পিংক ফ্লয়েড ও আমাদের উইডি দিনগুলো

0
225
পিংক ফ্লয়েড

লিখেছেন। উপল বড়ুয়া


পিংক ফ্লয়েড
প্রগ্রেসিভ রক ব্যান্ড; ইংল্যান্ড । ১৯৬৫-৯৫, ২০০৫, ২০১২-১৪


“Music is a higher revelation than all Wisdom & Philosophy”
Beethoven

পিংক ফ্লয়েড
সিড ব্যারেট

পিংক ফ্লয়েড-এ একজন পাগল ছিলেন। সিড ব্যারেট। এমন পাগল খুব কম থাকেন। যিনি ঘাসের উপর যত্রতত্র বসে ছিঁড়তে থাকেন ঘাস। সবুজ নরম ঘাস। আর কাগজের প্লেন বানিয়ে বাতাসে ছুঁড়ে মারেন। পারফরম্যান্সের সময় এলএসডি নিয়ে গিটার বাজাতে বাজাতে হঠাৎ ঢুকে পড়েন বেসুরে।

দর্শক মনে করে এই বেসুরটাও এক প্রকার এক্সপেরিমেন্ট। যেহেতু তিনি ব্যারেট, সিড ব্যারেট। স্টেজে অন্য মেম্বাররাও থেমে পড়েন তার এমন কারিকুরিতে। পাশে পরম বন্ধু রজার ওয়াটার্স মুচকি হেসে দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকেন। দেখেন, একজন রকস্টার ব্যারেটকে কীভাবে গিলে খাচ্ছে পাগলসব মানুষ।

“The lunatic is on the grass
The lunatic is on the grass

The lunatic is in my head
You raise the blade, you make the change
You re-arrange me ’till I’m sane
You lock the door
And throw away the key
There’s someone in my head but it’s not me.”
–Brain Damage

পিংক ফ্লয়েড প্রথম দিকে তাদের শোগুলোতে বিভিন্ন নাম নিয়ে বাজাত। অনেক পরে একটা স্থায়ী নাম হয়। পিংক ফ্লয়েড। এবং সাইকেডেলিক ও প্রোগ্রেসিভ রক দুনিয়ায় নিয়ে আসে অভিনব সব গান। তখন আরেক রক গুরু ‘দ্য লিজার্ড কিং’খ্যাত জিম মরিসন তার দ্য ডোরস নিয়ে তুঙ্গে। ‘কামন বেবে লাইট মাই ফায়ার’, `রাইডার্স অন দ্য স্ট্রর্ম’, পিপল আর স্ট্রেঞ্জ হোয়েন য়্যু আর স্ট্রেঞ্জার’ এমন অনন্যসব সাইকেডেলিক মিউজিকে হতাশাবাদী ও বিমুখ দুনিয়ার শ্রোতাদের পাগল করে দিচ্ছেন।

পিংক ফ্লয়েড
পিংক ফ্লয়েড; ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে। নিচ থেকে ঘড়ির কাঁটা অনুসারে– গিলমোর, ম্যাসন, ব্যারেট, ওয়াটার্স রাইট

সিড ব্যারেটের কথা উঠলেই আমার জিম মরিসনকে মনে পড়ে। দুজনের ভেতরে পাগলামি থাকলেও চরিত্র প্রকাশে দুজনই খুব আলাদা। তারপর অদ্ভুত সব লিরিক ও মিউজিক দিয়ে ব্যারেট মানসিক রোগ নিয়ে পিংক ফ্লয়েড থেকে সরে পড়লেন। গুজব উঠল, ‘ব্যারেট ইজ নো মোর।’ রকস্টারদের জীবন যেরকম হয় আর কী। এলেন ডেভিড গিলমোর। আরেকজন ক্ষ্যাপা। ফ্লডিয়ানরা ভালবেসে ডাকে ‘বুড়ো চাচা’। আর এদিকে রজার ওয়াটার্স, নিক ম্যাসন, রিচার্ড রাইট তো আছেনই।


যেন পুরনো গ্লাডিয়েটরটা
ঘোড়া দাপিয়ে ছুটে
আসছে

পিংক ফ্লয়েড-এর গানের সবচেয়ে বড় জায়গাটা হলো গান নিয়ে প্রচুর এক্সপেরিমেন্টের বিষয়টা। গানে তারা প্রচুর পরিমাণ ফলি সাউন্ডকে নিয়েও কাজ করেছে অনেক সময়। হেলিকপ্টারের ভোঁ শব্দ, গাড়ির হর্নের রাগি আওয়াজ কিংবা য়্যুটিউবের বদান্যতায় আপনার তো নিশ্চয় সেই বিখ্যাত পম্পে’তে করা ইকোস’টা (echoes) শোনা আছে। যেন পুরনো গ্লাডিয়েটরটা ঘোড়া দাপিয়ে ছুটে আসছে। ডেল’র মন্দিরে ঘণ্টা বাজার ধ্বনি শোনা যায়। পুরোহিতের আদি ভবিষ্যৎবাণী। তখন মাথা ঝিম ঝিম লাগে। উইডের তালে তালে কুচকাওয়াজ করতে করতে আমরা আরেকবার ঢুকে পড়ি একটা প্যারানয়েড জগতে।

“There is no pain, you are receding
A distant ship smoke on the horizon
You are only coming through in waves
Your lips move but I can’t hear what you’re saying
When I was a child, I had a fever
My hands felt just like two balloons

I have become comfortably numb”
–comfortably numb

একটি ব্যক্তিগত দুঃখ নিয়ে বিষণ্ন সন্ধ্যায় একজন লোক জাবর কেটে চলেছে পুরনো দিনের স্মৃতি। যাকে ডাকনাম দেওয়া যায় ‘শৈশব’। পৃথিবী বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী এতই ছোট হয়ে যাচ্ছে দিনদিন; নিঃশ্বাস নেওয়ায় কষ্টকর।

বাংলা গানে এবং বাংলা কবিতায় অনেক পিংক ফ্লয়েড প্রভাবিত কাজ আছে। বিশেষ করে লিরিক প্রভাবিত। হওয়াটা উচিত। কারণ ফ্লয়েড অত্যন্ত ইন্সপিরিশনাল-প্রভোকেটিভ। আর যেহেতু গানের কোনো সীমানা নেই। স্মৃতিই মূলত য়্যুনিভার্সাল ট্রুথ। সেই স্মৃতির দিকে ফেরার জন্যই মানুষ আরও কয়েকটা দিন বেঁচে থাকে। স্মৃতির দিকে ফিরতে চাওয়াটা একটা ঘোর।

মানুষ আসলে একেকটা পতিত আত্মা। মাছের মতোন যে অথৈ সমুদ্রের নোনা জলে দিকহীন সাঁতার কেটে চলেছে অবিরাম।

“We’re just two lost souls swimming in a fish bowl, year after year,”
–Wish You Were Here

পিংক ফ্লয়েড জীবনের সত্যটা উদ্ঘাটন করার চেয়ে বা সমাধানের চেয়ে বা জীবন নামক গোলকধাঁধাঁয় মানুষের যে ভূমিকা ও জার্নি তাকেই যেন ধরতে চায়। এই ধরতে গিয়ে মানুষের শৈশব, সময় বা সময়হীনতার দিকে ফেরার তাড়না থেকে এক প্রকার উদ্বাস্তুতা ভেসে উঠে। পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন ফরাসি দার্শনিক বেঁগসর গতিতত্ত্ব অনুযায়ী মঞ্চে ভেসে উঠেন মুনওয়াকে। আর গিলমোর তুলে নেন ‘ল্যাপ স্টিল গিটার’। শুরু হয় আনন্দদায়ী যন্ত্রণা। গিটার আমাদের ডুবিয়ে মারে।

“The grass was greener
The light was brighter
The taste was sweeter
The nights of wonder
With friends surrounded
The dawn mist glowing
The water flowing
The endless river
Forever and ever”
–High Hopes

পিংক ফ্লয়েড-এর পরিমিতিবোধ এবং নিক ম্যাসনের ড্রামের তালে তালে লিরিকের ঝংকার; মূলত এই শিহরণ থেকেই উঠে আসে প্রচণ্ড অভিজ্ঞতা। পিংক ফ্লয়েডকে চিৎকার করে করে বলতে হচ্ছে না– ‘যুদ্ধ থামাও। মানুষকে মুক্তি দাও। স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট নিপাত যাক। আন্দোলন হোক। শিক্ষার নামে মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যাবে না।’

ডেভিড গিলমোর

পিংক ফ্লয়েড-এর গান নর-নারীর প্রেম, প্রেসক্লাব বান্ধব আন্দোলন, দেয়ালনির্ভর পোস্টার সাঁটানোর চেয়ে অধিক কিছু। সেখানে জোর নেই। জবরদস্তি নেই। আছে কেবল গিটারের উন্মাদনা। যেহেতু গিটার নিজেই এক বিপ্লব। অসহায় মানুষ যেখানে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার, কথা বলার নির্ভরতা।

“We don’t need no education
We don’t need no thought control
No dark sarcasm in the classroom
Teachers leave them kids alone
Hey teacher leave them kids alone
All in all it’s just another brick in the wall
All in all you’re just another brick in the wall”
–Another Brick In The Wall (Part II)

যে শিল্প নিজের জন্য তা তো মানুষের জন্য হয়ে উঠবেই। পিংক ফ্লয়েড ফিরিয়ে আনে করুণ আকুতি। সে বলে নিঃশ্বাস নাও। ছাড়ো। দেখো কেমন আদিম ও পবিত্র হয়ে উঠেছ তুমি। কেমন লাগে প্রতিদিন নোংরা ও সুন্দরের ভেতর বেঁচে থাকতে। মিউজিক পবিত্র জিনিস। যেমন আমরা। গ্রহণ করো। দুঃখই তোমার সুন্দরের প্রস্তাবনা। একটা লাশকাটা ঘর। একটা দৃশ্য ও সিম্বলিক অনুভূতি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছে হিমমগ্ন গভীরে। মরণফাঁদ। শিকার। সফলতার চেয়ে সুখি হও। নিজের কাছে।

‘‘Breathe, breathe in the air
Don’t be afraid to care
Leave but don’t leave me
Look around and choose your own ground”
–Breathe


এক
গোলন্দাজ,
যার স্বপ্ন নিহত
হয়েছে যুদ্ধে। আর
স্মৃতির ফাঁদ থেকে বের
হতে পারছেন না
তিনি

গিলমোর যখন তার গিটার থেকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন স্মৃতিমগ্ন ‘ইকোস’, তখন বেদনার্ত স্বরে গানারদের গল্প করছেন ওয়াটার্স। এক গোলন্দাজ, যার স্বপ্ন নিহত হয়েছে যুদ্ধে। আর স্মৃতির ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন না তিনি। রাতের পর পর সেই স্বপ্ন পাগল করে দিচ্ছে।

‘‘Night after night, going ’round and ’round my brain
His dream is driving me insane’’
–The Gunner’s Dream

কেবল তা নয়, ওয়াটার্স চান এক মুক্ত রাজহংস। যে হতে চায় এক দেরি করে ঘরে ফেরা ট্রেন। একাকীত্বে কাঁদতে চান একাকীত্বে। কখনো পাগল হয়ে গেলে তাকে কি খেলায় নেওয়া হবে? এত সহজভাবে ওয়াটার্স কথাগুলো বলে যান, মনে হয়, এ তো প্রতিটি মানুষের গল্প।

“If I were alone, I would cry
And if I were with you, I’d be home and dry
And if I go insane
Will you still let me join in with the game?”
–If

রজার ওয়াটার্স

তেমনি তিনি মায়ের কাছ জিজ্ঞেস করছেন, বিপদে-আপদে কী করতে তাকে। একেকটি খণ্ড দৃশ্যের মতো মায়ের কাছ থেকে অনেক জিজ্ঞেসা নিয়ে বসে আছে সন্তান। মা জানেন ছেলের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব। আর সান্ত্বনার স্বরে বলছেন, ‘চুপ থাক খোকা, খোকারে, কান্দিস না আর।’

“অ মা, আমার কি দৌঁড়ানো উচিৎ প্রেসিডেন্ট পদের তরে?
মা রে, আমার কি তবে বিশ্বাস রাখা উচিৎ সরকারে?
মা, তারা কি আমাকে দাঁড় করাবে ফায়ারিং লাইনে তয়?
আহারে, জীবন মানে কি মা তবে সময়ের অপচয়?
চুপ থাক খোকা, খোকারে, কান্দিস না আর”

“Mother, should I run for president?
Mother, should I trust the government?
Mother, will they put me in the firing line?
Ooh, aah, is it just a waste of time?
Hush now, baby, baby, don’t you cry”
Mother


নোট:
লেখাটি প্রথমে রক মিউজিক ভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘রকাহোলিক’র প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। 'লালগান'-এ তার সংশোধিত ও বর্ধিত সংস্করণ ছাপা হলো।

দ্য ওয়াল-এর কাভার

লাইনআপ

নিক ম্যাসন [ড্রামস, পারকাসন, ভোকাল; ১৯৬৫-৯৫, ২০০৫, ২০১২-১৪]
রিচার্ড রাইট [কীবোর্ডস, পিয়ানো, অরগান, ভোকাল; ১৯৬৫-৭৯, ১৯৯০-৯৫, ২০০৫]
রজার ওয়াটার্স [বেজ, ভোকাল, রিদম গিটার; ১৯৬৫-৮৫, ২০০৫]
সিড ব্যারেট [লিড ও রিদম গিটার, ভোকাল; ১৯৬৫-৬৮]
বব ক্লোস [লিড গিটার; ১৯৬৫]
ডেভিড গিলমোর [লিড ও রিদম গিটার, ভোকাল, বেজ, কীবোর্ডস; ১৯৬৭-৯৫, ২০০৫, ২০১২-১৪]

স্টুডিও অ্যালবাম

দ্য পিপার অ্যাট দ্য গেটস অব ডন [১৯৬৭]
অ্যা সসারফুল অব সিক্রেটস [১৯৬৮]
মোর [১৯৬৯]
উম্মাগুম্মা [১৯৬৯]
অ্যাটম হার্ট মাদার [১৯৭০]
মেডল [১৯৭১]
অবসকিউরড বাই ক্লাউড [১৯৭২]
দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন [১৯৭৩]
উইশ ইউ অয়্যার হেয়ার [১৯৭৫]
অ্যানিমেলস [১৯৭৭]
দ্য ওয়াল [১৯৭৯]
দ্য ফাইনাল কাট [১৯৮৩]
অ্যা মোমেন্টারি লেপ্স অব রিজন [১৯৮৭]
দ্য ডিভিশন বেল [১৯৯৪]
দ্য এন্ডলেস রিভার [২০১৪]

Print Friendly, PDF & Email
কবি; ঢাকা, বাংলাদেশ ।। কবিতার বই: কানা রাজার সুড়ঙ্গ [২০১৫], উইডের তালে তালে কয়েকজন সন্ধ্যা [২০১৮] ও তুমুল সাইকেডেলিক দুপুরে [২০২০]। ছোটগল্পের বই: ডিনারের জন্য কয়েকটি কাটা আঙুল [২০২০]

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here