ফ্রেডি মার্কারির জার্নাল [১]

0
57

লিখেছেন: ফ্রেডি মার্কারি
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের ভূমিকা
ফ্রেডি মার্কারি [৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬–২৪ নভেম্বর ১৯৯১]। মিউজিক দুনিয়া উলট-পালট করে দেওয়া ব্রিটিশ রকস্টার। ‘কুইন’ ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান। অতি আলোচনা ও সমালোচনামুখর নাতিদীর্ঘ জীবনে নিজেকে পরিণত করে গেছেন রক মিউজিক দুনিয়ার দুর্ধর্ষ কিংবদন্তিতে। তার আত্মকথনমূলক লেখালেখি নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে ‘অ্যা লাইফ, ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস’ নামে একটি বই। ২০০৬ সালে বইটি প্রথম প্রকাশ করে মার্কারি সংস লিমিটেড। সে বইয়ের ধারাবাহিক অনুবাদের প্রথম কিস্তি হাজির করা হলো এখানে…


কুইন

অধ্যায় ১: যে নিখুঁত স্বপ্ন ছিল আমার

আমি কোনো তারকা হবো না; বরং হবো কিংবদন্তি! আমি হতে চাই রক অ্যান্ড রোলের রুডলফ নুরিয়েভ [সোভিয়েত ব্যালে ড্যান্সার]!

শুরুর দিকে উপবাসে থাকার যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছিলাম; থেকেছিও। আর সেটিই আমাকে সামনে আগানোর রাস্তা করে দিয়েছে। নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবেই আপনাকে– লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কতটুকু সময় লাগবে, সেই ভাবনা পাত্তা না দিয়ে।

কুইন যখন প্রথম গঠন করা হলো, আমাদের লক্ষ্য ছিল চূড়া ছোঁয়ার; এরচেয়ে সামান্যতম নিচুতেও নিজেদের অবস্থান ভাবতে পারছিলাম না। এই কর্মে [মিউজিক দুনিয়ায়] সেই জায়গা পেতে চাইলে আপনার ভেতর প্রচুর আত্মবিশ্বাস থাকতেই হবে।

আপনার সেটি দরকার নেই– এমনতর কথা বলা আসলে অর্থহীন। কেউ যদি বলতে শুরু করে, ‘আমি বোধহয় যথেষ্ট যোগ্য নই, আমার বোধহয় দ্বিতীয় স্থানেই থিতু হওয়া শ্রেয়’, তাহলে সে কথা ভুলে যান। আমরা ছিলাম আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর। আপনার ভেতরও তা-ই থাকা চাই। আপনার ভেতর এক ধরনের ঔদ্ধত্য ও প্রচুর আত্মবিশ্বাস এবং নিখাদ সংকল্পের পাশাপাশি আরও থাকা চাই মিউজিকের মতো অন্যান্য ক্ষেত্রে নিশ্চিত দক্ষতা। যাত্রা শুরুর কালে ঔদ্ধত্য খুবই ভালো জিনিস; তার মানে, নিজেকে আপনার বলতে হবে, আপনারা হতে যাচ্ছেন এক নম্বর গ্রুপ [ব্যান্ড], দ্বিতীয় স্থানের গ্রুপ নয়। এই বোধ আমাদের ভেতর নিবিড়ভাবে বাসা গড়েছিল। আমাদের প্রত্যেকেরই ছিল বিরাট অহংবোধ।


লোকজনকে জানান দিতে
চেয়েছিলাম, আমরা
এমন একটি
ব্যান্ড–
যেটিকে গোণায় ধরতে হবেই

এ ব্যাপারে আমরা ছিলাম ভীষণ একরোখা। লোকজনকে জানান দিতে চেয়েছিলাম, আমরা এমন একটি ব্যান্ড– যেটিকে গোণায় ধরতে হবেই। আর সেজন্যই আমাদের ছিল মৌলিকত্ব দেখানোর এতসব আইডিয়া।

আমরা এক ধরনের সাংঘাতিক মিউজিক দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম; আপনি চলে এসেছেন– সেটি আমজনতাকে জানান দেওয়ার জন্য এরচেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে? লোকেদের চোখের ভেতর ক্রোধ ও হতবিহ্বলতার মূল্যবোধ সবসময়ই থাকে; আর সেটি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা আপনাকে করতেই হবে। শরীরে কোনো পোশাক নেই, প্রচুর মেক-আপ লাগানো, আঙুলের নখে কালো রঙ এবং ইত্যকার আরও বহুকিছু দিয়ে অ্যালবামের প্রচ্ছদ করেছিলাম আমরা। সে সময়ে এ ছিল ভয়ানক রকমের হতবিহ্বল করে দেওয়ার মতো কাণ্ড।

ফ্রেডি মার্কারি

গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি সব সময়ই একটি ভীষণ অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে আমি মনে করি। যেখানে কিংবা যেভাবেই সেটি কল্পনা করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সেটির মধ্যে আপনি নিজের প্রবৃত্তি গড়ে তুলুন। এটি হয় এমন এক গিমিক হয়ে উঠবে– যেটি কোনো কাজেই লাগবে না; নয়তো এটি আপনার ইচ্ছেমতো খেলার খেলনায় পরিণত হবে। এ সবই কর্ম-কৌশলের ব্যাপার। একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ঔদ্ধত্য ও অহংকার থাকার দরকার পড়েই।

আমাদের ব্যান্ডটি যখন প্রথম সম্পূর্ণরূপে গড়ে ওঠল, আমার ধারণা, বেশিরভাগ লোকই টাস্কি খেয়ে গিয়েছিল; কেননা, তারা ভেবেছিল, পপ গ্রুপগুলো সাধারণত মাথামোটা প্রাক্তন ট্রাক ড্রাইভাররা মিলে গড়ে তোলেন, যারা নিজেদের জীবন নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তারচেয়ে বরং নিজেদেরকে পপ-তারকা হিসেবে শীর্ষে জায়গা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা ছিলাম সেই ব্যান্ডগুলোর একটি– যারা কাজের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ দিতে চেয়েছিলাম। আমরা সেটাই করছিলাম। আর জানতাম, তা পারব।


নিজেদের
দ্বিতীয় সেরার
তালিকায় দেখার
মতো প্রস্তুত করতে
রাজি ছিলাম
না

মিউজিক আঙিনায় আমরা স্রেফ গান-বাজনা করে বেড়াচ্ছিলাম না। আমরা বলেছি, ‘ঠিক আছে, আমরা রকের দুনিয়ার ডুবে যাচ্ছি এবং আমরা আসলে এই কাজ পুরোটাই করতে চাই– আধাআধি নয়।’ তখনো আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র; আমাদের সবারই ছিল দারুণ ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা; অন্যান্য ক্ষেত্রে যত যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম, সবগুলো পরিত্যাগ করে দিতে হলেও আমরা নিজেদের দ্বিতীয় সেরার তালিকায় দেখার মতো প্রস্তুত করতে রাজি ছিলাম না। বরং হতে চেয়েছিলাম সবার সেরা। এ আদৌ দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরাতে চাওয়ার বিষয় নয়; যদিও আমি জানি, এটি সম্ভবত পুঁজিবাদের মাধ্যমে আসে।

টপ স্লটে পৌঁছানোর লক্ষ্য ছিল আমাদের; এরচেয়ে কম কিছুতে তৃপ্তি পেতে ছিলাম নারাজ। আমাদের মধ্যে কেউই কোনো ৯টা-৫টার চাকরি করতে চাইনি। আমি নিশ্চিতভাবেই জানতাম, মিউজিকের প্রশ্নে আমাদের মধ্যে সবকিছুই রয়েছে। আমরা ছিলাম যথেষ্ট মৌলিক; আর সেটি প্রমাণ করতে শুরু করেছিলাম। “ঠিক আছে, আমরা ‘এটা’ করতে যাচ্ছি; যদি কাজ না করে, তাহলে ‘অন্য কোনোটা’ চেষ্টা করে দেখব,” এমনতর কথা বলা ধরনের ব্যান্ড আমরা ছিলাম না। একদমই না। সে পথ বরং ভুল। পুরো ব্যাপারটি সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট সিরিয়াস না থাকলে কোনোদিনই মিউজিক দুনিয়ায় নাম লেখাতাম না। আমরা প্রথমে আমাদের কোর্সগুলো শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম; তার মানে, দেড় বছরের মতো অপেক্ষায় থাকা: এই সময়কাল জুড়ে যদি সব সদস্য একসঙ্গে টিকতে পারি, এর মানে দাঁড়াবে, আমরা সিরিয়াস।

সে সময়ে আমরা বলেছিলাম, ‘ব্যাপারটিকে ইন্টারেস্টিং করে তোলা যাক। আমরা যত ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতা অর্জন করেছি, সবগুলো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা চালানো যাক।’ উন্নাসিক আমরা ছিলাম না; বরং ছিলাম ভীষণ সতর্ক। রুচিশীল হিসেবে দৃশ্যমান হতে চেয়েছিলাম। এমনকি যদি আমরা আদৌ ‘কেউ’ না-ও হয়ে থাকি, তবু অনুভব করেছিলাম, আমাদের এভাবেই আবির্ভূত হওয়া দরকার। আমার ধারণা, ব্যাপারটি আসলেই উন্নাসিক ছিল! কুইনকে আমরা সব মানুষের ব্যান্ড নয়, বরং স্রেফ নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ব্যান্ড হিসেবে যাত্রা শুরু করাতে চেয়েছিলাম।

শুরুর দিকে আমি জানতাম, একদিন আমরা বিরাট আকার ধারণ করব; করেছিও। এ ব্যাপারে আমার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। কোনোদিনই না। স্রেফ জানতাম, আমরা এটা পারব; কেউ জিজ্ঞেস করলে এ কথাই বলতাম। এ কাজে আপনার মনে এ ধরনের আত্মবিশ্বাস থাকতেই হবে। আপনি যদি চূড়ায় পদচিহ্ন রাখতে চান, সবকিছু সেভাবে গোছাতে চান, তাহলে তা অর্জন করতে আপনার ভেতর আত্মবিশ্বাস থাকা চাই-ই।

এই ব্যান্ডে মানবিক বিভাগ থেকে আসা একমাত্র সদস্য আমি। বাকি সবাই বিজ্ঞান বিভাগের; রজার জীববিজ্ঞানের, জন ইলেকট্রনিকসের, আর ব্রায়ান পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। আমি আমার সবচেয়ে উন্মত্ত স্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারিনি, ব্রায়ানের মতো একজন আরক্তিম জ্যোতির্বিদের পক্ষে গিটার হাতে তুলে নিয়ে একজন রক অ্যান্ড রোলার হয়ে ওঠা সম্ভব!

ডিপ্লোমা পাওয়ার মনোভাব নিয়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম আমি; পেয়েছিলামও। তারপর হয়ে উঠেছিলাম একজন ইলাস্ট্রেটর, আশা ছিল ফ্রিল্যান্সার হিসেবে টাকা কামাব। মিউজিক সবসময়ই ছিল সাইডলাইনে; এভাবেই বড় হয়ে উঠেছি। ইলাস্ট্রেটিং কোর্স শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই হাঁপিয়ে ওঠলাম। এর সমাপ্তি ওখানেই টানলাম। ভাবলাম, ‘এ নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারব বলে মনে হয় না; কেননা, এ ধরনের কাজ করতে একদম মন টানছে না।’ তাই ভাবলাম, কিছুদিন গান-বাজনা করে দেখা যাক। সবাই তো তারকা হতে চায়; তাই ভাবলাম, আমিও একবার চেষ্টা করে দেখি না কেন?

কুইন

এরপর সিদ্ধান্ত নিতে কেটে গেল কিছুকাল; আর আমি ডুবে রইলাম। এ অবস্থায় নিজেকে আপনার হয় বলতে হবে, ‘আমি এটাই করব, এ কাজেই মনোযোগ দেব,’ নয়তো নয়। অবশেষে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিলাম।

দীর্ঘকাল আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে– আর তা শুধু আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ের জন্যই নয়। জন ও রজারের বড় বড় ডিগ্রিকেও মাথায় রাখতে হয়েছে। তাই, কিছু অতি আবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার দরকার ছিলই। এটি [মিউজিক] একটি পূর্ণকালীন কাজ; এটিকে আমি খুবই ভালো প্রেরণা হিসেবে নিয়েছিলাম। আমরা স্রেফ ভাবলাম, অন্যসব যোগ্যতা পেছনে ফেলে এখন থেকে এ কাজই করব আমরা। তাই…। না, আমি কোনো আমি নিশ্চিতভাবেই এ নিয়ে কোনো নালিশ তুলছি না।

বাবা-মাকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানাতেই তারা খেপে গেলেন; তবে যখন দেখতে পেলেন, আমরা টাকা কামাচ্ছি, তাতে তারা খুশি হয়েছেন বলেই আমার ধারণা।


পরের কিস্তি পড়তে এ বাক্যে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here