ফ্রেডি মার্কারির জার্নাল [২]

0
30
ফ্রেডি মার্কারি

লিখেছেন: ফ্রেডি মার্কারি
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের ভূমিকা
ফ্রেডি মার্কারি [৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬–২৪ নভেম্বর ১৯৯১]। মিউজিক দুনিয়া উলট-পালট করে দেওয়া ব্রিটিশ রকস্টার। ‘কুইন’ ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যান। অতি আলোচনা ও সমালোচনামুখর নাতিদীর্ঘ জীবনে নিজেকে পরিণত করে গেছেন রক মিউজিক দুনিয়ার দুর্ধর্ষ কিংবদন্তিতে। তার আত্মকথনমূলক লেখালেখি নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে ‘অ্যা লাইফ, ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস’ নামে একটি বই। ২০০৬ সালে বইটি প্রথম প্রকাশ করে মার্কারি সংস লিমিটেড। সে বইয়ের ধারাবাহিক অনুবাদের দ্বিতীয় কিস্তি হাজির করা হলো এখানে…

আগের কিস্তি । ১


ফ্রেডি মার্কারি

অধ্যায় ২: ইতিহাসে নিজের ভূমিকা রাখা

‘নিজেকে কোনোদিনই কুইন-এর দলনেতা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ভাবিনি আমি…।’

কুইন-এর কনসেপ্ট ছিল রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠা। গ্লামার ছিল আমাদেরই অংশ; আমরা চেয়েছিলাম সপ্রতিভ হয়ে উঠতে। লোকেদের হতবিহ্বল করতে ও খেপিয়ে তুলতে চেয়েছিলাম আমরা। লোকেরা আমাদের পছন্দ করে কি না– এ নিয়ে ভাবতে চাইনি; বরং আমাদের দেখামাত্রই যেন তাদের মনে একটা অভিমত তৈরি হয়ে যায়, সেটা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলাম।

আমরা অন্যদের চেয়ে স্রেফ আলাদা হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাইনি; বরং আপনি যদি পেশাদার হন, ওহে প্রিয়জন, শুনুন, আপনার এ ধরনের কোনো চেষ্টা চালানোরই দরকার নেই!

কলেজে পড়াকালেই কুইন-এর আইডিয়াটি আমার মাথায় ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছিল। ব্রায়ানও তখন কলেজে পড়ত; আইডিয়াটি ওর মনে ধরল; আমরা দুজন একসঙ্গে জুড়ে গেলাম। ব্যান্ডটির একেবারের শুরুর সূত্র পেতে হলে সে সময়কার স্মাইল নামে একটি গ্রুপের কাছে ফিরতে হবে, যাদের একটি সিঙ্গেল ট্র্যাক যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেয়েছিল। স্মাইল যেখানে, আমিও সেখানে– এমন কাটছিল দিনগুলো; আমরা বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম। ওদের শো দেখতে যেতাম আমি; ওরাও আমার শো দেখতে আসত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের পীড়নে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল ব্যান্ডটি।

ব্রায়ান আর রজারকে আমি বললাম, ‘এসব করে সময় নষ্ট করছ কেন? তোমাদের আরও বেশি অরিজিনাল ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কাজ করা উচিত। যেভাবে মিউজিক করো, আরও বেশি নিজেদের প্রমাণ রাখা উচিত। আমি তোমাদের (ব্যান্ডের) গায়ক হলে সে কাজই করতাম!’

এক সময় স্মাইল ভেঙে গেল। আর, আমরা নিজেরা মিলে একটি ব্যান্ড গড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। এমনই সহজ ছিল ব্যাপারটি। আমরা ভাবলাম, আমাদের মিউজিক্যাল আইডিয়াগুলোর মিশ্রণ ঘটাব। তারপর (১৯৭১ সালের জুলাইয়ে) আমরা জন ডিকনের সঙ্গে দেখা করলাম, আর সিদ্ধান্ত নিলাম, ব্যান্ডের নাম হবে– কুইন

কুইন নামটি আমি আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলাম। এটি একটি রাজকীয় নাম; শুনতে দারুণ লাগে। বেশ দাপুটে, খুবই চিরচেনা এবং মুহূর্তেই অর্থ ধরতে পারার মতো নাম। এ শব্দের প্রচুর ভিজুয়াল পটেনশিয়াল ছিল; যেকোনো ধরনের ব্যাখ্যাই এর দেওয়া যায়। এটি নিজেই প্রচুর অর্থ ধারণ করে, যেমন– থিয়েটার; আর এটির অর্থ ব্যাপক। সব ধরনের অর্থপ্রকাশ সহকারে শব্দটি ছিল ভীষণ জাঁকজমকপূর্ণ। এ শব্দের স্রেফ নির্দিষ্ট একটি অর্থ বের করার কোনো মানে নেই।

সমকামী অর্থপ্রকাশের ব্যাপারে আমি নিশ্চিতভাবেই অবগত ছিলাম; তবে সেটি এ শব্দের স্রেফ একটি দিক মাত্র। যাহোক, কুইনকে আমরা সবসময়ই কৌতুকপূর্ণ বিষয়ের চেয়ে বরং রাজকীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করতেই পছন্দ করি। নামটি লোকেদের মনে ভুল অর্থ দাঁড় করাতে পারে– এমন আশঙ্কা আমাদের মনে ছিল ঠিকই; তবে জানতাম, আমাদের মিউজিক নিশ্চিতভাবেই সেই ভাবমূর্তিকে ছাপিয়ে যাবে। কেননা, সারাক্ষণ আমরা ভালো কিছু করার দিকেই মনোযোগী ছিলাম। লোকেরা আমাদের গ্রহণ করবে– এ ব্যাপারে ছিলাম আত্মবিশ্বাসী; কেননা, (ডেভিড) বোয়ি ও (মার্ক) বোল্যান ইতোমধ্যেই ক্যাম্প ইমেজ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিলেন, আর সেটিকে আমরা অন্যতর মাত্রা দেওয়ার কাজটি করছিলাম।


যারা
আমাদের
শো দেখতে
আসতেন, সে
মুহূর্তে আমরা স্রেফ
সেই মানুষগুলোর মধ্যেই
প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির প্রতি
আগ্রহী ছিলাম

আমরা ভেবেছিলাম, টিনিবোপাররা [টিনিবোপার: মিউজিক, ফ্যাশন ও সংস্কৃতিতে বয়ঃসন্ধিকালীন প্রবণতা অনুসরণ করা অতি অল্পবয়সী কিশোরী] নিশ্চয়ই আমাদের পছন্দ করবে; আর আমরা নিশ্চয়ই খানিকটা ‘পপ’ ট্যাগ পেয়ে যাব, তবে সেটি বেশিদিন টিকবে না। যারা আমাদের শো দেখতে আসতেন, সে মুহূর্তে আমরা স্রেফ সেই মানুষগুলোর মধ্যেই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির প্রতি আগ্রহী ছিলাম।

কুইন গঠন করা এবং কোনো রেকর্ডিং কনট্রাক্ট করার মধ্যে আসলে সময়ের বিরাট একটি ব্যবধান ছিল। এ কারণেই, ‘এই তো, কুইন এসেছে, গ্ল্যাম রক করছে, তারা ট্রেডিশন অনুসারী’– লোকে যেন এমন কথা বলতে না পারে, সে ব্যাপারে আমরা ছিলাম ভীষণ সতর্ক। কখনোই কারও মিউজিক কপি করিনি। সুইট [ব্রিটিশ গ্ল্যাম রক ব্যান্ড; ১৯৬৮-] ও বোয়ির মতো পূর্ববর্তী গ্ল্যাম রক গ্রুপের দলে ভিড়ে গিয়েছিলাম আমরা; তবে আমাদের আবির্ভাব হয়তো একটু দেরিতেই ঘটেছে– এ নিয়ে ছিলাম উৎকণ্ঠায়।

আমাদের পথচলা আমাদেরকে থিয়েট্রিক্যাল মিউজিকের একটি ভিন্নতর রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

আমার ধারণা, যখন কেউ যাত্রা শুরু করে, তারা একটি লেবেল পায়। সাংবাদিকরা আপনাকে কোনো একটি লেবেল সেঁটে দিয়ে একটি কামরায় তুলে দেবেন। যেকেনো ব্যান্ডের ক্ষেত্রেই এখন এটি ঘটে। তারা বলেন, ‘ওদের’ মিউজিক শুনতে খানিকটা কালচার ক্লাব [ব্রিটিশ ব্যান্ড; ১৯৮১-] কিংবা এ ধরনের গ্রুপের মতো লাগে। আমাদের শোনাত খানিকটা লেড জেপলিন-এর [ব্রিটিশ রক ব্যান্ড; ১৯৬৮-১৯৮০] মতো; কেননা, আমাদের সুর ও কথা ছিল অনেকটা সে রকম ছিল, তাই তারা [সাংবাদিক] আমাদের সেই ক্যাটাগরিতে ফেলে দিয়েছিলেন।

আমাদের অবশ্য বারবার বহু ধরনের লেবেলেই ফেলা হয়েছে। লেবেলের যেমন ভালোদিক আছে, খারাপও আছে; এগুলোকে সিরিয়াসলি নিলে আপনি খুবই বোকামি করবেন। তারা কী বলেন, আমার তাতে আসলেই কিছু যায়-আসে না। আমার ধারণা, লোকে আমাদের নিয়ে নানা কথাই বলেছে, তারপর অ্যালবাম শোনার পর পাল্টে নিয়েছে নিজেদের অভিমত।

কুইন
কুইন

শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের নিজস্ব সিলমোহর পেয়েছি; কুইন সিলমোহর। পেয়েছি আমাদের ট্রেডমার্ক। আমাদের পরে আসা প্রচুর ব্যান্ডকে বলা হয়েছে, ওদের মিউজিক ঠিক যেন আমাদের মতোই শোনায়, এবং সে কথা শুনে ওরা খুশি হয়নি; তবে শুরু থেকেই এর ভেতর দিয়ে যেতে হবে আপনাকে। এভাবেই আগাতে হয়।

শুরুতেই আমাদের ভেতর প্রচুর আস্থা ছিল; তবে আমি ধরে নিয়েছিলাম, এর জন্য পাঁচ বছর সময় লাগবে, আর আমাকে অন্য কিছু করতে হবে। দিনে দিনে সময় বেড়েছে; আর, মনে পড়ে, আমাদের আগে থেকেই নানা রকমের প্রচুর ব্যান্ড ছিল, তাই কী কী করা যাবে না এবং রেকর্ড কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া প্রথম জমকালো প্রস্তাব পেয়ে বিগলিত হয়ে পড়া যাবে না– সে ব্যাপারে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিয়েছিলাম আমরা।

(১৯৭১ সালে) যখন একটি ডেমো বানালাম, প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হওয়ার ব্যাপারে আমরা সতর্ক ছিলাম। দারুণসব প্রস্তাব আসছিল, ‘আমরা তোমাদের আগামীর টি. রেক্স [ব্রিটিশ রক ব্যান্ড; ১৯৬৭-৭৭] বানিয়ে দেবো;’ কিন্তু প্রস্তাব পেয়েই লাফিয়ে না ওঠার ব্যাপারে ভীষণ, ভীষণ, ভীষণ সজাগ ছিলাম আমরা। অবশেষে একটির সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগে সম্ভাব্য সব রেকর্ড কোম্পানির কাছেই দিয়েছিলাম ধর্ণা।


কখনোই বেকার মিউজিশিয়ানে
পরিণত হওয়ার মতো
প্রস্তুতি আমাদের
ছিল
না

আমাদেরকে একটি অর্ডিনারি ব্যান্ড হিসেবে গণ্য করা হোক– তা চাইনি। সেভাবেই নিজেদের উপস্থাপন করেছি; কেননা, কখনোই বেকার মিউজিশিয়ানে পরিণত হওয়ার মতো প্রস্তুতি আমাদের ছিল না। বলেছি, ‘আমাদেরকে হয় একটি সিরিয়াস বেসাতি হিসেবে গণ্য করুন, নয়তো আমাদের নেওয়ার আদৌ দরকার নেই।’

ব্যাপারটি এভাবেই পরিকল্পনা করেছিলাম আমরা। তাই এটি কোনো এক রাতের পলকে পাওয়া সাফল্যের ব্যাপার ছিল না; আমরা ইতোমধ্যেই এভাবে কাটিয়ে দিয়েছিলাম তিন বছর। আমাদের নিয়ে কাজ করার মতো সঠিক লোক ও সঠিক কোম্পানির জন্য করছিলাম অপেক্ষা; আর তা পেতে বেশ ভালোই সময় লেগে গেল। তবু আমাদের একটি ‘হাইপ’ তোলার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হতো; এমনসব ব্যান্ডের সঙ্গে তুলনা টানা হতো– যাদের নাম কোনোদিনই শুনিনি। তারপর বলা হতো, আমাদের নাকি নিজেদের লেখা গান নেই!

বেশিরভাগ মানুষের কাছেই এটিকে হয়তো এক রাতের ব্যবধানে পাওয়া সাফল্যের গল্প বলে মনে হবে; অথচ এজন্য বেশ দীর্ঘ সময় আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে, আমরা শো করেছি ক্লাব সার্কিট ও ইত্যকার জায়গাগুলোতে– কোনো ধরনের রেকর্ডিং কনট্রাক্ট করতে না পেরেই। একদম শুরু থেকেই কোনো না কোনো ধরনের ব্যবসায়িক চাপ সবসময়ই ছিল। মনে হচ্ছিল, এ যেন কোনো সত্যিকারের অবস্ট্যাকল রেস। একটি মেজর সফল ব্যান্ডের সামনে কখনোই মাটি সমতল থাকে না, অন্যথায় ব্যান্ডটির জন্যই মুশিবত– এ কথা সবসময় মাথায় রেখেছি আমি। জেনে রাখুন, যদি খুব সহজেই চূড়ায় উঠে যেতে পারেন, তাহলে পরিণামে সর্বনাশ!

তখন আপনি বলে বেড়াতে পারবেন না, ‘কী দারুণ এক মিউজিশিয়ান আমি! গত রাতে কী দারুণ একটা গান লিখেছি!’ আপনাকে লোকে চেনে, সেটি যথেষ্ট সময় নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে নিজেকেই। মেধার অংশ হিসেবে আপনার মিউজিক লোকের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। আপনার পক্ষে স্রেফ এমনি-এমনি দারুণ একজন মিউজিশিয়ান ও অতুলনীয় এক গীতিকার হয়ে ওঠা সম্ভব নয়; এখানে প্রচুর কাজ করার ব্যাপার রয়েছে। নিজেকে তাগাদা দিতে শিখুন, নিশ্চয়ই সঠিক সময় আসবে এবং একদম শুরু থেকে কাজটির সঙ্গে ভালোভাবে বোঝাপড়া করার উপায় শিখে নিন। রক’এন’রোলে কাজ করার এটিই তরিকা। আপনার কাজকে সফল করে তোলার জন্য এসব বিষয়ে নিজের ভেতর সহজাত সচেতনতা থাকা চাই।

মইয়ের যত উপরের ধাপে পা রাখবেন, নিজের পতন ঠেকাতে আপনাকে তত বেশি বিদ্বেষী হয়ে উঠতে হবে। আমি চাই আপনি রুঢ় ও বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে উঠুন– ব্যাপারটি এমন নয়; বরং এটি আপনার ওপর সে ধরনের চাপ তৈরি করবে। আপনি একবার সফল হয়ে উঠলেই সব ধরনের বদলোকের আনাগোনা বেড়ে যাবে, এবং তাদেরকে ঠেলে নিজের গণ্ডি থেকে বের করে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তি আপনার ভেতর থাকা লাগবেই; আর এটি হলো টিকে যাওয়ার একটি সত্যিকারের পরীক্ষা।

সব ধরনের জোঁকের আবির্ভাব ঘটবে; যদি তাদের সামান্যতম সুযোগও দেন, তাহলেই আপনাকে তারা চুষে খেয়ে ফেলবে। আপনার জন্য কারা কাজ করছে– তাদের সবার দিকে খেয়াল রাখতে হবেই আপনাকে। যদি মনে হয় তারা আপনাকে ঘোরাতে নিয়ে যেতে চাচ্ছে, তাহলে যতদ্রুতসম্ভব তাদের ঝেটিয়ে বিদেয় করুন। আপনার কাছ থেকে কোনোকিছু কেউ নিয়ে যাক, সেই সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না। এ অনেকটাই ডজজেম খেলার মতো ব্যাপার; এটি রক’এন’রোলের ডডজেম। বাজে লোকেরা যেন হরদম আঘাত করতে না পারে, সেটি আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। জীবনে যারা সফল হয়, তাদের প্রত্যেককেই দুয়েকবার আগুনে পুড়তে হয় আসলে। এটি এক ধরনের চিরায়ত নিয়ম। এটিকে স্রেফ অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরে নিন।

আমার ধারণা, আমরা একদম শুরুর দিকেই এই অভিজ্ঞতা অর্জন করে ফেলেছিলাম; হয়ে গিয়েছিলাম ছারখার। এটি স্রেফ কোনো রেকর্ডিং কনট্রাক্ট থাকা-না থাকার প্রশ্ন নয়; নয় কোনো নিষ্কটক পথচলার বিষয়। এ একটি ব্যবসায়িক প্রসঙ্গ; এবং একইসঙ্গে মিউজিক্যালও। প্রতিভা বলতে আজকের দিনে স্রেফ একজন ভালো মিউজিশিয়ান হয়ে ওঠাকেই বোঝায় না; এটি বরং সচেতন হয়ে ওঠারও ব্যাপার। পুরো ব্যাপারটি ঠিকঠাক করে তুলতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কনসার্টে ফ্রেডি মার্কারি। ১৯৭০।। ছবি: গেটি ইমেজ

নিজে গান লিখে সেগুলো পরিবেশনা করা– স্রেফ এটুকুর মধ্যেই প্রতিভা আটকে নেই; বরং ব্যবসায়িক মস্তিষ্কও থাকা চাই; কেননা, মিউজিককে যথাযথভাবে ছড়িয়ে দেওয়া ও সেগুলো থেকে টাকা কামানোর ক্ষেত্রে এটি একটি বড় অংশ। বাণিজ্যের সবগুলো কৌশল আপনি ব্যবহার করুন, এবং যদি নিজের ওপর আস্থা থাকে, তাহলে এগিয়ে যান সব পন্থায়ই। আমরা শুধু এভাবেই ভাবতাম; আর সেটি কুইন-এর ক্ষেত্রে কাজে দিয়েছে। আর, নিশ্চিতভাবেই, এসব ব্যাপার দেখভাল করার জন্য নিজেদের চারপাশে কাজের লোকজন আপনাকে রাখতেই হবে; তবে একইসঙ্গে নিজের ভেতরও থাকতে হবে ব্যক্তিগত আগ্রহ।

এমনতর লোক খুঁজে পাওয়া অবশ্য কঠিন। অন্যদের ওপর আস্থা রাখা আসলেই কঠিন খুব; বিশেষত আমরা যে ধরনের মানুষ, তাদের ওপর। আমরা ভীষণ সন্নিবদ্ধ, ভীষণ সাবধানী ও অতিব্যস্ত। ‘ট্রাইডেন্টে’র [ট্রাইডেন্ট স্টুডিও; ব্রিটিশ রেকর্ডিং ফ্যাসিলিটি– যেখানে ‘কুইন’-এর প্রথম তিনটি স্টুডিও অ্যালবামের কাজ হয়েছে] সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক কিছু খোয়াতে হয়েছে; এ কারণে আমরা অতি সাবধানী ও বাছাইপটু হয়ে উঠেছিলাম– এরপরে আমাদের সঙ্গে কোন ধরনের লোকেরা কাজ করবে এবং কুইন ইউনিটের অংশ হয়ে উঠবে– সে ব্যাপারে।

আমাদের ব্যবসায়িক ব্যাপারস্যাপার একদম চোখে চোখে রাখত জন ডিকন। কী করা উচিত আর কী উচিত নয়– সবকিছু নখদর্পে ছিল তার। জন যতক্ষণ না বলত, ‘ঠিকই আছে’– তার আগ পর্যন্ত গ্রুপের বাকি কেউ কিছু করতাম না।

আমার ধারণা, ব্যবসায়িক চাপ দিনে দিনে আগের চেয়ে অনেক বাড়ছে। এখন এতকিছুই ঘটছে, যার ফলে আপনাকে সবসময়ই ঝটপট সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং তা ঠিকঠাক হওয়া চাই। সময় করে উঠতে পারাটাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপনাকে তাই আপস করতে হবে; আর এ জিনিস আমরা ঘৃণা করতাম। কাজটি আরও ভালোভাবে করা সম্ভব ছিল– এমন অনুভূতি মনে জাগলে আমার একদম মরে যেতে ইচ্ছে করে; খুবই বিশ্রি লাগে। শেষ পর্যন্ত আপনার ক্যারিয়ার আপনারই; এর ভেতরই আপনাকে জীবন কাটাতে হবে।

একটি ব্যান্ডের জন্য যাত্রা শুরু করা, নেতৃত্ব ও ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতভাবেই মহাগুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু লোকেরা ভাবতে ভালোবাসে– শিল্পীদের মস্তিষ্ক বলে কিছু নেই; আর, এদের অনেকেই খুব সহজে নিজেদের টাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এ ক্ষেত্রে আমরা ছিলাম তুলনামূলক বেশ ধূর্ত। ‘ট্রাইডেন্ট’-এর পর একদল টপ ক্লাস ম্যানেজারের সামনে হাজির হয়েছিলাম, যেন নিশ্চিত হতে পারি– সঠিক সিদ্ধান্তটি নিচ্ছি কি না।

ফ্রেডি জন রিড

সে সময়ে জন রিড’কে সঠিক চয়েস বলে মনে হয়েছিল। আমার দিকে চোখ মেলে তাকিয়েছিলেন তিনি; বলেছিলাম, ‘কেন নয়?’ দারুণ এক ম্যানেজার ছিলেন তিনি, আসলে। এ ধরনের কম্বিনেশনই আমরা বহু বছর ধরে চাচ্ছিলাম। তার মনোভাব ও কর্মপদ্ধতি ছিল একেবারেই সঠিক। রেকর্ডিং, পাবলিশিং ও ম্যানেজমেন্টের পুরো কাঠামো তিনি ঠিকঠাক করে নিয়েছিলেন।

পরবর্তীকালে, বেশ কয়েক বছর পর, ম্যানেজ করার পক্ষে আমরা হয়ে উঠেছিলাম একটি ভীষণ কঠিন গ্রুপ; কেননা, আমাদের চাওয়া ছিল প্রচুর। আমরা পাষণ্ড ছিলাম আসলে; আমাদের ম্যানেজার হওয়ার জন্য হিটলার কিংবা গোয়েবলসের মতো কারও দরকার ছিল। কুইন একটি ব্যবসা; এটি একটি সংগঠন; আমরা ঠিক করেছিলাম, নিজেরাই এটা সামলাব।

কুইন যখন একসঙ্গে পারফর্ম ও রেকর্ড করে, লোকেরা আমাদের একটি সুপার-ইউনিট ইমেজ হিসেবেই দেখতে পায়। কিন্তু কুইন তো আসলে একটি মিউজিক্যাল গ্রুপ; কোনো পরিবার নয়। অন্য অনেক পরিবারের মতো নিশ্চিতভাবে এখানেই তিক্ত বিবাদ নিশ্চয়ই রয়েছে। খুবই ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তর্ক লেগে যায় আমাদের। তবে আমরা প্রত্যেকেই জানি, আমাদের ভিত্তিগত লক্ষ্য একেবারেই অভিন্ন: ভালো মিউজিক বানানো অব্যাহত রাখা এবং এই ব্যান্ডের আগে যা অর্জন– সেগুলোকে ছাপিয়ে যাওয়া।


আমাদের ইতিহাসের সর্বত্রই
অভ্যন্তরীণ ঈর্ষার একটি
ব্যাপার রয়েছে

আমাদের ইতিহাসের সর্বত্রই অভ্যন্তরীণ ঈর্ষার একটি ব্যাপার রয়েছে। রজার, ব্রায়ান, জন আর আমি আলাদা আলাদাভাবে গান লিখি; প্রতিটি অ্যালবামের ক্ষেত্রেই কোন গান রাখা হবে– তা নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রচুর কথা কাটাকাটি চলে। এ এমনই এক ধাক্কা, এক ক্ষুধা, এক নিরন্তর বিবাদ– যা খুবই স্বাস্থ্যকর। আমরা তা উগড়ে দিই; এবং তা খুবই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। কোনোকিছু নোংরা করতে চাই না আমি। বলতে চাচ্ছি, গান শুধু আমিই লিখব– কোনোভাবেই এমন কথা বলতে চাই না। শুধুমাত্র গানের শক্তিটিকেই বিবেচনা করতে হবে আমাদের। নিজের কম্পোজিশনগুলোকে সেরা বলে সামনে এগিয়ে দেওয়া– এমন কাজ যদি করি, বিশ্রি হবে না?

এটি এমন এক ধরনের গ্রুপ পলিসি, যেখানে আমরা তর্ক করি আর বলি, ‘আচ্ছা, এটা কার লেখা– তাতে কিছু যায়-আসে না; আমাদের ধারণা, এটা সেরা গান, কিংবা ওটা সেরা গান; কেননা, আমাদের সবার ক্ষেত্রেই এটা কাজে দেবে।’ আমি বলতে চাচ্ছি, নিজে যদি কোনো গান চাপিয়ে দিই, অথচ নিজেরই মনে না হয়– সেটি হিট হবে, তাহলে তা আমার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

রেডিও গা গা। অফিসিয়াল ভিডিও

যেমন ধরুন, রজারের লেখা রেডিও গা গা [১৯৮৪] গানটি যে সিঙ্গেল হিসেবে খুবই দারুণ একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে– এ কথা কিন্তু গ্রুপে সবার আগে আমিই বলেছিলাম। এটি ছিল বাণিজ্যিকধর্মী, খুবই দাপুটে ও ভিন্ন ধরনের, এবং একইসঙ্গে সমকালীন গান।

বলে রাখি, আমি কিন্তু ব্যান্ড লিডার নই। সবাই আমাকে লিডার বলে; ‘আমি কুইন, তবে স্রেফ লিড সিংগার। জেনারেল কিংবা এ ধরনের কিছু নই। আমরা চারজনের প্রত্যেকেই সমান। আমরা সবাই পপস্টার হতে চেয়েছিলাম; তবে গ্রুপই সবার আগে। বাকিদের বাদ দিয়ে আমি আদৌ কিছু নই।’


পরের কিস্তি…

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here