উইন্ড অব চেঞ্জ: সর্বকালের সেরা মনুমেন্টাল পাওয়ার ব্যালেড

0
44

লিখেছেন: আলেক্সান্ডার মিলাস
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

একটা লোক শীস বাজালেন, তৃষ্ণার্তভাবে। আবারও শীস বাজালেন, আর তা ঘিরে বেজে ওঠল মেলোডি। আবারও বাজালেন শীস এমন উত্তুঙ্গ মাত্রায়, যেন আপনার প্রতি জিজ্ঞাসা ছুড়ে দিলেন, ‘আমার শীস কি ভালোলাগে তোমার?’; আর তখনই একটি ফ্রেটবোর্ডের সুতীব্র টুংটাং আপনাকে জানান দেবে, শীস তিনি একা বাজান না। ভালো লাগুক কিংবা খারাপ, আপনি জেনে যাবেন– কী ঘটতে যাচ্ছে।

এর কারণ, রক মিউজিকের ইতিহাসে আর কোনো গান স্করপিয়নস-এর উইন্ড অব চেঞ্জ-এর মতো এত সুতীব্রভাবে শনাক্তযোগ্য কিংবা বিজড়িত হতে পারেনি বিশ শতকের সবচেয়ে ঝড় তোলা ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম– বার্লিন দেয়াল ভেঙে পড়ার সমতুল্য হয়ে। এটাই একমাত্র ঘটনা? এটি লেখা হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনা ঘিরে? দ্বন্দ্বে পড়লেন? না, আপনি একাই দ্বন্দ্বে পড়েননি।

প্রথমে বরং এ কথা বলা যাক: উইন্ড অব চেঞ্জ হলো তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সবচেয়ে মনুমেন্টাল এবং সবচেয়ে শনাক্তযোগ্য পাওয়ার ব্যালেডগুলোর একটি; আর, তর্কসাপেক্ষেই এটি স্করপিয়নসকে সর্বোচ্চ বাণিজ্যসাফল্য এনে দিয়েছে, যে ব্যান্ড ১৯৬৫ সালে জার্মানির হ্যানোভার শহরে বিনম্র পথচলা শুরুর পর থেকে, পরবর্তীকালে আরও হিট কিছু গান হাজির করেছে।

নিশ্চিতভাবেই ব্ল্যাকআউট [১৯৮২] অ্যালবামটি ছিল বিগ হিট; তবে উইন্ড অব চেঞ্জ গানটির কপি একাই বিক্রি হয়েছিল ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি। এই অ্যানথেমিক ঠুঁটা জগন্নাথের কাহিনি যদি স্রেফ বিক্রিবাট্টার হিসেবে ধরা হয়, তাহলে বোধকরি এ ব্যাপারে কারও কৌতুহল জাগবে না; তবু জেনে রাখুন, এটি স্রেফ একটি গানই নয়।



লাখ
দর্শকের
সামনে পারফর্ম
করার সময় একঘেয়েমিতা
থেকে বাঁচার অনুপ্রেরণা হিসেবে
স্করপিয়নস-এর
মগজে এর
জন্ম

মূলের দিক থেকে এটি স্রেফ একটি পরিবর্তিত পৃথিবীর সুর; এবং ১৯৮৯ সালের আগস্টে রাশিয়ার লেনিন স্টেডিয়ামে মস্কো মিউজিক পিস ফেস্টিভ্যালে অজি অসবর্ন, মটলি ক্রু, সিন্ডারেলাস্কিড রো’র সঙ্গে, ৩ লাখ দর্শকের সামনে পারফর্ম করার সময় একঘেয়েমিতা থেকে বাঁচার অনুপ্রেরণা হিসেবে স্করপিয়নস-এর মগজে এর জন্ম। সেই অভিজ্ঞতায় শিহরিত হয়ে এবং দর্শকদের উৎসাহে গানটি লিখতে শুরু করেন ক্লাউস মাইনা। গিটারিস্ট হিসেবে আত্মবিশ্বাসের চূড়ায় না থাকা এই গায়ক গিটার বাজানোর বদলে বরং শীস বাজিয়ে সুরটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

স্করপিয়নস

এর ফলাফল এসেছে ইতিহাসের এমনই এক উত্তুঙ্গ সময়ে, যখন সারা দুনিয়া সোভিয়েত শাসক মিখাইল গর্বাচেভের গ্লাসনস্ট ও পেরেস্ত্রোইকা মতবাদের প্রতিক্ষীত আবির্ভাবের অপেক্ষারত। এটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, জানা ছিল না কারও; তবে স্নায়ুযুদ্ধের উৎকণ্ঠা পেরোনোর কয়েক দশক পরে এ ছিল আশাবাদের চাঙ্গা হওয়ার এবং নতুন সম্ভাবনার প্রতি আস্থা রাখার সময়। আর তখনই স্করপিয়নস এমন একটি গান লিখে ফেলল, যেটি ভবিষ্যৎ দেখতে পায়!

সোভিয়েত অভিজ্ঞতা কীভাবে ভিন্স নেইল কিংবা সেবাস্তিয়ান বাখের মতো অর্থবহ হয়ে ধরা দেবে, যখন সেটি শুধুমাত্র অনুমানই করা সম্ভব, এমন সময়ে রাইখ শাসনতন্ত্রের স্মৃতির ভেতর, আয়রন কার্টেনের ছায়ায় বেড়ে ওঠা একটি পশ্চিম জার্মান ব্যান্ডের গানে তার কী অনুরণন ঘটা সম্ভব– সে ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন চলে না।


২০২০ সালের
উইন্ড অব চেঞ্জ
পডকাস্টে বলা হয়,
উইন্ড অব চেঞ্জ-এর
সৃষ্টির সঙ্গে সিআইএ’র
একটা সম্পর্ক
ছিল

সম্ভবত এ কারণেই একটি আমুদে অথচ চন্ত্রান্তমূলক বিষয়ের অবতারণা ঘটে গানটির উৎপত্তির ওপর: ২০২০ সালের উইন্ড অব চেঞ্জ পডকাস্টে বলা হয়, উইন্ড অব চেঞ্জ-এর সৃষ্টির সঙ্গে সিআইএ’র একটা সম্পর্ক ছিল; তার তা যেন কাটা গাঁয়ে নুনের ছিটার মতো। তবে ব্যান্ডটির গিটারিস্ট ও প্রতিষ্ঠাতা রুডলফ শেঙ্কার বলেছেন, ‘গল্পটি যেহেতু ভালো, তার মানে এই গল্প দারুণ!’

‘আমরা এক উন্মাদ সময়ে বেঁচে আছি,’ বলেন ক্লাউস। “আমি যখন এই (সিআইএ) তত্ত্বের কথা জানলাম, হেসেই কূল পাই না! দেখুন, এ এক খ্যাপাটে গল্প! তবে নিউইয়র্ক সিটি থেকে সিডনি– দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ওই পডকাস্ট। সবাই বলাবলি করছে, ‘তুমি ওই পডকাস্ট শুনেছ তো?’ এ এক খ্যাপাটে কাণ্ড!”

উইন্ড অব চেঞ্জ। অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও

দ্য নিউইয়র্কার-এর সাংবাদিক প্যাট্রিক র‌্যাডেন কিফ জার্মানিতে এসে এক সাক্ষাৎকারের মাঝখানে আমাকে বলে বসেন, ‘উইন্ড অব চেঞ্জ গানটি সিআইএ’র লেখা– এ গল্প শুনেছেন আপনি, ক্লাউস?’ আমি বললাম, ‘কী? আবার বলুন!’ তবে তারপর বললাম, এ কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তা-ই প্রমাণ করে দেয়, মিউজিকের শক্তি কতটা।”

এইসব মিথের পেছনে নিঃসন্দেহে অবদান রয়েছে সেই মস্কো পিস ফেস্টিভালের মাসকয়েক পর, ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে বার্লিন দেয়াল ভেঙে পড়ার ঘটনা; কিন্তু উইন্ড অব চেঞ্জ মুক্তি পেতে আরও এক বছর লেগে গিয়েছিল। ১৯৯০ সালে ক্রেজি ওয়ার্ল্ড অ্যালবামে মুক্তি পায় এ ট্র্যাক। এমনকি, এটি একটি সিঙ্গেল হিসেবে মুক্তি পায় শুধু ইউরোপে, ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে; অ্যালবামটির তৃতীয় ট্র্যাক হিসেবে, টিজ মি, প্লিজ মিসেন্ড মি অ্যান অ্যাঞ্জেল-এর পর।


‘দেখো,
বার্লিন দেয়াল
যেহেতু ভেঙে গেছে,
তাই এই মুহূর্তে এটির পক্ষে
একটি তুখোড় গান
হয়ে ওঠা
সম্ভব’

“এটি যথেষ্ট দেরিতে মুক্তি পেয়েছিল; কেননা, আমরা সব সময় বলতাম, ‘শোনো, আমরা যেহেতু একটি রক ব্যান্ড, তাই অ্যালবামের প্রথম সিঙ্গেলটি একটি রকার হওয়া চাই। দ্বিতীয় সিঙ্গেলটিও আরেকটি রক সং হওয়া চাই,’” বলেন ক্লাউস। “তারপর কেউ একজন বলল, ‘আচ্ছা, উইন্ড অব চেঞ্জ-এর পক্ষেও একটি দারুণ সিঙ্গেল হওয়া সম্ভব।’ কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মার্কেটিংয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সে সময়ে কেউই বলেনি, ‘দেখো, বার্লিন দেয়াল যেহেতু ভেঙে গেছে, তাই এই মুহূর্তে এটির পক্ষে একটি তুখোড় গান হয়ে ওঠা সম্ভব।’ এমন কথা কাউকে বলতে শুনিনি আমরা।”

তর্কসাপেক্ষে বলা যায়, উইন্ড অব চেঞ্জ-এর প্রমো ভিডিওতে বার্লিন দেয়ালের ভেঙে পড়াসহ বিভিন্ন বিক্ষোভের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি সময়কালের ছাপ রয়েছে এবং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটছিল তখন। কমিউনিজমের পতন ঘটছিল, তাছাড়া একই বছরের ডিসেম্বরে শেষবারের মতো ক্রেমলিনের আকাশে উড়ছিল সোভিয়েত হাতুড়ি-কাস্তে মার্কা পতাকা। অবশেষে, এর সঙ্গে মিলে গিয়েছিল একটি গান; আর সেটি খুঁজে পেয়েছিল নিজের একেবারেই প্রকৃত জায়গা।

‘একদিক থেকে আমরা বার্লিন দেয়ালের ছায়াতলেই বেড়ে উঠেছি,’ বলেন ক্লাউস। ‘দ্বিখণ্ডিত দেশ ও বার্লিন দেয়াল– এ ছিল আমাদের প্রজন্মের জার্মান নাগরিকদের জন্য একটি বাস্তবতা। শুরুর দিনগুলোতে যখন আমরা বার্লিনে শো করতাম, আমাদেরকে ট্রানজিট হাইওয়ে দিয়ে যেতে হতো; প্রথম চেকপোস্টটি ছিল হেলমস্টেডে– যেখানে আমরা বেড়ে উঠেছি, সেখান থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে। পূর্ব জার্মানি থেকে পশ্চিম জার্মানিতে যাওয়ার চেষ্টা করে হরদম গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা পড়ত লোকজন; আর নিঃসন্দেহে, সেটি ইংরেজ দৃষ্টিকোণ কিংবা ব্রিটিশ দৃষ্টিকোণ কিংবা আমেরিকান দৃষ্টিকোণের চেয়ে একেবারেই আলাদা গল্প।’



রকম
কোনো ঐতিহাসিক
ঘটনাকে কেন্দ্র করে
আপনার পক্ষে কখনোই কোনো
গান লেখা সম্ভব
হবে
না

‘এই ছিল আমাদের বাস্তবতা। আর এটা ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধের পরে, যখন দেশটি এতগুলো আলাদা অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আর যখন দেয়ালটির পতন ঘটল, তা ছিল ইউরোপিয়ানদের জন্য, বিশ্ব-ইতিহাসের জন্য একটি মারাত্মক আবেগঘন মুহূর্ত। এ রকম কোনো ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপনার পক্ষে কখনোই কোনো গান লেখা সম্ভব হবে না। এ একেবারেই অসম্ভব। তবে উইন্ড অব চেঞ্জ-এর মধ্য দিয়ে অনেক মানুষই ওই সময়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির স্মৃতিচারণে ফিরে যান, এ কথা সত্য।’

স্করপিয়নস

সৃষ্টির ৩০ বছর কেটে যাওয়ার পর উইন্ড অব চেঞ্জ-এর তাৎপর্য কী এখন? যেহেতু এটিকে রূপান্তরকারী মুহূর্তটি থেকে আলাদা করা অসম্ভব, সম্প্রতি ক্লাউস মাইনা ইউক্রেনের টিসিএইচ সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সেই দেশে রাশিয়ার সাম্প্রতিক আগ্রাসনের কারণে গানটি নিয়ে তার মনে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

“‘ফলো দ্য মস্কোভা/ ডাউন টু গোর্কি পার্ক’– এ রকম কথায় রাশিয়াকে রোমান্টিসাইজ করার সময় এটি নয়; আমি বরং বলতে চাই, এই ভীষণ কঠিন পরিস্থিতিতে আমরা ইউক্রেনের পক্ষে আছি,” বলেন তিনি। ‘বহুকাল কেটে যাওয়ার পর আমি মনে করি, এই গান একটি শান্তিবাদী অ্যানথেম হিসেবে, একটি আশাবাদী গান হিসেবে নিজের তাৎপর্য হারিয়ে ফেলেছে। তাই গানের কথাগুলো বদলে দিতে হবে আমাকে।” ক্লাউস এখন গেয়ে ওঠেন, ‘লিসেন টু মাই হার্ট/ ইট স্যেস ইউক্রেন,/… ওয়েটিং ফর দ্য উইন্ড/ টু চেঞ্জ…’।

আলেক্সান্ডার মিলাস: মিউজিক জার্নালিস্ট, মেটাল হ্যামার ম্যাগাজিন
সূত্র: ক্লাসিক রক; মিউজিক ম্যাগাজিন। ৩ জুন ২০২২
Print Friendly, PDF & Email