, ‘বব, কী হয়েছে? শোনো বাবা, আমাকে সত্যটা বলো। তোমাকে সুস্থ দেখাচ্ছে না। কী হয়েছে? রাতে ঘুমোওনি? কী হয়েছে? গতকাল হয়েছিল কী আসলে?’


‘শোনো, ড্যানি সিমসের ডাক্তার আমাকে দেখতে এসেছিল; ডাক্তার বলেছে, আমার ক্যানসার।’

সে আমাকে বাসটির এক কোণায় নিয়ে গেল; বলল, ‘শোনো, ড্যানি সিমসের ডাক্তার আমাকে দেখতে এসেছিল; ডাক্তার বলেছে, আমার ক্যানসার।’

মনে হলো, আমার হৃৎপিণ্ডটা যেন শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে। বললাম, ‘এসব তুমি কী বলছ?’ বললাম, ‘এখানে কিছু একটা গোলমাল আছে, কেউ নিশ্চয়ই তোমাকে কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা করছে। চলো, আমরা বাড়ি ফিরে যাই।’

আমি তক্ষুণি বাড়ি চলে আসতে চেয়েছিলাম। এত বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, বাকি সবার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেয়েছিলাম। কেননা আমি বুঝতে পারছিলাম না– আমাদের ঘিরে থাকা লোকগুলোর মধ্যে কে শত্রু আর কে বন্ধু।

লাফ দিয়ে বাস থেকে নেমে গেলাম আসি। খুঁজতে থাকলাম মার্সিয়া আর জুডিকে। ওদেরকে ঘটনাটা বললাম। আমরা সবাই একইসঙ্গে প্রচণ্ড ক্রুব্ধ হয়ে উঠলাম : ‘ভাবতে পারো, বব আমাকে এখন এ কথা বলছে, অথচ কেউ আমাদের জানায়ইনি?’

নিশ্চিতভাবেই এ নিয়ে সবাই এক ধরনের দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিল; তবু বব জানাল, যেভাবে হোক সেই রাতের কনসার্টটা তারা করবেই।

কিন্তু আমি বললাম, ‘না, তুমি এটা করো না!’ ড্যানি সিমস্কে খুঁজে বের করে বললাম, ‘আপনার এত সাহস হলো কোত্থেকে! এটা কি কোনো খেলা? কীভাবে এটা করছেন?’

তারপর খুঁজে বের করলাম অ্যালান কোলকে। বললাম, ‘আসলেই ঠিক হচ্ছেটা কী? আমাকে বলো!’ তারপর, অবশেষে তারা জানাল, ডাক্তার তাদের বলেছেন, ববের আঙুলে যে ম্যালিগন্যান্সি হয়েছিল, সেটি ওর মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েছে; যেকোনো মুহূর্তে মারা যাবে সে। তাই ওর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা এই ট্যুর চালিয়ে যাবে।

রাগে ফেটে হয়ে পড়লাম আমি। বললাম, ‘না!’ তারপর, যদি আমার কোনো বাড়তি শক্তির প্রয়োজন হয়– সেজন্য দৌড়ে গিয়ে ফোন করলাম ববের মাকে। তাঁকে বললাম, ‘দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন, দয়া করে ওদের ফোন করুন এবং হস্তক্ষেপ করুন।’ ডায়ান জবসন, ক্রিস ব্ল্যাকওয়েল, এবং ববের ব্যবসায়িক আইনজনীবি ডেভিড স্টেইনবার্গকেও একই কথা বললাম। এমনকি মায়ামিতে ডা. বেকনকেও ফোন করলাম। তিনি বললেন, এ রকম একটা সংবাদের অপেক্ষা তিনি করছিলেন; অসুখটিকে আসলে রোখা যেত; এভাবে বাড়তে দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না।


‘তোদের এখনই এই শো বন্ধ করতে হবে! এক্ষুনি! স্টপ! স্টপ! স্টপ! স্টপ! স্টপ!’

আমি একেবারেই বিপর্যস্ত। দৌড়ে ড্যানি ও অ্যালানের সামনে এসে চিৎকার করতে থাকলাম, ‘আমরা এটা চলতে দিতে পারি না; পাগল নাকি! তোদের এখনই এই শো বন্ধ করতে হবে! এক্ষুনি! স্টপ! স্টপ! স্টপ! স্টপ! স্টপ!’

***

বব মার্লি

মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটারিং ক্যানসার সেন্টারে ববের চেকআপ করানো হলো। সেখানে ডাক্তাররা ওকে রেডিয়েশন ট্রিটমেন্ট দিলেন। ফলে ওর কপাল ও কপালের দুদিকের চুল পড়ে গেল। সিন্ডি ব্রেকস্পিয়ার নিউইয়র্কে এলো। সেখানে সে আর আমি সময় ভাগাভাগি করে বাচ্চা ও ফুফুর সঙ্গে ববের দেখভাল করতে থাকলাম। কিন্তু বব যে সেখানে আছে– সেই খবরটা ফাঁস হয়ে গেল; আর ছড়িয়ে পড়ল রেডিও ও নিউইয়র্কের পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে। ফলে ওকে নিউইয়র্ক থেকে মায়ামির একটি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলো– চিকিৎসা কিংবা রোগমুক্ত হওয়ার ইতিবাচক কোনো আশ্বাসের আশায়। কিন্তু সবাই ওকে বলতে থাকল, বড়জোর আর কয়েক মাস বাঁচবে; ক্যানসারটি ওর যকৃৎ, ফুসফুস আর মস্তিষ্কে ছড়িয়ে গেছে, এবং আরও ছড়িয়ে যাচ্ছে।

আবার স্লোয়ান-কেটারিংয়ে ফিরে এলো বব। কেমোথেরাপি দেওয়া হলো। ওর জটাচুল ঝরে পড়তে থাকল– টুপটুপ। বব বলল, ‘এ তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার; এগুলো আবার গজাবে তো?’

চিকিৎসকরা বললেন, ‘আরে হ্যাঁ, গজাবে, গজাবে!’ হু-হু করে শুকিয়ে যেতে থাকল সে। মনে হলো, ধীরে ধীরে যেন একেবারেই একটা অন্য মানুষ হয়ে যাচ্ছে।

৪ নভেম্বর ১৯৮০, সকালে ব্যাপটিজমের জন্য ডাকা হলো ওকে। আমাদের সব সন্তানেরই [শুধু আমার সন্তানদেরই শুধু নয়] ব্যাপটাইজ যেহেতু ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চে করানো হয়েছে, আব্বা মান্দেফ্রোকে যেহেতু মহামান্য সম্রাট হাইলে সিল্লাসি জ্যামাইকায় পাঠিয়েছেন, ফলে আমি ববকে ব্যাপটাইজড হতে বললাম। সেদিন সকাল বেলা মান্দেফ্রোকে খবর পাঠানোর জন্য আমাকে বলার সময় কাঁদছিল বব। আমরা সবাই কাঁদছিলাম আসলে। ব্যাপটাইজের পর ববের একটা নতুন নাম হলো– বের্হানে সিল্লাসি; এর অর্থ– ‘ট্রিনিটির আলো’।

এর অল্পকাল পর, টুয়েলভ ট্রাইভস সদস্য ও জ্যামাইকান চিকিৎসক ডা. কার্লটন ফ্রেসার পরামর্শ দিলেন, অ্যাডভান্সড ক্যানসার চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ, জার্মান ডাক্তার ডা. ইয়োসেফ ইজেলসের কাছে যেন বব একবার যায়। বাচ্চাদের ও ফুফুর খোঁজ নিতে এবং পরিস্থিতিটির ভয়াবহতা সম্পর্কে ওদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে আমি তখন জ্যামাইকায় এসেছিলাম। ওদের কাছ থেকে যখন বিদায় নিলাম, সেই সময়ের মধ্যে ববকে জার্মানির একটি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ফেললেন ডা. ফ্রেসার ও অ্যালান কোল। ফোন করে যখন ওর সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম, আমাকে জানানো হলো, ওর টনসিল কেটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি ছাড়া আর কার’ অধিকার আছে এ রকম কিছু করার অনুমতি দেওয়ার, আমাকে বলা হলো, অনুমতিটি দিয়েছে অ্যালান কোল সাহেব।

আমার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘কেন সে এটা করল?’ কেননা আমার মনে হয়েছিল, চিকিৎসকরা যদি একবারও ববের টনসিলে হাত দেয়, তালে সে কণ্ঠস্বর হারাবে; ওর পক্ষে আর কখনো গান গাওয়া সম্ভব হবে না; আর তারা আসলে এ কাজটিই করতে চেয়েছে।
আমার অজ্ঞাতসারে কিংবা আমার অনুমোদন ছাড়াই তারা ওর টনসিল ফেলে দেওয়ার পরদিন আমি জার্মানিতে পৌঁছলাম। জানতে পারলাম, ডা. ইজেলসের চিকিৎসাপদ্ধতিরই অংশ এটি। অর্থাৎ শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে হলে পর্যায়ক্রমে আক্রান্ত টনসিল ও ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁতগুলো ফেলে দিতে হবে।

তবু আমার মনে হতে থাকল, আমি ‘বিশ্বাস করতে’ থাকলাম, ববের কণ্ঠনালীতে অস্ত্রোপচার করার বিষয়টিই ছিল ‘শয়তানের’ চাহিদার তালিকার প্রথম নম্বরে; সেই ‘অপদেবতা’ চেয়েছিল– ওর যা কিছু বলার, তা যেন ওর কণ্ঠ থেকে আর বের না হয়। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে এ বেলা আমার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল।


‘রিটা, তুমিই বলো, যদি তোমরা দুজনই একসঙ্গে ডুবতে থাকো, কাকে আগে বাঁচাব আমি– আমার মাকে নাকি তোমাকে?’

আমি তখন ওকে দেখতে গিয়েছিলাম ওর মাকে সঙ্গে নিয়ে। তিনিও একই দিনে সেখানে এসে পৌঁছেছিলেন। আমাদের মুখ দেখে ওর মুখটা হাসি-হাসি হয়ে ওঠল। ফিসফিস করে জানাল, আমাদের দুজনকে নিয়ে গতরাতে সে একটা স্বপ্ন দেখেছে; আর এ বেলা, সে হেসে উঠে বলল, ‘আর এখনই তোমরা দুজনই একসঙ্গে এলে!’ স্বপ্নে সে দেখেছিল, আমরা দুজনই একসঙ্গে ডুবে যাচ্ছি; কিন্তু আমাদের মধ্য থেকে কাকে সে বাঁচাবে– বুঝে ওঠতে পারছিল না। বলল, ‘রিটা, তুমিই বলো, যদি তোমরা দুজনই একসঙ্গে ডুবতে থাকো, কাকে আগে বাঁচাব আমি– আমার মাকে নাকি তোমাকে?’

মা সিডেলা বুকারের সঙ্গে বব মার্লি, জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে

এ কথা শুনে আমি হেসে ওঠলাম। ওর মা-ও হেসে ওঠলেন। বললাম, ‘তুমি তো জানো, আমাদের দুজনকেই তোমার বাঁচাতে হবে।’ তারপর আমরা তিনজন একসঙ্গে হাসতে শুরু করলাম। ওকে আমরা নিশ্চয়তা দিতে চাইছিলাম, সত্যিকার অর্থেই কখনোই ওকে আমাদের ছেড়ে চলে যেতে দেব না। সেই সকালটির কথা কোনোদিনও ভুলব না আমি। কেননা সেই মুহূর্তটি থেকে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, সবকিছুই স্রেফ ক্রমপতনের দিকে যাচ্ছে।

ঠিক সেই রাতেই, যখন আমি হাসপাতালটিতে আবার গিয়ে হাজির হলাম, দেখলাম, ওর চোখে-মুখে ভীষণ উদ্বেগ। আমার হাত ধরে বলল, ‘জ্যামাইকার দিনগুলোতে কেন তুমি এত এতদিন আমার কাছ থেকে দূরে দূরে ছিলে?’ কেননা যদিও আরও বহু কিছুই ঘটছিল তখন, তবু তখনো সে আমার দিকে একটি সুনির্দিষ্ট শক্তির জন্য তাকাত। ওর কাছে আমি একটি স্তম্ভ হয়েই রয়ে গিয়েছিলাম। যখন পাশে থাকতাম না, ওর মনে হতো, বাকি লোকগুলো যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারে ওকে নিয়ে; কিন্তু যদি রিটা থাকে, কিছু জিনিস সে কিছুতেই করতে দেবে না। কিছু জিনিসের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবেই রিটা তর্ক তুলবে।

যদিও [ববের জীবনে] এতসব নারী ও এ সংক্রান্ত নানাবিধ দিক থাকা সত্ত্বেও, আমি বরাবর ছিলাম এ রকমই। বব আমাকে জানাল, সিন্ডিকে সে বলে দিয়েছে যেন তাকে আর দেখতে না আসে। পাসকেলিনের সঙ্গে দেখা করেছিল সিন্ডি; জেনেছে ববের সঙ্গে পাসকেলিনের দেখা-সাক্ষাৎ হয় [এ খবরটি পত্রিকায় প্রকাশিত]।

বব মার্লি ও সিন্ডি ব্রেকস্পেয়ার

এ কথা জানার পরপরই আরেক লোককে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে সিন্ডি; বিয়েটি হবে তিন মাস পর। ফলে এই দৃশ্যপট থেকে সিন্ডি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। আর পাসকেলিনও সহসাই সরিয়ে নিয়েছে নিজেকে। আমার ধারণা, এসব নারী পাশে থাকলে, পরিস্থিতিটিকে কিছুতেই এতটুকুও স্বাভাবিক লাগত না; কিছুতেই কোনো রকম স্বস্তি হতো না আমার, এবং সম্ভবত তাদেরও হতো না।

এরপর থেকে, জ্যামাইকা আর জার্মানিতে আসা-যাওয়ার মধ্যে দিন কাটতে থাকল আমার। আসার সময় ববের জন্য ওর সবচেয়ে পছন্দের নানা জিনিসপত্র নিয়ে আসতাম, যেগুলো ওর জন্য স্বাস্থ্যকরও– যেমন, মিষ্টি আলু ও ডেশাইন। ডা. ইজেলসের চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্যে এ ধরনের খাবার যুক্ত ছিল; আবার, ‘রাস্তা’রাও বিশ্বাস করে, খাবার হিসেবে এগুলোই শ্রেয়। অবশ্য চিকিৎসাটির অন্য দিকগুলো আমার পছন্দ ছিল না। যেমন, প্রতিদিন সকালে ববকে আমরা ইজেলসের ক্লিনিকে নিয়ে যেতাম পরিমাণমতো রক্ত বের করা, তারপর আবার রক্ত ভরে দেওয়ার জন্য; বব সত্যি সত্যি নিজেরই রক্ত শরীরে ফিরে পাচ্ছে কি না– এ নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। তবু ডা. ইজেলস ববকে অন্যান্য ডাক্তারের অনুমানের চেয়ে বেশি, ছয় মাসেরও অধিককাল বাঁচিয়ে রেখেছিলেন; যদিও নিজের সেরাটা চেষ্টা করা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিশ্রুতি এ ব্যাপারে তিনি দেননি।

১৯৮১ সালের বসন্তকালে জানিয়ে দিলেন, তাঁর পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব ছিল, সবটাই প্রয়োগ করে ফেলেছেন; এবার আমরা যেন ববকে বরং বাড়ি নিয়ে যাই।

এ ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন আমি জ্যামাইকায়। বব ফোন করে জানাল, সে নিজের সন্তানদের, মায়ের আর আমার একান্তই কাছাকাছি থাকতে চায়; ফলে আমার আর জার্মানিতে ফেরার দরকার নেই, বরং আমি যেন সব সন্তানকে মায়ামিতে নিয়ে আসি– সে আসলে সেখানেই চলে যাচ্ছে। তার মানে, একেবারেই শেষ কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল সে; তবু ছিল দৃঢ়চেতা। নিজেকে মায়ামি পর্যন্ত ফিরিয়ে নেওয়ার দম ধরে রেখেছিল নিজের ভেতরে– যা তাকে তার সন্তানদের দেখার, এবং তাদের নানা দিকনির্দেশনা দেওয়ার, এবং তাদের এ কথা বলার সুযোগ দেবে– সে সবসময়ই ওদের ঘিরে থাকবে।


‘টাকা দিয়ে জীবন কেনা যায় না’

এক পর্যায়ে জিগি আর স্টিভকে ডাকল সে সেই রুমটিতে, যেখানে শুধু পরিবারের লোকজনেরই প্রবেশাধিকার রয়েছে। স্টিভকে বলল, ‘টাকা দিয়ে জীবন কেনা যায় না’; আর জিগিকে বলল, ‘তোমার উত্থানের পথে, প্লিজ, আমাকেও উত্থিত রেখো; কিন্তু তোমার পতনের পথে, আমার পতন ঘটিও না।’ দুটি বাচ্চাই বলল, ‘আচ্ছা, আব্বু।’

১১ মে, খুব ভোরবেলা, মায়ামির সেই হাসপাতালটি থেকে ডায়ান জবসনকে ফোন করে বব বলল, ‘তুমি তো জানোই ডায়ান, আমার কিছু একটা হয়ে গেলে আসলে কী কাণ্ড ঘটবে? ডাক্তাররা যেমনটা বলছেন, আমি নাকি মারা যাচ্ছি; যদি তা-ই হয়, কী হবে তাহলে?’

ববের শেষকৃত্যে স্ত্রী রিটা, দুই পুত্র জিগি [বাঁয়ে] ও স্টিভ

ডায়ান যখন ‘কিছুই হবে না’ জবাবটি দিলো, বব বলল, ‘আরে আজব, একটু তো আইন দেখাও!’ সে আসলে মেয়েটিকে বলছিল এ ঘটনাটির [তার মৃত্যুর] আইনি দিক নিয়ে কথা বলতে। আমি কসম কেটে বলতে পারি, এ কথাটি সে ডায়ানকে বলেছে, নিজের পক্ষে যতটুকু শক্তি জড়ো করে, যতটুকু ফিসফিসিয়ে বলা সম্ভব।

সম্প্রতি ডায়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বব ওকে যে কথাটি বলেছিল, ওর তা মনে আছে কি না। কেননা ‘একটু তো আইন দেখাও’ মানে, কিছু ব্যাপারে সে নিশ্চয়তা পেতে চেয়েছিল, যেমনটা সে আগেই বলেছে, “লোকে যেটাকে ‘উইল’ বলে, এমনতরো কিছু আমি লিখে যেতে চাই না।” সেই ভোরবেলা ডায়ান বলেছিল, ‘আরে না, তোমার স্ত্রী আর সন্তানরাই হবে আসল অংশীদার; আমি নিশ্চিত, রিটা তোমার মায়ের খেয়াল রাখবেন।’

কিন্তু ববের আইনি উপদেষ্টা হিসেবে ডায়ান যদি তখন শুধু বলত, ‘দাঁড়াও, আমি লিখে দিচ্ছি, তুমি স্রেফ স্বাক্ষর করলেই চলবে’, তাহলে হয়তো কোটি কোটি ডলার বাঁচাতে পারতাম আমরা। ফলে যা পাইনি, তা হয়তো পেতে পারতাম; কেননা মারা যাওয়ার সময় বব মোটেও কোটিপতি ছিল না, যদিও লোকজন তা-ই ভাবে। বব নিশ্চিতভাবেই জানত, সে তার কাজ ঠিকই করে গেছে; যা রেখে গেছে তা আমাদের জন্য যথেষ্ট।

***

সেই শেষদিন, দুপুরের খানিকটা আগে, আমি ওকে খাওয়ানোর জন্য ক্যারট জ্যুস আনতে গিয়েছিলাম। যখন ফিরে এলাম, দেখি– ওর চোখ বন্ধ। ডাক্তার বললেন, ‘সব শেষ’। আমি চিৎকার শুরু করলাম, ‘শয়তানের কাছে হাল ছেড়ো না, বব! জাহের (স্রষ্টা) কাছে সঁপো নিজেকে। তোমার আত্মার ভেতর শয়তানকে দিও না কোনো শক্তি মেশাতে! হাল ছেড়ো না, বব, থেমে যেও না; সোজা চলে যাও স্বর্গের সর্বোচ্চ আসনে!’

নিজের কোমরে থাকা লাল, কালো ও সবুজ রঙের ব্যান্ডটি আমি খুলে ফেলে ওর মাথায় বেঁধে দিলাম; আর চিৎকার করে বাইবেলের স্তবগুলো পড়তে থাকলাম, যতক্ষণ না ডাক্তারটির কণ্ঠ ভেসে এলো কানে : ‘আমরা বরং এই ভদ্রমহিলাকে শান্ত করি!’ এরপর আমার শুধুই মনে আছে, আমাকে তাঁরা একটা ইনজেকশন দিলেন, আর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে দেখি, বব রুমে নেই। তখনই বুঝতে পারলাম, কী ঘটে গেছে।


‘আব্বু বলেছে, কাঁদবে না, নারী তুমি কাঁদবে না’

শেষ বিকেলে, আমি যদিও একেবারেই বিমর্ষ, তবু স্টিভ বলল, “আম্মু, তোমার মনে নাই আব্বু কী বলেছে? ‘নো ওম্যান, নো ক্রাই’! আব্বু বলেছে, কাঁদবে না, নারী তুমি কাঁদবে না। তাই চলো, আমরা জ্যামাইকায় চলে যাই।”

ফলে আমি আর স্টিভ একটা বিমানে চড়লাম : সন্ধ্যায় ছয়টায়– মায়ামি থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ বিমান। আর বিমানবন্দর থেকে সোজা চলে গেলাম পাহাড়চূড়ার সেই বাড়িটায়, যে বাড়িটি আমাদের শেষ ট্যুরে বেরিয়ে পড়ার আগেই নিজের করে নেওয়ার সুযোগটা আমি পেয়েছিলাম।

বব মার্লির শেষকৃত্য
Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here