নভেম্বর রেইন: গানস এন’ রোজেসের পতনেরও কারণ?

0
115
গানস এন' রোজেস

লিখেছেন: টিম গ্রিয়ারসন
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

১৯৯০-এর দশকের পথচলা তখন সবে শুরু; এমন সময়ে গানস এন’ রোজেস-এর ‘নীল নকশা’ আঁকতে শুরু করেছিলেন অ্যাক্সেল রোজ। নিজেদের সহজাত অভিষেক অ্যালবাম অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর সাফল্য এবং এর পরবর্তী ইপি জি এন’ আর লাইস ঘিরে, বর্ণবাদী ও হোমোফোবিক ওয়ান ইন অ্যা মিলিয়নসহ বিবিধ বিতর্কের পর এ ব্যান্ডের কাছ থেকে এরপর কী আসতে যাচ্ছে– তা নিয়ে অনুমানের শেষ ছিল না। যে ট্র্যাকগুলো নিয়ে কাজ করছিলেন, সেগুলো সম্পর্কে এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলার সময় রোজ ছিলেন আত্মবিশ্বাসী। বলে নেওয়া ভালো, সেই ট্র্যাকগুলো পরবর্তীকালে ইউজ ইউর ইল্যুশনস অ্যালবামগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু গানের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রবল ছিল রোজের; বলেছিলেন, ‘যেভাবে চাচ্ছি, সেভাবেই যদি গানগুলো হয়ে ওঠে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা এই ব্যান্ডের সবচেয়ে বড় কাজগুলো হতে যাচ্ছে। আমার নিজের কাছে সত্যিকার অর্থে ঋদ্ধ ট্যাপেস্ট্রি ও কাজের জিনিস বলে মনে হচ্ছে, এমন কিছু ব্যালেড লেখার কাজ করছি আমি; আর নিশ্চিত করছি, প্রতিটি নোটের ইফেক্ট যেন যথাযোগ্য হয়। (কেননা) সঠিক নোট একে হতেই হবে, এবং সঠিক রাস্তায় একে থাকতেই হবে, এবং সঠিক ইফেক্ট একে পেতেই হবে; বুঝলেন?’

সুইট চাইল্ড ও’ মাইন ব্যালেডটি ছিল অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর সে সময় পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হিট; এটি এখনো এই ব্যান্ডের একমাত্র ‘নম্বর ওয়ান’; তবে রোজ অবশ্য মনে করেন, নভেম্বর রেইন দিয়ে ওই ট্র্যাককে তার পক্ষে টপকে যাওয়া সম্ভব ছিল। এ এমনই এক গান, ধরতে গিয়ে প্রায় এক দশক যেটির পিছু নিয়েছিলেন তিনি। ট্র্যাকটির প্রথম যে জিনিস তার মাথায় আসে, তা হলো– সেই এপিক পিয়ানো অ্যানথেম।

নভেম্বর রেইন । গানস এন’ রোজেস । অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও

তিনি যখন ছোট, যখন থাকতেন ইন্ডিয়ানায়, যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে এসে একদিন রক স্টারডমের সন্ধানে রত হবেন– এমন দিবাস্বপ্নে ছিলেন বিভোর, সেই সময়ে এই অ্যানথেম মাথায় আসে তার। অবশেষে জিএনআর [গানস এন’ রোজেস] যখন নভেম্বর রেইন-এর রেকর্ড করতে পারল, ততদিনে এটি দুনিয়ার সম্ভবত সবচেয়ে বড় ব্যান্ডে পরিণত হয়েছে, আর রোজ সবচেয়ে সুনিশ্চিতভাবেই একটি নিজের-আগুন-নিজেই-জ্বালো ধরনের দাপুটে ব্যালেড তৈরির চেষ্টা করছিলেন, যেটির পক্ষে তাদের সম্ভাব্য যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিকে একেবারেই জব্দ করে ফেলা সম্ভব।

নভেম্বর রেইন ছিল একটি দানব, এবং একইসঙ্গে পরিহসনীয় সৃষ্টিও– যার উত্থান দ্বিগুণ ঘটেছে এর ভিডিও প্রকাশের পর। এটি এই ব্যান্ডের সবচেয়ে অমোচনীয় প্রেমের গানগুলোর একটি। একইসঙ্গে, গিটারিস্ট স্ল্যাশের মতে, এটি ‘আমাদের ব্যান্ডের ভাঙনেরও আওয়াজ।’


নারীদের
সহজেই বশ
করে ফেলার মতোই
তাদের যৌন উপাদান হিসেবে
ব্যবহার করে নিজের সহিংসতার
শিকারে পরিণত করে ফেলাটা
ছিল তার কাছে স্রেফ
বাঁ হাতের
খেলা!

১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে, যখন থেকে জিএনআর-এর লিকলিকে ও বালকসুলভ ফ্রন্টম্যান হিসেবে রোজের আবির্ভাব ঘটে, তিনি তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এই মনোমুগ্ধকর বৈপরীত্য সবসময়ই ধরে রেখেছিলেন। গীতিকার হিসেবে তার ছিল সংবেদনশীলতা ও আবেগপ্রবণতার তুখোড় সক্ষমতা; ফলে নারীদের সহজেই বশ করে ফেলার মতোই তাদের যৌন উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে নিজের সহিংসতার শিকারে পরিণত করে ফেলাটা ছিল তার কাছে স্রেফ বাঁ হাতের খেলা! (দুর্ভাগ্যক্রমে নিজের এই ক্ষমতাকে দৃশ্যত কাব্যিক করে তুলতে পারেননি তিনি: নিপীড়নের দায়ে হয়েছিলেন অভিযুক্ত।)

এই ক্রোধ ও যন্ত্রণা তার ভেতর শৈশব থেকেই ছিল। কেননা, তিনি দাবি করেছেন, নিজের জন্মদাতা বাবার কাছেই যৌন নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছিল তাকে। সৎ-বাবার কাছেও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হয়েছেন বলে দাবি তার।

‘এই লোকের সঙ্গে আমার মায়ের সম্পর্ক দেখে নারীদের সম্পর্কে আমার মনে ব্যাপক হিংস্র ও নিপীড়ক ভাবনার উদ্রেক ঘটেছিল,’ নিজের জন্মদাতা বাবা সম্পর্কে ১৯৯২ সালে বলেছেন রোজ। ‘আমার তখন ২ বছর বয়স। আমি ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ। তখন এমনটা দেখেছি। আমি বুঝলাম, নারীর সঙ্গে এমন আচরণ করতে হয়। যৌনতা কীভাবে শক্তি হয়ে ওঠে এবং যৌনতা কীভাবে আপনাকে শক্তিহীন করে তোলে– আমি আসলে এসব নিয়ে ভাবতাম; নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে আমার মধ্যে প্রচুর বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি জেগে উঠেছিল।’

দুনিয়া সম্পর্কে ক্রুদ্ধ ও বিষাক্ত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও রোজের ভেতর অবশ্য কোমলতার প্রতি অনুরাগও ছিল। যে শিল্পী ওয়ান ইন অ্যা মিলিয়ন-এ উগ্র হোমোফোবিয়া জাহির করেছেন, সেই একই শিল্পীর ছিল এলটন জনের প্রতি নিখাদ অনুরাগ; জন্মশহর ইন্ডিয়ানা থেকে বাসে চেপে লস অ্যাঞ্জেলেসে বন্ধু জেফ ইসবেলের [জিএনআর-এ যিনি নিজের নাম বদলে রাখেন ইজি স্ট্র্যাডলিন] সঙ্গে দেখা করতে ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে আসা-যাওয়ার কালে সেই রোজই এমন কিছু পিয়ানো কর্ডের কথা ভাবতে থাকেন, যেগুলো শুনতে এলটন জনের সাউন্ডের মতো। বলে রাখা ভালো, নভেম্বর রেইন মূলত জনের ১৯৭৩ সালের মাস্টারওয়ার্ক অ্যালবাম গুডবাই ইয়েলো ব্রিক রোড-এর ওপেনিং স্যালভোতে থাকা ফিউনারেল ফর অ্যা ফ্রেন্ড/লাভ লাইস ব্লিডিং গানেরই একটি শক্তিশালী অনুস্মৃতি।

গানস এন' রোজেস
গানস এন’ রোজেস। শুরুর দিকে

এটি কোনো সচেতন শ্রদ্ধাঞ্জলি হোক কিংবা না হোক, এই গান রোজের মাথায় গড়ে উঠছিল এমন একজন মিউজিশিয়ানের প্রতি স্যালুট জানানোর উদ্দেশ্যে– যিনি একজন পারফরমার হিসেবে তাকে [রোজ] গভীরভাবে গড়ে দিয়েছিলেন। ‘সব ধরনের ভিন্ন ভিন্ন স্টাইলে গান গাওয়া কীভাবে সম্ভব– এ কথা যদি জানতে চান, তাহলে এলটন জনের মতো গাওয়ার চেষ্টা করুন: ব্লুজ থেকে শুরু করে যেকোনো ধরনের…,’ একবার বলেছিলেন রোজ। ‘আমেরিকার রেডিওগুলো লেড জেপলিন, দ্য বিটলসদ্য স্টোনস-এর মতো স্পেস কেন যে এলটন জনকে দেয় না, ভেবে অবাক লাগে আমার।’

রোজ যখন স্থায়ীভাবে লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে এসে ব্যান্ডের দুই গিটারিস্ট– স্ট্যাডলিন ও স্ল্যাশ, বেজিস্ট ডাফ ম্যাকক্যাগান ও ড্রামার স্টিভেন অ্যাডলারের সঙ্গে যোগ দিলেন, এরপর তারা তাদের অভিষেক অ্যালবাম অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর ট্র্যাকগুলোর কাজ করতে থাকেন। এমনকি তখনো রোজের মাথায় একেবারেই স্পষ্ট ধারণা ছিল– কেমন হতে যাচ্ছে নভেম্বর রেইন। আসলে, অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর একজন সম্ভাব্য প্রডিউসারকে গানটি বাজিয়েও শুনিয়েছিলেন তিনি; তবে বলে দিয়েছিলেন, ‘এই গান দ্বিতীয় অ্যালবামের জন্য।’

অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন মুক্তি পায় ১৯৮৭ সালের জুলাইয়ে, তবে খ্যাতি পেতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যায় অ্যালবামটির। আসলে, এ নিয়ে একটি গল্প এখন রীতিমতো কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে: জিএনআর-এর লেবেল কোম্পানিটি এমটিভিকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে অ্যালবামটির বাজখাই ওপেনিং ট্র্যাক ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল-এর ভিডিওটি সম্প্রচারের ব্যাপারে রাজি করিয়ে ফেলেছিল। কোনো এক রোববারের খুব সকালে অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেটি সম্প্রচার করে ওই চ্যানেল।

ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল । গানস এন’ রোজেস । অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও

মাত্র একবার সম্প্রচারের পরই অডিয়েন্স ওই ক্লিপের জন্য উন্মাদ হয়ে ওঠে, বিশেষত টেলিজেনিক রোজের প্রতি। ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল-এর ভিডিও ডিরেকশন দিয়েছিলেন যিনি, সেই নাইজেল ডিকের অনুমান করতে পেরেছিলেন, এই গায়কের প্রতি নারী ভক্তদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হবে। “মনে পড়ে, মনিটরের দিকে তাকিয়ে আমি ভাবছিলাম, ‘এটা ফালতু কাজ, একেবারেই মামুলি কাজ,’” ভিডিওটির শুটিং সম্পর্কে বলেছিলেন তিনি রোলিং স্টোন-এ। “লেবেল কোম্পানিটির কিছু মেয়ে তো আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল; তাদের একজন বলেছিল, ‘আরে, এটা তো ফাকিং কুল টাইপের জিনিস!’ মুহূর্তেই নিজের মন্তব্য পাল্টে নিয়েছিলাম আমি। কেননা, তাদের মনে হয়েছিল, তিনি [রোজ] সত্যিই খুব হট!”

১৯৮০-এর দশকটি ছিল ব্যাড-বয় মেটাল ব্যান্ডগুলোর সময়– এগুলোর কোনো কোনোটি ছিল অন্যগুলোর তুলনায় বেশি চিজি ও হেয়ার-মেটালধর্মী; আর এইসব ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যানেরা দেখতে একেকজন সুশ্রী লোক– এটা কোনো বিরল ব্যাপার ছিল না তখন। তবে রোজ ছিলেন নিজ জীবনের সবচেয়ে সুশ্রী অবস্থায়; তার চেহারার মধ্যে এমনই একটা মেয়েলি কোমলতা ছিল– যা তার (লেখা) গানের কথাগুলোতে ফুটে ওঠা অবক্ষয় ও ক্রোধকে যেন মিথ্যে বলে জানান দিচ্ছিল।


‘মানসিক
চাপে থাকলে
আমি হিংস্র হয়ে
উঠি এবং সেই চাপকে
নিজের ভেতর থেকে
বের করে
আনি’

কী করে নিজের আবেগগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া করেন, সেই প্রসঙ্গে ১৯৮৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘মানসিক চাপে থাকলে আমি হিংস্র হয়ে উঠি এবং সেই চাপকে নিজের ভেতর থেকে বের করে আনি…। যখন উন্মাদ কিংবা বিমর্ষ কিংবা আবেগি হয়ে উঠি, কখনো কখনো সব ছেড়ে-ছুড়ে পিয়ানো বাজাতে শুরু করি।’

অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন সেশনগুলোর সময় ব্যান্ডটি নভেম্বর রেইন-এর বেশ কয়েকটি ভার্সন তৈরি করেছিল; এর মধ্যে একটি ছিল এক অ্যাকুস্টিক-গিটার টেক; যদিও এমনকি ১৯৮৬ সালের রেকর্ডিংয়ের সময়ও ব্যাপারটি পরিষ্কারই ছিল যে, পিয়ানোতেই এই গান ভালো মানাবে, এবং বাণিজ্যিক রেডিওগুলো প্রচারের পক্ষে প্রতিবন্ধক হবে না– এমন সময়ব্যাপ্তিতে নামিয়ে আনতে হবে। (বলে রাখা ভালো, ৫ মিনিটের কাছাকাছি কোনো গান হলেই প্রোগ্রামাররা বিচলিত হয়ে উঠেন– এমন একটা প্রবণতা রয়েছে।) পরবর্তীকালে অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর ডিলাক্স অ্যানিভার্সারি এডিশনে প্রকাশ পাওয়া ১০ মিনিটের ভার্সনটিই অবশ্য সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর; বাগাড়ম্বরতা পরিহার করে গানের সেই ভার্সন ইউজ ইউর ইল্যুশন ওয়ান-এও জায়গা দেওয়া হয়েছে। কণ্ঠে কাচা বেদনা নিয়ে দূরবর্তী প্রেমিকার উদ্দেশে রোজের সেই গান হৃদয় খুঁড়ে আনে, সরাসরি প্রকাশের ধরণে।

‘এটা আমাদের লায়লা গান,’ রোজ বলতেই পারেন ডেরেক অ্যান্ড দ্য ডমিনোস-এর হিট গানটির ইঙ্গিত করে, যেখানে নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড জর্জ হ্যারিসনের স্ত্রী প্যাটি বয়েডের প্রতি নিজ কামনার বার্তা উন্মোচন করে দিতে দেখি এরিক ক্ল্যাপটনকে। ব্যাপারটি স্রেফ এটুকুই নয়। নভেম্বর রেইন-এর মতো লায়লাও প্রতিদানহীন ভালোবাসার একটি গান: দুটি গানই এমনতর দীর্ঘসময়ব্যাপ্তির ব্যালাড, যেখানে একটি নাটকীয় পরিসমাপ্তি রয়েছে– যা কিনা একটি ধ্বনিত মোচড়ের ছাপ রেখে যায়।

লায়লাকে রোজ হরদমই সর্বকালের সেরা গানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করেছেন– আরও দুটি আকুলভাবে স্প্রাউলিং টিউনের গান– মেটালিকাফেড টু ব্ল্যাক১০সিসিআ’ম নট ইন লাভ-এর পাশাপাশি। (রোজ স্বীকার করেছেন, ‘ক্রুশের মতো উদ্ভটভাবেই মনে হয় যেন, এগুলো আসলে আমার সর্বকালের প্রিয় তিন গান।… যথেষ্ট বড় হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত লায়লাকে আমি ঠিকঠাক উপলব্ধি করতে পারিনি।’)

১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে গানস এন’ রোজেস যখন ইউজ ইউর ইল্যুশন অ্যালবামগুলোর রেকর্ডিংয়ের কাজে সমবেত হলো, তাদের অবস্থা তখন ভীষণ রকমের জনপ্রিয় অথচ অভ্যন্তরীণ কলহের কারণে ভেঙে পড়া একটি ব্যান্ড। তখন ব্যান্ড সদস্যদের মধ্যে হরদম ঝগড়া লাগত, এমনকি জনসমক্ষেও নোংরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তেন তারা; যেমন ধরুন, ১৯৯১ সালে সেন্ট লুইসের একটি শোতে ক্যামেরার সামনে সংগীতানুষ্ঠান করা নিয়ে বাজে রকমের মাথা গরম করেন রোজ, আর ঝাঁপ দেন দর্শকদের ওপর; ভেবেছিলেন, দর্শকরা তাকে লুফে নেবে। কিন্তু তা না হওয়ায় নিচে পড়ে যান রোজ, আর রেগে গিয়ে স্টেজ তছনছ করে ফেলেন, আর পাগলের মতো দর্শকদের অভিসম্পাত করতে থাকেন।

ইউজ ইউর ইল্যুশন

এ ঘটনার এক বছর আগে, অ্যাডলারকে লাইনআপ থেকে সরিয়ে দিয়ে, তার জায়গায় ড্রামার হিসেবে নেওয়া হয় ম্যাট সরামকে। পরবর্তীকালে অ্যাডলার বলেছিলেন, ‘পার্টি করার দায়ে আমাকে ব্যান্ড থেকে লাথি মেরে বের করে দেওয়া হয়েছিল, অথচ পরিহাসের বিষয়, আমি কিন্তু এই ব্যান্ডের সদস্যদের সঙ্গেই পার্টি করেছিলাম।’

ইল্যুশন সেশনগুলো দিনে দিনে শুধু টেনশনই বাড়িয়েছিল: নতুন এই অ্যালবামগুলোকে অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর চেয়েও আরও বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও রোমাঞ্চকর করে তুলতে চেয়েছিলেন রোজ; নিজের সমগোত্রীয়দের ঠেলে দিয়ে ছিলেন উন্মত্ত প্রক্রিয়ার ভেতর। ইল্যুশনস যমজ অ্যালবাম তৈরির স্মৃতিচারণায় পরবর্তীকালে স্ল্যাশ বলেছেন, ‘গানস এন’ রোজেস-এর সবচেয়ে স্বেচ্ছাচারি ৩৫টি গান’ তৈরি করা হয়েছিল এ জন্য। ‘বেশির ভাগ ব্যান্ডের ক্ষেত্রেই এতগুলো গান তৈরি করতে অন্তত ৬ বছর লেগে যাওয়ার কথা।’

ওইসব গানের বেশির ভাগই ব্যান্ডের কয়েক সদস্য যৌথভাবে লিখলেও, নভেম্বর রেইন ছিল একান্তই রোজের সন্তান। গানটিকে যথাযোগ্য করে তোলার ব্যাপারে তার আচ্ছন্নতাকে হয়তো বিস্ময়কর হিসেবে গণ্য করা না গেলেও, এটিকে আরও বেশি জটিল করে তুলতে তিনি খেটে গেছেন।

‘আমাদের কাছে পিয়ানো ছিল, ছিল অর্কেস্ট্রা, ব্যাকআপ সিঙ্গার এবং সব ধরনের জঘন্য জিনিসপত্র– যেগুলো একটি ব্যান্ড হিসেবে আমাদের কাছে থাকা জরুরি ছিল না,’ ওয়াচ ইউ ব্লিড: দ্য সাগা অব গানস এন’ রোজেস বইয়ে বলেছেন স্ল্যাশ। ‘তবু এগুলো থাকুক– তা চেয়েছিল অ্যাক্সেল, আর তা সে পেয়েছে।’

একই বইয়ে অবশ্য সরাম অভিযোগ তুলেছেন, “আমার মনে হয়েছিল, আমি আসলে এইসব ব্যালেডধর্মী কাজকারকার করার জন্য এই ব্যান্ডে যোগ দিইনি। বরং আমি একটি ব্যাডঅ্যাশ বা মাথানষ্ট ধরনের রক-এন-রোল ব্যান্ডে যোগ দেওয়ার আশা করেছিলাম। তাই মনে হয়েছিল, ‘পিয়ানো দিয়ে আমাদের কাজটা কী, শুনি?’”

প্রায় ৯ মিনিট সময়ব্যাপ্তির নভেম্বর রেইন ছিল এমন একটি প্রবল দাপুটে গান, যেটির লক্ষ্য ছিল স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন [লেড জেপলিন] কিংবা ড্রিম অন-এর এরোস্মিথ মতো ১৯৭০-এর দশকের অ্যানথেমগুলোর মহিমাকে উড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এলটন জন রয়ে গিয়েছিলেন সেই সনিক নর্থ স্টার। ‘ড্রামের পূর্ণতা ও সার্বিক টোনের অনুপ্রেরণা হিসেবে আমরা এলটন জন শুনতাম,’ সরাম বলেছেন রোলিং স্টোনকে। ‘অ্যাক্সেলের সঙ্গে বসে ডোন্ট লেট দ্য সান গো ডাউন অন মি শোনার এবং সেই টম ফিলসের স্টাইলকে অ্যাক্সেলের চিহ্নিত করার কথা আমার এখনো মনে পড়ে।’

লিরিকের ক্ষেত্রে একটি ব্যর্থ প্রেমের প্রতি নিজের অন্তরের সব নির্যাস ঢেলে দিয়েছেন রোজ; আর আশা জারি রেখেছেন, তার ও সেই মেয়ের মধ্যকার ব্যাপারস্যাপার হয়তো বেশিদূর গড়াবে না:

‘তোমার চোখের দিকে তাকাই যখন
দেখি, ভালোবাসা ঘাপটি মেরে আছে
অথচ প্রিয়তমা, যখন জড়িয়ে ধরি তোমাকে
জানো না কি তুমি– একই রকম লাগে আমার?

কেননা, টিকে না কিছুই চিরকাল
আর, আমরা দুজনই তো জানি– পাল্টাতে পারে মন
আর, ধরে রাখা কঠিন ভীষণ কোনো মোমবাতি–
নভেম্বরের শীতল বৃষ্টির ভেতর…’

[হোয়েন আই লুক ইনটু ইউর আইজ/ আই ক্যান সি অ্যা লাভ রেস্ট্রেইন্ড/ বাট ডার্লিং হোয়েন আই হোল্ড ইউ/ ডোন্ট ইউ নো আই ফিল দ্য সেম?// ’কজ নাথিং লাস্টস ফরেভার/ অ্যান্ড উই বোথ নো হার্টস ক্যান চেঞ্জ/ অ্যান্ড ইট’স হার্ড টু হোল্ড অ্যা ক্যান্ডেল/ ইন দ্য কোল্ড নভেম্বর রেইন…]

অবশ্য এ কথার পরপরই ছিদ্রান্বেষি ব্যাপারও প্রত্যাখ্যান করে রোজ এমন বিশ্বাস জাহির করেন, ‘জানি তুমি পারবে ভালোবাসতে আমায়/ যখন দোষ দেওয়ার মতো থাকবে না আর কেউ…’ [আই নো দ্যাট ইউ ক্যান লাভ মি/ হোয়েন দেয়ার’স নো ওয়ান লেফট টু ব্লেম…]।

‘অন্ধকার দেখে ভড়কে যেও না
রাস্তা একটা খুঁজে নেব আমরা– ঠিক
কেননা, টিকে না কিছুই চিরকাল
এমনকি নভেম্বরের শীতল বরিষণ…’

[নেভার মাইন্ড দ্য ডার্কনেস/ উই স্টিল ক্যান ফাইন্ড অ্যা ওয়ে/ ’কজ নাথিং লাস্টস ফরেভার/ ইভেন কোল্ড নভেম্বর রেইন…]

এ ছিল একটি দীর্ঘ, গতানুগতিক ও অলংকারপূর্ণ প্রেমের গান। এ এমন ধরনের গান, যেটিকে অ্যাপেটাইট ফর ডিস্ট্রাকশন-এর ১২টি নির্মেদ, র ও ফোকাসড ট্র্যাক থেকে গভীরভাবে আলাদা করে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে হওয়ার কথা। অথচ ইউজ ইউর ইল্যুশন গানগুলোর মধ্যে, এটির সিনেমাটিক স্কোপ হয়ে উঠেছিল একটি কেন্দ্রবিন্দু, আর এ গান সুইট চাইল্ড ও’ মাইন-এর পর এই ব্যান্ডের সবচেয়ে বড় হিট গানে পরিণত হয়।

আই ওয়ান্ট মাই এমটিভি: দ্য আনসেন্সরড স্টোরি অব দ্য মিউজিক ভিডিও রেভোলুশন বইয়ের দুর্দান্ত মৌখিক ইতিহাসে নভেম্বর রেইন ভিডিওর পরিচালক অ্যান্ডি মোরাহ্যান ওই ক্লিপ গড়ে ওঠার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘নিজের বন্ধু ডেল জেমসের লেখা একটি ছোটগল্পকে ঘিরে একটি ভিডিও-ট্রিলজির স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন অ্যাক্সেল। প্রথম ভিডিও হিসেবে আমরা (সেখান থেকে) ডোন্ট ক্রাই নির্মাণ করেছিলাম। অ্যালেক্স তখন রিগ্রেসিভ থেরাপির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন; গুরুতর ডিপ্রেশনের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন, চাইছিলেন মাথা থেকে নিজের মস্তিষ্কটাকে বের করে ফেলতে। তার ব্যক্তিগত উন্মাদনাই এই ভিডিওর স্টোরিলাইনের অংশ হয়ে ওঠে। ব্যান্ড ছেড়ে দিয়েছিলেন ইজি স্ট্র্যাডলিন; ব্যান্ডে ভাঙন তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায় ট্রিলজিটি সম্পর্কে অ্যাক্সেলের মনোভাব ছিল, ‘সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ আমিই করব।’”

ডোন্ট ক্রাই । গানস এন’ রোজেস । অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও

সে সময়ে সুপারমডেল স্টেফানি সিমুরের সঙ্গে প্রেম করছিলেন রোজ। ডোন্ট ক্রাই মিউজিক ভিডিওতে দেখা গেছে এই মডেলকে। সেটিরই ধারাবাহিকতায় নভেম্বর রেইন-এও তাকে রাখার পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল, যেখানে রোজের কনের ভূমিকায় থাকার কথা তার– যতক্ষণ না এক ভয়াবহ ঝড়বৃষ্টি ওই বিয়ের অনুষ্ঠান বিধ্বস্ত করে দেয় (এবং ওই একই ঝড়বৃষ্টির কারণে এ নারী চরিত্রের মৃত্যু হওয়ারও কথা)।

আত্মজীবনীর সঙ্গে ফিকশনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ভিডিওটিতে মডেল এরিন এভারলির সঙ্গে রোজের ব্যর্থ বিয়ে প্রচেষ্টার একটি ইঙ্গিত রাখার কথা ছিল, যেখানে এভারলির চরিত্রে অভিনয় করছেন সিমুর। সে সময়ে এমটিভির প্রভাব যেহেতু ছিল বিরাট, এবং মিউজিক ভিডিওর জন্য লেবেল কোম্পানির বাজেট ছিল দৃশ্যতই সীমাহীন, তাই ক্লিপটির পক্ষে অশ্লীল রকমের বিলাসী হয়ে ওঠাই ছিল যেন নিয়তিনির্ধারিত। ‘নভেম্বর রেইন-এর শুট করতে ১.২৫ মিলিয়ন ডলার লাগবে– বলা হয়েছিল আমাকে,’ আই ওয়ান্ট মাই এমটিভি বইয়ে বলেছেন গানস এন’ রোজেস-এর প্রাক্তন ম্যানেজার অ্যালান নাইভেন, ‘যা কিনা আমার কাছে অহেতুক অর্থনষ্ট বলেই মনে হয়েছে।’ বিশেষত, একটা ভিডিওর জন্য এত টাকা খরচ করার মানে ছিল না।

নভেম্বর রেইন। মিউজিক ভিডিওর দৃশ্যে রোজ ও সিমুর

ডোন্ট ক্রাই কিংবা নভেম্বর রেইন-এর ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, সে কথা জানতে চাওয়া হলে গানস এন’ রোজেস সদস্যরা জানিয়েছিলেন, তারা আসলে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। বহু বছর পর, ইউটিউবে এমনসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, যেখানে ভক্তরা যে যার মতো ব্যাখ্যা দিতে থাকেন– নভেম্বর রেইন-এর সমাপ্তি অংশে কেন কফিনে শোয়া অবস্থায় সিমুরকে দেখতে পান তারা। নারীটি কী ঝড়বৃষ্টিতে ডুবে গিয়েছিল? ডোন্ট ক্রাই-এ আসলেই কি সে ডুবে গিয়েছিল? সে কি কোনো শটগানের গুলিতে মরে গেছে? যদি তা-ই হয়, সে কি আত্মহত্যা করেছে? নাকি রোজ তাকে মেরে ফেলেছেন? বিয়ের ব্যাপারটি কি নিছকই কোনো স্বপ্ন ছিল? কী এমন জিনিস ওই ক্লিপের স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দিল, এ নিয়ে কারও কোনোই ধারণা রয়েছে বলে মনে হয় না। আপনার পক্ষে স্রেফ তাকিয়ে থেকে– যা ঘটছে, তা দেখা ছাড়া, কিছুই করার নেই।


‘অ্যাক্সেল রোজের সঙ্গে
সম্পর্কে জড়ানো?
নিছকই একটা
ভুল ছিল’

নভেম্বর রেইন ভিডিও বানানোর পরপরই অবশ্য সিমুর ও রোজের সম্পর্ক ভেঙে যায়। ‘অ্যাক্সেল রোজের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো? নিছকই একটা ভুল ছিল,’ ২০১৪ সালে বলেন সিমুর। ‘এ থেকে আমি অবশ্য বহু কিছু শিখেছি। সে ছিল এক হিংস্র লোক; আমি বুঝে গিয়েছিলাম, তাকে নিজের আশেপাশে আর কখনোই দেখতে চাই না। রক-এন-রোল ঘিরে পুরো থ্রিলই কেটে গিয়েছিল আমার। দুনিয়ার সবচেয়ে নোংরা চেহারা দেখা হয়ে গিয়েছিল, আর সেটা আমার জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল।’

সে সময়ে অবশ্য শারীরিক নির্যাতন ও গালিগালাজ-সহ আরও কিছু অভিযোগে সিমুরের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন রোজ। অন্যদিকে, রোজের বিরুদ্ধে নিপীড়নের মামলা করে সেই মামলায় এভারলিকে সমন পাঠিয়েছিলেন সিমুর; আর তাতে সাড়া দিয়ে এভারলি ফাঁস করে দিয়েছিলেন রোজের হাতে নিজে নিপীড়িত হওয়ার কালো ইতিহাস।

এস্ট্রেঞ্জড । গানস এন’ রোজেস । অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও

এই ট্রিলজিতে রোজের তৃতীয় ও শেষ অধ্যায়টি– সেই ইউজ ইউর ইল্যুশন ব্যালেড– এস্ট্রেঞ্জড-এর ভিডিওটিও সমান বোম্বাস্টিক; আর সেখানে (রোজ-সিমুর) ব্রেকআপটির কারণে কাহিনির পুনর্গঠন করা ছাড়া উপায় ছিল না। এস্ট্রেঞ্জডও পরিচালনা করেছেন মোরাহ্যান। আই ওয়ান্ট মাই এমটিভি বইয়ে তিনি বলেন, রোজ তাকে বলেছিলেন, ‘ভিডিওতে আর কখনো কোনো মেয়েকে রাখতে চাই না আমি। তারচেয়ে বরং কোনো ডলফিন রাখব।’ এ কারণেই ব্যাখ্যাতীতভাবে রোজকে এস্ট্রেঞ্জড ক্লিপে ডলফিনের সঙ্গে সাঁতরে বেড়াতে দেখা যায়!

গানটির উড্ডয়নশীল অপেরাধর্মীতা এবং এর ভিডিওটির অতিকায় আড়ম্বর ও পরিমণ্ডল নভেম্বর রেইনকে গানস এন’ রোজেস-এর নির্লজ্জ বাড়াবাড়িপনার শীর্ষবিন্দুর সংকেতে পরিণত করেছে; এবং বিশেষত, সবকিছুকে যতটা সম্ভব অতিরিক্ত মাত্রায় উত্তেজিত করে তোলার ব্যাপারে রোজের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এটি সফল। ইউজ ইউর ইল্যুশন রেকর্ডগুলো ছিল প্রকাণ্ড– প্রতিটিই সেপটিউপল-প্ল্যাটিনাম; তবে ১৯৯২ সালে গ্রীষ্ম নাগাদ একটি ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল– সে সময়কার সবচেয়ে ‘কুল’ রক ব্যান্ডের তকমা আর গানস এন’ রোজেস-এর নেই।


রোজের প্রতি অভক্তি ছিল
নির্ভানার ফ্রন্টম্যান
কার্ট কোবেইনের

নির্ভানানেভারমাইন্ড প্রকাশ পায় ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে, গানস এন’ রোজেস-এর অ্যালবাম দুটির এক সপ্তাহ পরে; আর সেটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘নম্বর ১’ অ্যালবামের জায়গা নিজের করে নেয় জানুয়ারিতে। রোজের প্রতি অভক্তি ছিল নির্ভানার ফ্রন্টম্যান কার্ট কোবেইনের; বস্তুত, নির্ভানার নারীবাদী ও পাংক-প্রভাবিত সাউন্ড শুনতে সেই পৌরুষদীপ্ত ও সানসেট-স্ট্রিপ তন্দ্রা-ভাবের প্রতি একটি তীব্র তিরষ্কার বলে মনে হতো– যেটির আওয়াজ ছড়িয়েছিল গানস এন’ রোজেস। সিয়াটল ট্রায়োর ক্ষেত্রে রকের দাম্ভিক ও গিঁটবদ্ধ আমিত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন রোজ।

“ভিডিওকে যখন কোনো মিউজিশিয়ান ‘মিনি-মুভি’ বলে ডাকতে শুরু করেন, তখন বুঝতে হবে– তার প্রস্থানের সময় এসে গেছে,” নির্ভানার ড্রামার ও পরবর্তীকালে ফু ফাইটারস-এর লিডার ডেভ গ্রোহল বলেছেন আই ওয়ান্ট মাই এমটিভিতে। ‘কিছু ভিডিও আমার ভালো লাগার কারণ ছিল স্রেফ, সেগুলো ছিল ট্রেনের ধ্বংসাবশেষ; যেমন ধরুন, নভেম্বর রেইন। টিভিতে আমি এটি এ ভাবনা থেকেই দেখেছিলাম যে, সেই নয়টি মিনিটের কোনোই দরকার ছিল না আমার।’

১৯৯৩ সালের কাভার অ্যালবামদ্য স্পাগেটি ইনসিডেন্ট? শ্রোতাদের কাছ থেকে একেবারেই সাড়া না পেলে মূলত দীর্ঘ শীতনিদ্রায় চলে যায় গানস এন’ রোজেস। ব্যান্ড থেকে বাকি সবাইকে ছেটে ফেলেন রোজ; ভাড়া করে আনেন একদল লোককে, তাদের মধ্যেও কাউকে কাউকে ছেটে ফেলে অন্যদের ভাড়া করেন; এভাবে জোড়াতালি দিয়ে পরের দেড় দশক কাটানোর ফল– চায়নিজ ডেমোক্রেসি অ্যালবাম।

এ সময়কালের মধ্যেই গানস এন’ রোজেস পরিণত হয় একটা পাঞ্চলাইনে– একদার দাপুটে হার্ড রক ব্যান্ড পরিণত হয় একটি সেলফ-প্যারোডিতে, আর নভেম্বর রেইন আবদ্ধ হয়ে ওঠে শীর্ষ থেকে তাদের সেই পতনের উদাহরণ-বিন্দু হিসেবে। ভিডিওটি নিয়ে হাসি-মশকরা শুরু হতেও সময় লাগেনি বেশি; বিশেষত (ব্রিটিশ কমিক সিরিজ) ফ্রেঞ্চ অ্যান্ড সান্ডার্স-এ।

তবে নস্টালজিয়া খুবই মজার জিনিস! ২০১৬ সালে রোজ আর স্ল্যাশ ঝগড়া মিটিয়ে আবারও জোট বাঁধেন এবং ‘ফিরে আসা’র একগুচ্ছ সফল ট্যুর করেন। ২০১৮ সালে সবচেয়ে পুরনো ভিডিও হিসেবে ইউটিউবে ১ বিলিয়ন ভিউ হয় নভেম্বর রেইন-এর। ১৯৯০-এর দশকের শুরুর ভাগ থেকে এখন পর্যন্ত গানস এন’ রোজেস যদি একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক শক্তি না-ও হয়ে থাকে, তাদের সবচেয়ে বেহায়া ব্যালাডটিও সাংস্কৃতিক চৈতন্যের ভেতর কোনো না কোনোভাবে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পেরেছে।

আর সেটিরই ফায়দা নিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এইসব রাজনৈতিক সুবিধা সহকারে নোংরামির ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করা খুবই সহজ। তবু হোয়াইট হাউসের প্রাক্তন প্রেস সচিব সারা হাকেবি স্যান্ডারসের ট্রামপন্থী বই থেকে এই উপাখ্যান নিশ্চিতভাবেই সত্য বলে মনে হয় যে, এটি এক বন্ধুর লেখা। তাছাড়া, প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে জনগণকে চাগিয়ে তুলতে নভেম্বর রেইন গান ব্যবহার করেছেন ট্রাম্প।

এইসব উদ্ভট কারণে কারও মনে হতেই পারে, রোজ ও ট্রাম্পের মধ্যে প্রচুর মিল রয়েছে। তারা দুজনই ম্যাগালোম্যানিয়াক। তাদের দুজনের মধ্যেই চারপাশের সবার ভেতর আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপারে তাদের দুজনের মনোভাবের ইতিহাসও ভয়ানক। তাছাড়া, ট্রাম্প তো রোজকে “দ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প অব রক এন’ রোল” হিসেবে অভিহিত করেছেন, সে কথা ভুলে যাই কি করে!

তবে যদিও সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে নিজেকে ব্যাপকভাবেই এড়িয়ে চলেন রোজ, মাঝে মধ্যে অবশ্য টুইটারে পোস্ট করেন; আর তাতে সাধারণত ট্রাম্প প্রশাসনকে আক্রমণই করেছেন। তাছাড়া, ট্রাম্প যেন নিজের প্রচারণাকর্মে গানস এন’ রোজেস-এর মিউজিক যেন ব্যবহার না করেন, সেজন্য লড়াইও করেছেন রোজ।

নভেম্বর রেইন-এর মিউজিক ভিডিও ট্রাম্পের এত প্রিয় কেন? কে বলতে পারে: এত ভয়াবহ রকমের বাজে রুচির লোকটির আবির্ভাব ঘটেছে সংস্কৃতি ও শিল্প থেকে! তবে তার অনুরাগীদের জন্য এটি মোটেও বিস্ময়কর কিছু নয়। সবচেয়ে বড় কথা, জমকালো যেকোনো জিনিসই তাকে টানে। (নভেম্বর রেইন-এর ভিডিওতে থাকা) স্ল্যাশের একক গিটারবাদনের হেলিকপ্টার শটগুলোর প্রাচুর্য নিশ্চিতভাবেই তাকে মুগ্ধ করেছে। ট্রাম্প স্পষ্টতই এই ব্যান্ডকে ভালোবাসেন। ১৯৯২ সালের দিকে একটা গুজব উঠেছিল: তিনি ও রোজ সম্ভবত ম্যাডোনা: ট্রুথ অর ডেয়ার-এর মতো জমকালোভাবে গানস এন’ রোজেস-এর কনসার্টের ওপর ডকুমেন্টারি বানাতে জোট বেঁধেছেন; আর তাতে অর্থলগ্নি করবেন ট্রাম্প।

সে সময়ে নিউইয়র্ক পত্রিকা এক অজ্ঞাতসূত্র জানিয়েছিল, ‘অ্যাটলান্টিক সিটিতে গিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছেন অ্যাক্সেল রোজ’; আর, ‘এ দুজন [রোজ ও ট্রাম্প] একসঙ্গে কিছু একটা করছেন। যদিও বুনো হয়ে ওঠার দুর্নাম রয়েছে অ্যাক্সেলের, তবে ট্রাম্পের কাছে তাকে যথেষ্ট ভদ্র বলেই মনে হয়েছে।’

অবশ্য খানিকটা স্বস্তির ব্যাপার হলো, প্রতিক্রিয়াশীল ট্রাম্পের প্রতি প্রচুর রকস্টারকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে দেখলেও, অ্যাক্সেল রোজ তা করেননি। প্রগতিশীলতার প্রতি রোজের সাম্প্রতিক টান, কিংবা অন্তত ট্রাম্পবিরোধী অবস্থান তাকে এখনো অনেকের মনে ভালোলাগার মানুষ করে রেখেছে; যদিও তার আগেকার আচার-আচরণকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকার ডেনিস ব্যালকিসুন ২০১৮ সালে যেমনটা উল্লেখ করেছেন, ব্যান্ডটি এখনো তাদের শোগুলোতে ইউজড টু লাভ হার গানটি পরিবেশন করে, যেখানে এমন কথা রয়েছে: ‘তাকে ভালোবাসতে অভ্যস্ত ছিলাম ঠিকই, তবু তাকে না মেরে ছিল না উপায়/ তাকে ভালোবাসতে অভ্যস্ত ছিলাম আমি, হ্যাঁ, কিন্তু তাকে না মেরে কোনো ছিল না উপায়/ তাকে ছয় ফুট (মাটির) নিচে পুতে ফেলার দরকার ছিলই/ আর, এখনো কানে ভাসে আমার– তার অনুযোগ…’ [‘আই ইউজড টু লাভ হার বাট আই হ্যাড টু কিল হার/ আই ইউজড টু লাভ হার, ওহ ইয়েহ, বাট আই হ্যাড টু কিল হার/ আই হ্যাড টু পুট হার সিক্স ফিট আন্ডার/ অ্যান্ড আই ক্যান স্টিল হিয়ার হার কমপ্লেন…]। যদিও রোজ এটিকে ইয়ার্কি বলেই অভিহিত করেন, কিন্তু এটি কোনো ইয়ার্কির বার্তা নয়।


ব্যান্ডের
বাকি সবাই
যাচ্ছিলেন এক
পথে, আর তিনি
এগিয়েছিলেন
অন্য পথ
ধরে

এ রকম নোংরামি তো সেই নভেম্বর রেইন-এর অকপটতা থেকে আলোকবর্ষ দূরের জিনিস, যেখানে [নভেম্বর রেইন] রোজ নিজ ব্যক্তিত্বের সংবেদনশীল দিকটি প্রকাশের চালিয়েছিলেন প্রচেষ্টা– তার নিজের যে অংশটি অতটা ঘৃণ্য ছিল না। গানটির মহানুভবতা অবশ্য তার ব্যান্ডের ভেঙে পড়ার ইঙ্গিতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়; কেননা, গানস এন’ রোজেসকে তিনি বড় থেকে আরও বড় ব্যান্ডে পরিণত করতে চেয়েছিলেন স্রেফ ভালো মিউজিক করে যাওয়ার বুনো আকাঙ্ক্ষা থেকেই, আর তা ব্যান্ডমেটদের সঙ্গে নিয়েই। তবু, ব্যান্ডের বাকি সবাই যাচ্ছিলেন এক পথে, আর তিনি এগিয়েছিলেন অন্য পথ ধরে।

অ্যাক্সেল রোজ

‘এই অ্যালবামই প্রমাণ দেবে, আমাদের কতটা উন্নতি ঘটে গেছে,’ ১৯৯০ সালে আসন্ন ইউজ ইউর ইল্যুশন অ্যালবামগুলো সম্পর্কে নিজ প্রত্যাশা প্রসঙ্গে বলেছিলেন রোজ। ‘ওখানে কিছু শিশুতোষ, দাম্ভিক, পুরুষালি, মিথ্যে বাহাদুরির বিষয়আশয়ও থাকবে। তবে গানগুলো সত্যিকারের হেভি, সিরিয়াস জিনিস হয়ে উঠবে… আপনাকে একটা কিছু তো বেছে নিতে হবেই– বড় হবেন নাকি মরবেন? আর এ কারণেই (গানগুলোকে) তেমন করে তুলতে হবে আমাদের। অন্য কোনো উপায় নেই: বড় আমাদের হতেই হবে।’

একদিক থেকে, নভেম্বর রেইন সেই বড় হয়ে ওঠার প্রতিনিধিত্ব করে। থেরাপির ভেতর দিয়ে গিয়েছিলেন রোজ, চেয়েছিলেন কিছু কাজ করতে, বিশেষ করে– নারীদের প্রতি নিজ ঘৃণাবোধ এড়িয়ে যেতে। তার সেই অগ্রগতিকে, প্রিয় পাঠক, আপনি অন্যভাবেও দেখতে পারেন: ওয়ান ইন অ্যা মিলিয়ন থেকে নিজেকে বহুদূরে সরিয়ে এনেছিলেন তিনি। আপনাকে বাড়তে অথবা মরতে হবে। বেড়ে ওঠার পথ বেছে নিয়েছিলেন অ্যাক্সেল রোজ।

কিন্তু নভেম্বর রেইন-এর বোম্বাস্টের ভেতর স্বয়ং গানস এন’ রোজেস-এর আইডিয়াটিরই ঘটে গিয়েছিল মৃত্যু।


টিম গ্রিয়ারসন: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, মেল ম্যাগাজিন, যুক্তরাষ্ট্র
প্রকাশ: মেল ম্যাগাজিন, ২০২০
Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক: লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ]: আমার জন লেনন [মূল: সিনথিয়া লেনন]; আমার বব মার্লি [মূল: রিটা মার্লি] ।। কবিতার বই: ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ]: ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড: ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান; বেলা তার; ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার বেলা তার; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার নুরি বিলগে জিলান