স্ল্যাশের আত্মজীবনী [২]

0
57
স্ল্যাশ

লিখেছেন: স্ল্যাশ
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

স্ল্যাশ। মাস্টার রকস্টার। গান এন’ রোজেস-এর সিগনেচার গিটারিস্ট। তার সেলফ-টাইটেলড দীর্ঘ আত্মজীবনী বাংলা অনুবাদে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হবে এখানে। এবার প্রকাশ পেল দ্বিতীয় কিস্তি…

আগের কিস্তি পড়তে এই বাক্যে ক্লিক করুন


স্ল্যাশ

লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রথম স্মৃতি বলতে মনে পড়ে, দ্য ডোরস-এর লাইট মাই ফায়ার গানটি আমার বাবা-মায়ের টার্নটেবিলে প্রতিদিন, সারাদিন বাজত। ষাটের দশকের শেষ ভাগ ও সত্তরের দশকের শুরুর ভাগের লস অ্যাঞ্জেলেস ছিল এমনই এক জায়গা, বিশেষত অল্পবয়সী ব্রিটরা যেখানে শিল্প কিংবা মিউজিকে জড়িয়ে থাকত: ইংল্যান্ডের স্থির জীবনধারার তুলনায় সেখানে ছিল বিস্তৃত সৃজনশীল কর্মচাঞ্চল্য, আর লন্ডনের বৃষ্টি ও কুয়াশাঘেরা আবহাওয়ার তুলনায় সেখানকার আবহাওয়া ছিল যেন স্বর্গীয়। তাছাড়া, ইয়াঙ্কি স্রোতে গা ভাসিয়ে দিতে ইংল্যান্ড ছেড়ে আসা ছিল সিস্টেম ছেড়ে নিজের বেড়ে ওঠার পথে পা বাড়ানোর দারুণ উপায়। সেটা করতে পেরে আমার বাবা ছিলেন যারপরনাই খুশি।

বাবা যখন নিজেদের সহজাত শিল্পপ্রতিভাকে গ্রাফিক ডিজাইনে ন্যাস্ত করেছেন, মা তখনো ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবেই অব্যাহত রেখেছেন নিজ কর্ম। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমার মায়ের যে যোগাযোগ ছিল, সেটির ফলে তার স্বামী সহসাই অ্যালবামের কাভার ডিজাইন করার কাজ পেতে থাকেন।


ল্যান্ডস্কেপটির মধ্যেই রয়েছে
স্বয়ং বোহেমিয়ান
ধরন

আমরা তখন থাকতাম লুকআউট মাউন্টেন রোডের ষাটের দশকের কমিউনিটির চিরচেনা লরেল ক্যানিয়ন বলভার্ডে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ওই অঞ্চলটি বরাবরই একটি সৃজনশীল আশ্রয়স্থল; কেননা, ল্যান্ডস্কেপটির মধ্যেই রয়েছে স্বয়ং বোহেমিয়ান ধরন। বাড়িগুলো পাহাড়ের পাশে, সতেজ বৃক্ষপত্রাবলীর ভিড়ে সাজানো। ওই বাংলোগুলোতে রয়েছে গেস্টহাউস। আরও রয়েছে এমন বেশ কিছু অবকাঠামো, যেখানে খুবই অর্গানিক ও কমিউনাল জীবনযাপন সম্ভব।

আমি যখন অল্পবয়সী, সেখানে ভীষণ আয়েশে, বিক্ষিপ্তভাবে শিল্পী ও মিউজিশিয়ানরা বসবাস করতেন: আমাদের বাড়ির কয়েকটি বাড়ি পরেই থাকতেন জনি মিচেল। জিম মরিসন তখন থাকতেন ক্যানিয়ন স্টোরের পেছনে। সেখানে আরও থাকতেন অল্পবয়সী গ্লে ফ্রে– যিনি তখন ঈগলস ব্যান্ডটি গড়ে তুলছিলেন।

সবার সঙ্গে সবার সংযুক্ত থাকার একটা আবহ ছিল সেখানে: জনির পোশাকের ডিজাইন করতেন আমার মা, আবার তার অ্যালবামের কাভার ডিজাইন করতেন বাবা। ডেভিড গেফেন ছিলেন আমাদের বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু; তার কথা আমার বেশ ভালোভাবে মনে আছে। বেশ কয়েক বছর পর তিনি গানস এন’ রোজেসকে চুক্তিবদ্ধ করেছিলেন, যদিও তখন জানতেন না আমার সেই পরিচয়; তাকে এ ব্যাপারে কিছু বলিনি আমি। ১৯৮৭ সালের ক্রিসমাসে ওলাকে ফোন করে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, আমি কেমন আছি। জবাবে মা বলেছিলেন, ‘ও কেমন আছে, তোমারই তো ভালো জানার কথা; তুমি তো সদ্যই ওর ব্যান্ডের রেকর্ড প্রকাশ করলে!’

***

সারাদিন রেডিও শুনতাম। সাধারণত এএম ডায়ালে ‘কেএইচজে’ (রেডিও স্টেশন)। রেডিও চালু রেখেই ঘুমাতাম। স্কুলের হোমওয়ার্ক করতাম, রেজাল্টও ভালো ছিল; তবু শিক্ষক জানালেন, পড়াশোনায় আমার নাকি মনোযোগ কম, বরং সারাক্ষণ দিবাস্বপ্নে ডুবে থাকি।

সত্য হলো, আমার অনুরাগ ছিল চিত্রশিল্পের প্রতি। ফরাসি পোস্টইমপ্রেশনিস্ট পেইন্টার অঁরি রুশোর কাজ ভালো লাগত। তার মতো আমিও নিজের প্রিয় প্রাণীতে ভরপুর জঙ্গলের ছবি আঁকতাম।


প্রতিটি
ঝোঁপের ও
গাছের নিচেই
গর্ত খুড়েছিলাম,
যতক্ষণ না সঙ্গে থাকা
অব্যবহৃত অ্যাকুরিয়ামটি
সাপে ভর্তি হয়ে
ওঠল

সাপের প্রতি আমার আচ্ছন্নতার শুরু একেবারে অল্প বয়সে। ক্যালিফোর্নিয়ার বিগ সার অঞ্চলে আমার মা আমাকে প্রথমবার নিয়ে যান তার এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করাতে; সেখানে ক্যাম্প করেছিলেন তারা। আমার তখন ৬ বছর বয়স। বনের ভেতর সাপ ধরার পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছিলাম আমি। প্রতিটি ঝোঁপের ও গাছের নিচেই গর্ত খুড়েছিলাম, যতক্ষণ না সঙ্গে থাকা অব্যবহৃত অ্যাকুরিয়ামটি সাপে ভর্তি হয়ে ওঠল। তারপর সেই সাপগুলো ছেড়ে দিয়েছিলাম।

ওই ভ্রমণে সেটিই আমার একমাত্র রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল না: মা ও তার বান্ধবীও ছিলেন একই রকমের বুনো, বেপরোয়া তরুণী– যারা আঁকাবাঁকা ক্লিফসাইড রাস্তায় দেদাড় রেস করেছেন আমার মায়ের ভক্সওয়াগেন বাগে। মনে পড়ে, গাড়ির গতির কারণে প্যাসেঞ্জার সিটে ভয়ে সিঁটিয়ে বসে থেকে বাইরে জানালা দিয়ে দেখছিলাম, ঠিক নিচেই পাথর ও সমুদ্র শুয়ে রয়েছে– আমার দরজার কয়েক ইঞ্চি দূরেই!

একটা গিটারের ছবি এখনো আমার মনে দোলা দিয়ে যায়।

***

মায়ের সঙ্গে দেখা প্রতিটি ব্যাকস্টেজ কিংবা সাউন্ডস্টেড দৃশ্যপট আমার ভেতরে এক ধরনের আজব জাদু হয়ে কাজ করেছে। কী চলছে– সে সম্পর্কে যদিও কোনোই ধারণা ছিল না, তবু পারফরম্যান্সের সেই কলাকৌশলগুলো আমাকে তখন মুগ্ধ করত, এখনো করে। মঞ্চে সব বাদ্যযন্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে কোনো ব্যান্ডের অপেক্ষা করার বিষয়টি আমার কাছে রোমাঞ্চকর।

গিটারের ছবি এখনো আমার মনে দোলা দিয়ে যায়। উভয়ের ভেতর রয়েছে একটা অব্যক্ত বিস্ময়: বাদকদের মধ্যে নিহিত থাকা বাস্তবতাকে অতিক্রম করে যাওয়ার সক্ষমতা এগুলো ধারণ করে রাখে।

***

আমার ভাই অ্যালবিয়নের জন্ম ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে। এ ঘটনা আমার পরিবারের গতিশীলতাকে খানিকটা পাল্টে দিল। কেননা, হুট করেই আমাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল একটি নতুন ব্যক্তিত্ব। নিজের ছোট একটা ভাই থাকা খুবই দারুণ ব্যাপার; ওর দেখাশোনাকারীদের একজন হতে পেরে বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম। বাবা-মা যখন আমাকে বলতেন যেন ওকে একটু দেখে রাখি, দারুণ লাগত।

তবে সহসাই আমাদের পরিবারে একটা বড় ধরনের পরিবর্তনের দেখা পেতে শুরু করলাম। বাবা-মা যখন একসঙ্গে থাকতেন, আর হরদমই আলাদা হয়ে যেতেন– বিষয়গুলো একইরকম থাকল না আর। আমার ধারণা, ডহিনি ড্রাইভের অ্যাপার্টমেন্টে যখন থেকে আমরা এসেছি এবং আমার মায়ের কাজকর্ম যখন সত্যিকারের সাফল্য দেখতে শুরু করল, তারপর থেকেই পরিস্থিতি খারাপের দিকে যেতে থাকে।

শৈশবে ছোটভাই অ্যালবিয়ন হাডসনের সঙ্গে স্ল্যাশ

এই ফাঁকে বলে রাখি, আমাদের ঠিকানা ছিল ৭১০ নর্থ ডহিনি। জায়গাটি এখন খালি। ডিসেম্বরে এখন সেখানে প্রচুর ক্রিসমাস ট্রি বিক্রি হয়। আরেকটি বিষয়ের উল্লেখ টানতে চাই: ওই বিল্ডিংয়ে আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন সত্যিকারের, স্বঘোষিত ‘ব্ল্যাক এলভিস’; কেউ চাইলে যাকে লাস ভেগাসের পার্টির জন্য বুকিং দিতে পারেন।

ততদিনে বড় হয়ে ওঠা আমি আমার বা-মায়ের সম্পর্কটিকে খেয়ে ফেলার কিছু নিশ্চিত কারণের দেখা পাই। নানীর সঙ্গে মায়ের এত ঘনিষ্ঠতা বাবার কোনোদিনই ভালো লাগেনি। নিজের পরিবারকে তার শাশুরি আর্থিকভাবে সাহায্য করছেন– এটা বাবার অহমিকায় আঘাত করত। নিজের পরিবারে শাশুরির সম্পৃক্ততাকে তিনি কখনোই ভালো চোখে নেননি।

বাবার মদাসক্তি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে: মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি, ভীষণ। তিনি ছিলেন একজন স্টেরিওটিপিক্যাল ব্যাড ড্রিংকার: কখনোই উগ্র হননি। কেননা, বাবা ছিলেন ভীষণ স্মার্ট। বর্বর সহিংসতার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করা তার পক্ষে ছিল কঠিন। তবে মদের প্রভাবে তার মেজাজমর্জি খুবই খারাপ থাকত। মাতাল অবস্থায় তিনি এমনসব আজেবাজে মন্তব্য করে ফেলতেন, যেগুলোর দাম তাকে বাজেভাবে দিতে হয়েছে। বলাই বাহুল্য, এভাবে অনেকগুলো সেঁতু পুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি!


সেই রাতগুলো বাবা
অস্থিরচিত্তে, একা
একা কাটাতেন
রান্নাঘরে;
গিলতেন
রেড ওয়াইন,
আর শুনতেন এরিক
স্যাটির পিয়ানো কম্পোজিশন

আমার তখন মাত্র ৮ বছর বয়স; তবে ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম, খারাপ কিছু একটা ঘটছে। বাবা-মা কখনোই দুজন দুজনকে শ্রদ্ধা না দেখানোর মতো আচরণ করেননি; কিন্তু তাদের সম্পর্ক ভেঙে পড়ার মাস কয়েক আগে দুজন দুজনকে পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে থাকলেন। বেশির ভাগ রাতই বাইরে কাটাতেন মা। সেই রাতগুলো বাবা অস্থিরচিত্তে, একা একা কাটাতেন রান্নাঘরে; গিলতেন রেড ওয়াইন, আর শুনতেন এরিক স্যাটির পিয়ানো কম্পোজিশন। মা বাড়ি ফিরতেই আমি আর বাবা বেরিয়ে পড়তাম দীর্ঘ হাঁটার জন্য।

ইংল্যান্ডে ও লস অ্যাঞ্জেলেসে– সবখানেই হেঁটেছি আমরা। চার্লস ম্যানসন-পূর্ব লস অ্যাঞ্জেলেসে, ম্যানসন গোষ্ঠীর হাতে শ্যারন টেট ও তার বন্ধু-বান্ধব খুন হওয়ার আগের সময়কালে আমরা যত্রতত্র হিচহাইকে অভ্যস্ত ছিলাম। ওই ঘটনার আগে লস অ্যাঞ্জেলেস ছিল নিষ্পাপ তল্লাট; ওই খুনের ঘটনাগুলো ষাটের দশকের ফ্লাওয়ার পাওয়ার যুগের ইউটোপিয়ান আদর্শগুলোর সমাপ্তিচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল।

শৈশবে বাবা অ্যান্থনি হাডসন ওরফে টনির সঙ্গে স্ল্যাশ

টনিকে ঘিরে আমার শৈশবের স্মৃতি ছিল সিনেমাটিক। সারা বিকেল আমি তাকে দেখে দেখে, তার পাশে পাশে হেঁটে কাটিয়ে দিতাম। এ রকম হাঁটতে হাঁটতে একদিন আমরা গেলাম ফ্যাটবার্গারে [রেস্তোরাঁ]। সেখানে আমাকে জানালেন, মায়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে তার। আমি একদম ভেঙে পড়লাম; নিজের চেনা একমাত্র স্থিতিশীলতা কেঁপে ওঠল। বাবাকে কোনো প্রশ্ন করলাম না; শুধু সামনে থাকা হ্যামবার্গারটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

সে রাতেই পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য আমার সামনে বসে মা কিছু বস্তুগত সুবিধার কথা জানালেন: থাকার জন্য দুটি বাড়ি রয়েছে আমার। এ নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলাম; মনে হলো, ভালোই তো! আবার মনে হলো, এ সবই মিথ্যে। মাথা নাড়ালাম ঠিকই, কিন্তু আসলে কোনো কথাই শুনছিলাম না তার।

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদটি শান্তিপূর্ণভাবে ঘটলেও ছিল বিশ্রি; কেননা, বহু বছর পর পর্যন্ত তারা ডিভোর্স দেননি। পরস্পরের হাঁটার দূরত্বেই হরদম বসবাস করতেন তারা। একই বন্ধু সার্কেলে ছিল তাদের ওঠা-বসা।


তাদের
দুজনের
মধ্যে কার
সঙ্গে আমি থাকব–
সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার
ভার চাপিয়ে দিলেন
আমার
ওপর

তাদের ছাড়াছাড়ির কালে আমার ছোট ভাইটির বয়স মাত্র দুই বছর। কিছু নিশ্চিত কারণেই তারা একমত হলেন, মায়ের আশ্রয়েই থাকবে শিশুটি। তবে তাদের দুজনের মধ্যে কার সঙ্গে আমি থাকব– সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার চাপিয়ে দিলেন আমার ওপর। আমি মায়ের সঙ্গে থাকার পথই বেছে নিলাম।

নিজের সেরাটা দিয়ে আমাদের দুই ভাইকে সমর্থন জুগিয়েছেন ওলা। নিজের কাজের প্রয়োজনে নিরন্তর ছুটে বেড়াতে হয়েছে তাকে। প্রয়োজন অনুসারে মায়ের বাড়ি আর নানীর বাড়ি– এই দুই বাড়িতে জীবন কাটতে থাকল আমাদের দুই ভাইয়ের। আমার বাবা-মায়ের বাড়িতে সব সময়ই ছিল ব্যস্ততা, অবাধ বিচরণ; তবে সেখানে সব সময়ই ছিল স্থিরতা। তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ামাত্র অবশ্য আমার কাছে হরদম নিরন্তর রূপান্তরের দেখা মেলল।

ওই বিচ্ছেদ আমার বাবার পক্ষে ছিল বেশ কঠিন। এ ঘটনার পর বেশ কিছুদিন তার কোনো দেখা পাইনি। এ ঘটনা আমাদের সবার জন্যই কঠিন ছিল। মাকে যখন আরেক লোকের সঙ্গে দেখলাম, তখন এটা আমার কাছে অবশেষে বাস্তব হয়ে ধরা দিল। সেই লোকের নাম ডেভিড বোয়ি।

***

১৯৭৫ সালে ডেভিড বোয়ির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে শুরু করলেন মা। বোয়ি তখন তার স্টেশন টু স্টেশন অ্যালবামের রেকর্ডিং করছিলেন। ইয়ং আমেরিকানস অ্যালবামের সময়কাল থেকেই তার পোশাক ডিজাইন করে আসছিলেন মা। ফলে দ্য ম্যান হু ফেল টু আর্থ সিনেমার কাস্টিং করার পর বোয়ি সিনেমাটির কস্টিউমের কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন মাকে; নিউ মেক্সিকোতে হয়েছিল ওই সিনেমার শুটিং।

এভাবে মা ও বোয়ির একটি আধা-তীব্র সম্পর্কের সূচনা ঘটে। সেই সম্পর্কের দিকে ফিরে তাকিয়ে এখন যদিও সেটিকে বড় কোনো ব্যাপার বলে মনে হয় না; তবে সে সময়ে মনে হয়েছিল যেন নিজের উঠোনে অনুপ্রবেশ ঘটেছে কোনো অ্যালিয়েনের।

বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর আমার মা, ভাই আর আমি পাড়ি জমাই রেঞ্জলি ড্রাইভের একটি বাড়িতে। বাড়িটা দারুণ ছিল: লিভিং রুমের দেয়ালগুলো ছিল আকাশনীলা; তাতে মেঘের ছবি আঁকা। পিয়ানো ছিল একটা। আর একটা পুরো দেয়ালজুড়ে ছিল মায়ের রেকর্ড কালেকশন। বেশ মনোমুগ্ধকর ও আরামদায়ক বাড়ি। বোয়ি হরদম আসতেন; সঙ্গে নিজের স্ত্রী অ্যাঞ্জি ও তাদের পুত্র জোয়িকে নিয়ে।

স্ল্যাশ
ওলা হাডসনডেভিড বোয়ি

সত্তরের দশকটি ছিল অনন্য: মনে হতো, নিজের প্রেমিকার বাড়িতে নিজ স্ত্রী ও পুত্রকে সঙ্গে এনে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করে কাটানো যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সে সময়ে ট্রানসেনডেন্টাল মেডিটেশনের যে ফর্মের চর্চা করতেন বোয়ি, আমার মা-ও সেটাই করতেন। মায়ের বেডরুমে রাখা মন্দিরের সামনে বসে মন্ত্র পড়তেন তারা।

পরিচয় হওয়ামাত্রই বোয়িকে মেনে নিয়েছিলাম আমি। কেননা, তিনি স্মার্ট, মজার, এবং দারুণ সৃষ্টিশীল মানুষ। অফস্টেজে তার কাছ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা আমাকে অনস্টেজে তাকে দেখার অভিজ্ঞতাকে ঋদ্ধ করেছিল। ১৯৭৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস ফোরামে তাকে দেখতে মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম আমি। তারপর বহুবার তাকে যেমনটা দেখেছি– যে মুহূর্তে মঞ্চে ওঠেন, আর নিজ সৃষ্ট চরিত্র ধারণ করেন, আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ি। তার পুরো কনসার্ট ছিল পারফরম্যান্সের নির্যাস। অতিরঞ্জন থেকে মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছাতে পারা এই মানুষটির অভ্যস্ত অনুষঙ্গগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করলাম আমি। রক স্টারডমকে তিনি এটির শিকড়ের প্রতি সংকুচিত করে দিয়েছিলেন: একজন রকস্টার হওয়া মানে আপনি যা আছেন এবং যা হতে চান– এর মধ্যে প্রতিচ্ছেদ ঘটানো।


পরের কিস্তি, আসছে শিগগিরই...
Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক: লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ]: আমার জন লেনন [মূল: সিনথিয়া লেনন]; আমার বব মার্লি [মূল: রিটা মার্লি] ।। কবিতার বই: ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ]: ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড: ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান; বেলা তার; ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার বেলা তার; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার নুরি বিলগে জিলান