কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: যেভাবে জর্জ হ্যারিসন সাজিয়েছিলেন এক দুর্ধর্ষ ইতিহাসের প্লট

0
116
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

লিখেছেন: গ্রেইম থমসন
অনুবাদ: মুনতাসির রশিদ খান

ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের বাইরে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর পোস্টার

৩১ জুলাই ১৯৭১। রক কনসার্ট শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তেজনার জ্বরে কাঁপা উৎসবমুখর পরিবেশে জড়ো হয়েছেন একদল বিশ্বখ্যাত শিল্পী। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের এই ঘর যেন পূর্ব-পশ্চিমা সংগীতের মিলনমেলা, যা পরের দিন দুপুর ও বিকেলে দু’বারে ২০ হাজার লোককে মাতিয়ে তুলবে সুর-তালের আন্তর্জাতিক ভাষায় এক মানবিক আবেদনের টানে। এরিক ক্ল্যাপটন এসেছেন ভূতুড়ে ছায়ার মতো নেশার ঘোরে আছন্ন হয়ে, আর তার জন্য খুঁজতে পাঠানো হয়েছে হেরোইন! বব ডিলান নার্ভাসনেসের চোটে ভেগে যাওয়ার চিন্তা করছেন।

আয়োজক হিসেবে জর্জ হ্যারিসনের ঘাড়ে চেপেছে এই বেসামাল অবস্থা সামাল দেবার দায়িত্ব। ‘সেই রাতে কনসার্টের আগের সময়টা আসলেই বেশ প্যাঁচালো ছিল,’ স্মৃতিচারণে কিংবদন্তি ব্যান্ড বিটলস-এর প্রাক্তন এই সদস্য আরও বলেন, “আমরা দেখছিলাম স্টেজের সব ঠিকঠাক সেটআপ হচ্ছে কি না। এরিকের অবস্থা বেশ খারাপ ছিল আর ডিলান কোনোমতে স্টেজে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘শোনো, আমার মনে হচ্ছে আমি পারব না, আমার নিউ জার্সিতে কিছু কাজ আছে।’ আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। বললাম, ‘দেখো, আমাকে এসব এখন বোলো না। আমি সব সময়ই ব্যান্ডে ছিলাম। একা কী করে স্টেজে সামনে থেকে গাইতে হয়, তা আমার একেবারেই জানা নেই।’ আমার সোজাসাপ্টা কথায় তিনি রাজি হলেও একেবারে স্টেজে ওঠার আগ পর্যন্ত ডিলানকে নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল।”

ওপরের কথাগুলো একেবারে হৃদয় থেকেই বলা। কারণ হ্যারিসন নিজেকে কখনো সলো পারফর্মার হিসেবে ভাবেননি, হতেও চাননি। তার ওপর আবার একটা অনুষ্ঠানে মধ্যমণি হয়ে পুরো দায়িত্ব নেওয়া হ্যারিসনের জন্য বেশ কঠিনই ছিল। ২৭ জুলাই এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা ভেবেই আমার কাপাকাপি অবস্থা!’


‘শুধু
সবাইকে
এক করাই
নয়, নিজে সামনে
থেকে পারফর্ম করা
আর নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে
দারুণ উত্তেজিত,
অথচ নার্ভাসও
ছিল
সে’

হ্যারিসনের প্রাক্তন স্ত্রী পেটি বয়েড বলেন, ‘সে অনেকটা সাহস জোগাড় করে পুরো ব্যাপারটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। শুধু সবাইকে এক করাই নয়, নিজে সামনে থেকে পারফর্ম করা আর নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে দারুণ উত্তেজিত, অথচ নার্ভাসও ছিল সে।’

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ ছিল রক মিউজিকের ইতিহাসে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার এক আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মহতী প্রচেষ্টা। কোনো লাভের আশা থেকে নয়, কোনো বিশাল পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সীমানা টেনে দিয়েছিল ব্রিটিশরা, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়। শুধু ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ১ হাজার মাইল দূরত্বের দুটি দেশকে এক করে আসলে ব্রিটিশরা বিভক্তির রাজনীতির চাল চেলেছিল। যার শিকার হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ– রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিল্প-সংস্কৃতিতে। ১৯৭১ সাল এই দীর্ঘ অবিচারের ফল।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
রবিশঙ্কর জর্জ হ্যারিসন; কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর দিনগুলোতে। ছবি: গেটি ইমেজ

১৯৭০ সালের ভয়াবহ সাইক্লোনে ভোলা ও তার আশেপাশের এলাকার প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা যায়, আর গৃহহারা হয় হাজার হাজার পরিবার; তার প্রতিকারে তেমন কিছুই করেনি পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক সরকার। উপরন্তু, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ন্যায্য ক্ষমতা হস্তান্তরের বদলে ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালি জাতির ওপর সামরিক জান্তা ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলাফল প্রায় ৩০ লাখ শহীদ আর ১০ লাখ বাঙালি উদ্বাস্তু, যারা পাড়ি জমায় ভারতে।

পশ্চিমা জগতে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। ‘আমি লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকতেই এমনটা হচ্ছিল,’ ২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকারে পণ্ডিত রবিশঙ্কর বলেন। হ্যারিসনের কাছের বন্ধু কিংবদন্তি সেতার বাদক রবিশঙ্করে কাছের অনেকের বাড়িই ছিল পূর্ববঙ্গে, ‘আমি পত্রিকা আর টিভিতে এই ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় দেখছিলাম, কলকাতায় হাজারে হাজার উদ্বাস্তু আসছিল। কিন্তু সব থেকে দুঃখের ব্যাপার ছিল, এই ভয়াবহ দুরাবস্থার কথা পশ্চিমে প্রায় কেউই জানত না। এমন এক সময়েই জর্জ লস অ্যাঞ্জেলসে কদিনের জন্য এলো।’

হ্যারিসন ১৯৭১ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়েছিলেন হাওয়ার্ড ওয়ার্থ পরিচালিত রবিশঙ্করকে নিয়ে নির্মিত রাগ চলচ্চিত্রের আবহসঙ্গীতের জন্য। ম্যালিবুর সেই সমুদ্রমুখি ভাড়া বাড়িতে থাকতে থাকতে তিনি দুটি গান লিখেন, টায়ার্ড অব মিডনাইট ব্লু আর লস অ্যাঞ্জেলেসের নাইটক্লাবের অভিজ্ঞতা থেকে নটিনেস। এরপর তার মাঝে বিষণ্ণতা আসে কিছুটা বাড়ির ফেরার টানে। আরেকটি গান লিখেন, মিস ওডেল— যেটা ছিল লিওন রাসেলের সঙ্গে অ্যাপল স্টুডিওর সেক্রেটারি ওডেলের প্রেমের গল্প। গানগুলোতে বেশ একটা তারুণ্যের উচ্ছলতা ছিল, যেমনটা হ্যারিসনের পরের অ্যালবামে পাওয়া যায়নি।

ওডেল অবশ্য বলেন, তাকে নিয়ে গানটা মনে হলেও এর মাঝে যুদ্ধ কিংবা ভারতের রূপকে আসলে এটা বাংলাদেশকে নিয়েই লেখা গান। গানটা লেখার পরেই হ্যারিসন তাকে ডেকে আনেন শোনানোর জন্য, ‘আমার মনে আছে, আমাকে তিনি যুদ্ধের ঘটনা বোঝাচ্ছিলেন, যার অনেকটাই আমি বুঝতে পারছিলাম না। আসলে জর্জের ভারত ও ভারতীয়দের প্রতি দারুণ ভালোবাসা ছিল, আর রবিশঙ্করের মাধ্যমে যেন একটা সম্পর্ক গড়ে উঠছিল ভারতের সাথে।’

হ্যারিসনের বাংলাদেশকে নিয়ে সহানুভূতির নেপথ্যে ছিল রবিশঙ্করের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, যার অনেক বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন যারা এই যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। ‘সে আমাকে বিষণ্ণ দেখতে পেয়ে চিন্তিত হয়ে উঠেছিল আর আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারে কি না,’ রবিশঙ্কর বলেন, ‘আমি বললাম, আমার মনে হয় আমাদের কিছু করা উচিত। আমরা একটা কনসার্ট করতে পারি চাঁদা তোলার জন্য। জর্জ সঙ্গে সঙ্গে তার বন্ধুদের ফোন করা শুরু করে দিল।’


হ্যারিসন
এক ভারতীয়
জ্যোতিষীর কাছে
শুভদিন জানতে গেলেন
কনসার্টের
জন্য

রাতারাতি বাংলাদেশ হ্যারিসনের সবচেয়ে গুরুত্ব বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াল। জর্জ হ্যারিসন বছরের শেষের দিকটা লস অ্যাঞ্জেলেসের নিকোলস ক্যানিয়নের কাছে কাটাতেন, প্রয়োজনে সেখান থেকেই নিউইয়র্কে যাওয়া-আসা করতেন। এই কনসার্টের জন্য অনেক ঝক্কি সামলাতে হতো। বছরের সবচেয়ে বড় চাঁদা তোলার জন্য কনসার্ট, যার কোনো পূর্বপরিকল্পনাই ছিল না। এমন অবস্থায় হ্যারিসন এক ভারতীয় জ্যোতিষীর কাছে শুভ দিন জানতে গেলেন কনসার্টের জন্য। আগস্টের প্রথম দুদিনের মধ্য থেকে ১ আগস্টে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন ফাঁকা পাওয়া গেল। তার মানে দাঁড়াল, সব কিছু গুছিয়ে কনসার্টটা করার জন্য সময় পাওয়া গেল ছয় সপ্তাহ।

এর মধ্য দিয়ে শুরু হলো দিনে ১২ ঘণ্টা ফোনে কাটানোর সপ্তাহ। এই অনুষ্ঠানের আয়োজনে খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে যারা পারফর্ম করবেন, তাদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য এর কোনো বিকল্প ছিল না। কনসার্টের পাশাপাশি চাঁদার টাকা বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা ছিল একটা চলচ্চিত্র আর অ্যালবাম প্রকাশের। হ্যারিসন পরে বলেছিলেন, বিটলস-এ থাকাকালে জন লেনন যেমন বলতেন, ‘চলো আমাদের রেকর্ডিং নিয়ে ছবি করি আর মিলিয়ন ডলার কামিয়ে নিই’– তেমনটা তিনি এই কনসার্টেও করতে চেয়েছিলেন।

অনেকগুলো কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলো বিটলস-এর সাবেক ম্যানেজার এলেন ক্লেইনকে; তবু অনেক কিছু হ্যারিসন নিজে থেকেই করতেন। তিনি নিজে ভাড়া করলেন জন ট্যাপলিনকে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে, যার লোকজন আর সাউন্ড সিস্টেম হ্যারিসন নিজের কনসার্টের জন্য ব্যবহার করতেন। ট্যাপলিন সে সময়ের কথা মনে করে বলেন, ‘শুরুতে লিওন রাসেল, ক্লস ভোরম্যান, রিঙ্গো স্টার আর জিম কেল্টনার রাজি হয়ে যান কনসার্টের জন্য; বাকিরা আসলে এসেছেন কনসার্ট শুরু ঠিক আগে।’

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ ডন প্রেস্টন জর্জ হ্যারিসন। ছবি: গেটি ইমেজ

এর মাঝে একটা গান লেখা আর রেকর্ড করা হয় ৪ ও ৫ জুলাই, রেকর্ড প্ল্যান্ট ওয়েস্ট স্টুডিওতে। ‘জর্জ আমাকে সাহায্য করলেন; আর আমি খুশি হয়েই কাজটা করলাম,’ লিওন রাসেল বলেন। তাড়াহুড়া করে হ্যারিসন পূর্ববাংলা নিলে গান লেখেন, যার নাম দেন বাংলাদেশ: গানের কথায় উঠে এসেছে বাঙালির সংগ্রাম আর দুর্দশার কথা। গানের কথায় পুরো অবস্থার একটা চিত্র ফুটে ওঠে আর সুরে একটা আকুতির সঙ্গে সংগ্রামী আবেগ জুড়ে যায়।

সপ্তাহের বাকি সময়টা হ্যারিসন কাটালেন রাগ চলচ্চিত্রের আবহ সংগীত করে। এরপর যুক্তরাজ্যে চলে গেলেন ব্যাডফিংগার ব্যান্ড আর লেননের ইমাজিন অ্যালবামে কাজ করতে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে ওঠেন পার্ক লেন হোটেলে; আর ২৭ জুলাই রবিশঙ্করের সঙ্গে প্রেস কনফারেন্স করেন। সবাইকে নিয়ে করার সদিচ্ছা থাকলেও সবাই শেষমেশ সাংবাদিকরা ধরেই নেন হ্যারিসন এ কনসার্টের ‘এক নম্বর তারকা’। তিনি বলেন, তিনি কিছুটা নার্ভাস। আসলে তিনি ব্যান্ডের সাথে বাজাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন; ‘কিন্তু এই কনসার্ট এত কম সময়ে আয়োজন করা হয়েছে যে, শুধু কিছু বন্ধু বান্ধবকেই আমন্ত্রণ জানাতে পেরেছি; আর তারাই হবেন কনসার্টের পারফরমার।’

পাইপে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ক্লেইন সবাইকে মনে করিয়ে দেন, কনসার্টের সব টাকাই যাবে দাতব্য সংস্থায়, যেটা অনেক সাংবাদিকের কাছে ফাঁকা বুলি বলে মনে হয় তখন। সবাই বিটলস-এর রি-ইউনিয়নের দিকে প্রসঙ্গ নিয়ে গেলে হ্যারিসন কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আমাদের কি কনসার্টটা নিয়ে কথা বলা উচিত না?’ কিন্তু তিনি জানতেন, মিডিয়াতে অনেকেই বলে বেড়াচ্ছে এই কনসার্টেই বিটলস-এর রি-ইউনিয়ন হতে যাচ্ছে।


লেনন
প্রথমে রাজি
হয়েছিলেন; কিন্তু
তার শর্ত ছিল, সঙ্গে স্ত্রী
ইয়োকোকে পারফর্ম করতে
দিতে হবে। এতটা ছাড়
দেওয়া হ্যারিসনের
জন্য সম্ভব
ছিল
না

কনসার্টে অংশ নিতে স্পেনে শর্ট ফিল্মের কাজ কমিয়ে বিটলস ড্রামার রিঙ্গো স্টার চলে আসেন। কিন্তু পল ম্যাককার্টনি বিটলস ভেঙে যাবার তিক্ততায় ম্যানেজার ক্লেইনের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। লেনন প্রথমে রাজি হয়েছিলেন; কিন্তু তার শর্ত ছিল, সঙ্গে স্ত্রী ইয়োকোকে পারফর্ম করতে দিতে হবে। এতটা ছাড় দেওয়া হ্যারিসনের জন্য সম্ভব ছিল না।

এরা না আসাতে কিছুটা স্বস্তিই পেয়েছিলেন হ্যারিসন। সেসময় অনেক টাকার অফার ছিল বিটলস একত্রিত হয়ে যাবার জন্য। জিনিসটা লোভনীয় মনে হলে ব্যান্ড মেম্বারদের দূরত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আবার এটাও ঠিক, পারফর্ম তো পরের কথা, বিটলস-এর সব সদস্য একঘরে ঢুকলেও কনসার্টের মূল উদ্দেশ্য অনেক দূরে সরে যেত।

এদিকে নিউইয়র্কে, নোলা স্টুডিওতে রিহার্সাল শুরু হয়, যেটা কার্জে গি হল থেকে পশ্চিমে ২০নং রাস্তায় অবস্থিত। এই কনসার্ট ছিল বাংলাদেশের যুদ্ধের মতো যুক্তির ওপর আশার বিজয়। হ্যারিসন বলেন, ‘পুরোটাই ছিল ভাগ্যের খেলা। সব এত দ্রুত ঘটছিল, আমরা যে তাল মেলাতে পারছিলাম– এটা একটা বিস্ময়কর ব্যাপার।’

প্রথম দিনের রিহার্সালে হ্যারিসনের সঙ্গে ছিলেন ভোর ম্যান, ব্যাডফিংগার আর ছয় জনের একটা হর্ন সেকশন– যার নেতৃত্বে ছিলেন জিম হর্ন। একেবারে ফাঁকা বলা চলে এত বড় কনসার্টের হিসেবে। রোববারের কনসার্টের আগে বৃহস্পতিবার রিঙ্গো স্টার আসেন, পরের দিন আসেন লিওন রাসেল; কিবোর্ডিস্ট বিলি প্রেস্টনও এসে পৌঁছেন, সঙ্গে ব্যাকিং সিংগারদের একটা দল নিয়ে ক্লডিয়া লেনিয়ার।

হ্যারিসন ছিলেন সবকিছুর দায়িত্বে, তার কর্মস্পৃহা আর প্রাণ চাঞ্চল্য নিয়ে। রবিশঙ্কর বলেন, ‘প্রথমে সবাই কিছুই জানত না, কী কারণে কনসার্টটা হচ্ছে। আস্তে আস্তে সবাই একসঙ্গে মিলে যায়।’ কিন্তু সৎ-উদ্দেশ্য কিছু এগিয়ে নিলে বিশেষ কারও কারও অভাব খুবই অনুভূত হচ্ছিল। হ্যারিসন চাইছিলেন ক্ল্যাপটন যেন তার সঙ্গে লিড গিটার বাজান। কিন্তু তখনো যুক্তরাজ্যে সারেতে হেরোইনে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে ছিলেন ক্ল্যাপটন।

ট্যাপলিন বলেন, “এরিকের কোনো হদিশ নেই। হ্যারিসন চিন্তায় পড়ে গেলেন। তার তো লিড গিটারিস্ট লাগবে। আমি ক্লেইনের অফিসে টেলেক্স করলাম, কোনোমতে ক্ল্যাপটনকে প্লেনে তুলে দেবার জন্য। সেখান থেকে টেরি জানাল, ক্ল্যাপটনের এখন আসলে প্লেনে চড়ার মতো অবস্থা নেই। জর্জ বলল, ‘আরেকদিন দেখি, তারপর না হয় ওর বদলে অন্য কাউকে খুঁজে নেব।'”

পিটার ফ্র্যাম্পটন তখন শহরেই ছিলেন, হাম্বল পাই-এর সাথে রকিং দ্য ফিল মোর অ্যালবামের মিক্সিং কাজে। ফ্র্যাম্পটন বলেন, “জর্জ আমাকে যেতে বলল, আর হঠাৎ করে আমরা অন্য জ্যাম না করে জর্জ হ্যারিসনের গান আর বিটলস-এর গান বাজানো শুরু করলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে হ্যারিসন বলল, ‘এগুলো কনসার্ট ফর বাংলাদেশের জন্য, আর তুমি হচ্ছো এরিকের বদলি।'” তবে শেষ পর্যন্ত তারা ব্লুজ মিউজিশিয়ান তাজমহলের গিটারিস্ট এড ডেভিসকে নিয়ে আসেন, যিনি রাসেলের বন্ধু।

আরেক ওয়াইল্ড কার্ড ছিল বব ডিলান। হ্যারিসন ভেবেছিলেন, আইল অব ওয়াইট কনসার্টে পারফর্মের দুই বছর বিরতির পর ডিলান বন্ধুর অনুরোধে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ থাকবেন। কিন্তু ডিলান কোনো রিহার্সালেই আসেননি; আর কেউই নিশ্চিত ছিলেন না, কনসার্টে তিনি আদৌ আসবেন কি না।

শেষ পর্যন্ত কনসার্টের আগের দিন ডিলান আর ক্ল্যাপটন– দুজনই এসেছিলেন আগের রাতে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে টেকনিক্যাল রিহার্সালের আগে। সেখানে প্রথমবারের মতো সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়েছিলেন। ডিলানকে কিছুটা বকাঝকা করেন হ্যারিসন। ক্ল্যাপটন এসেছিলেন লন্ডন থেকে, একেবারে ভূতের মতো অবস্থায়।

হ্যারিসন বাইরে থেকে ঠাণ্ডা থাকলেও ভেতরে দুশ্চিন্তিত ছিলেন। ‘তিনি বেশ নার্ভাস ছিলেন,’ বলেন ও’ডেল, ‘একটা কনসার্টের মূল ব্যক্তি হয়ে ওঠা আর বিশ্বাস রাখা যে, বব ডিলানের মতো শিল্পী ফ্রিতে এসে ঠিকমতো পারফর্ম করে যাবেন, এটা তার স্বভাবের বাইরে ছিল। এতটা ঝক্কি সামলানো শুধু রবিশংকরের ওপর শ্রদ্ধা থেকেই করেছিলেন।’

কনসার্টের আগে নিউইয়র্কে প্রচার করার হলো জর্জ হ্যারিসন অ্যান্ড ফ্রেন্ডস; আর কারো নাম উল্লেখ করার হয়নি। যদিও নানা গুজব ছিল; কিন্তু কেউই ঠিক করে জানত না– কে কে পারফর্ম করছেন। ডিলান আর অর্ধেক বিটলস! আসলে তাদের উপস্থিতি আর মহতি উদ্দেশ্য এটাই ছিল যথেষ্ট। চ্যারিটি কনসার্টের মূলমন্ত্র নিয়ে বব গেলডফ যেমনটা বলেছেন, ‘শিল্পীর একমাত্র দায়িত্ব ভালো শিল্প সৃষ্টি করা; সেটা না করতে পারলে তারা ব্যর্থ।’

কনসার্ট অব বাংলাদেশ-এ রবিশঙ্কর, আল্লা রাখা খান আলী আকবার খান । ছবি: ব্রিজম্যান ইমেজ

সেদিক থেকে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ সার্থক। দুটো শো হয়েছিল দুপুর ২টা আর রাত ৮টায়। দুটো কনসার্ট প্রায় একই ছিল; শুধু কে কার আগে-পরে পারফর্ম করবেন, এর কিছুটা অদল-বদল ছিল। সাধারণত রকস্টাররা যেমন ইচ্ছে করে দেরি করে টান টান উত্তেজনা আর আগ্রহ সৃষ্টি করেন, তেমনটা না করে হ্যারিসন সময়মতো মঞ্চে উঠে ব্যাখ্যা করেন কনসার্টের উদ্দেশ্য আর তারপর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত দিয়ে কনসার্ট শুরু করেন রবিশঙ্কর, সারদে আলী আকবার খান আর তবলায় আল্লা রাখা খান দেন সঙ্গ।


হ্যারিসন
চেয়েছিলেন
যাদের জন্য এই
কনসার্ট, তাদেরকে
সম্মান দিতে। যেন মনে
না হয়, কেউ ভিক্ষার ঝুলি
নিয়ে এসেছে; বরং মনে হয়
সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত এক
জাতি বিপর্যয়ের
পড়েছে
মুখে

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর উত্তরসূরী, ১৯৮৫ সালের ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষপীড়িতদের চ্যারিটি কনসার্ট লাইভ এইড কনসার্টের মতো নয়, হ্যারিসন চেয়েছিলেন যাদের জন্য এই কনসার্ট, তাদেরকে সম্মান দিতে। যেন মনে না হয়, কেউ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এসেছে; বরং মনে হয় সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত এক জাতি বিপর্যয়ের পড়েছে মুখে। রবিশংকর বলেন, ‘আমরা একত্রেই এটা ঠিক করেছিলাম। জর্জ চেয়েছিল আমরা যেন প্রথমেই ভারতীয়দের উপস্থাপন করি।’

ট্যাপলিন বলেন, ‘জর্জের উদ্দেশ্য ছিল অসাধারণ ভারতীয় সংগীতের রাগ-রাগিণীর স্বাদ যেন তরুণেরা কনসার্টের শুরুতে দেখতে পায়।’ সেদিনের বাস্তবতায় সেটি দর্শকরা উপভোগ করার থেকে সহ্য করেছেন বলাটাই মানানসই।

রাগ সংগীতের পরে কিছুটা বিরতিতে ডাচ টেলিভিশনের ফুটেজে দেখানো হয় যুদ্ধের ভয়াবহতা। এখানে বলে রাখা ভালো, লাইভ এইড কনসার্টেও দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা দেখানো হয়েছিল দ্য কারস-এর ড্রাইভ গানের সঙ্গে।

এরপর শুরু হয় কিছুটা এলোমেলোভাবে জর্জ হ্যারিসনের নিজের পরিবেশনা– রক-সোল-গসপেল মিউজিক মিলিয়ে ওয়াহ… ওয়াহ। এ গানের মাঝেই নিজে ফিরে পান হ্যারিসন। মঞ্চের সামনে থেকে ওডেল আর বয়েড তাকে দেখছিলেন আর গর্বে-আনন্দে ফুটছিলেন। ‘আসলে ব্যক্তিগতভাবে একটা চিন্তার শুরু থেকে তার সার্থক রূপায়ন দেখাটা দারুণ ব্যাপার। সঙ্গে মানুষের ভালোবাসার ব্যাপারটাও মন ছুয়ে যাবার মতো;’ কনসার্টের শুরুতে কয়েক মিনিট সবাই যেভাবে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছিল, তা নিয়ে ভিলেজ ভয়েস-এ ছাপা হওয়া আলোচনায় ড্যান হিকম্যান বলেন, ‘মানবিক, মমতাময় এক পরিবেশ।’

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ জর্জ হ্যারিসন, জেস এড ডেভিসএরিক ক্ল্যাপটন। ছবি: এপি

ডিলানকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ‘আমাদের সবার বন্ধু’ বলে। রিঙ্গো স্টারের ইট ডোন্ট কাম ইজি দর্শকপ্রিয়তা পায়। লিওন রাসেলের রকস্টার ভাব আর দীর্ঘ গান জাম্পিং, জ্যাক ফ্লেশ/ইয়াংব্লাড কিছুটা বিরক্তি আনলেও বিলি প্রেস্টনের দ্যাটস দ্যা ওয়ে গড প্ল্যানড ইট আবার কনসার্ট মাতিয়ে তোলে।

ক্ল্যাপটন সেদিক থেকে কোনোমতে পারফর্ম করেন, স্বভাবতই নেশার ঘোর আর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তির কারণে। সারা নিউইয়র্ক খুঁজে তার জন্য হেরোইন না পাওয়ায় মেথোডোন নেন ক্ল্যাপটন। ‘তিনি আসলে কোনোমতে স্টেজে দাঁড়ালেও ঠিকমতো প্রস্তুত ছিলেন না,’ বলে ট্যাপলিন। ভুল গিটারে তিনি হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস বাজান। তার এই অবস্থার জন্য সবাই মনে করছিল, মিউজিশিয়ানের গুণের চেয়ে বন্ধুত্বের টানে এমন কনসার্টে ক্ল্যাপটনকে আনাটা ছিল বিবেচনার ভুল।

এরপর নিচুস্কেলে হিয়ার কামস দ্য সান দুটো অ্যাকুস্টিকে পারফর্ম করে হ্যারিসন আর ব্যাডফিঙ্গার-এর পিটার হ্যাম। এরপর পালা আসে ডিলানের, আগের রাতে তাকে দেখেও সবাই অনিশ্চয়তায় ছিলেন, তিনি কেমন পারফর্ম করবেন। হ্যারিসনকে অবাক করে দিয়ে বুলেটের গতিতে মঞ্চে উঠে ঠিকঠাকমতোই পারফর্ম করেন ডিলান। তার সঙ্গে মঞ্চে উঠে দারুণ বাজাতে থাকেন হ্যারিসন, বেজ গিটারে রাসেল আর ট্যাম্বুলিন নিয়ে রিঙ্গো স্টার। ট্যাপলিন বলেন, ‘আমার মনে হয় তাদের এই যৌথ পারফরম্যান্স ববের সেরা কনসার্টের একটা হয়ে থাকবে।’ ডিলানও তেমনটা মনে করেন, প্রথম শোয়ের পরে তিনি হ্যারিসনের সঙ্গে পার্ক লেনের হোটেলে গিয়ে রাতের শোতে একসঙ্গেই আসেন।


ক্ল্যাপটনের হেরোইনের নেশা
নিয়ে উষ্মা প্রকাশ
করেছিলেন
রবিশংকর

কনসার্ট শেষে সবাই রওনা দেন ম্যানহাটনের নাইটক্লাব উঙ্গানোতে, সেখানে কেউ কেউ পারফর্ম করবেন বলে। হ্যারিসনকে উচ্ছ্বসিত হয়ে ডিলান বলেন, আরও তিনটা কনসার্ট করা গেলে দারুণ হতো। বয়েড স্মরণ করেন, ‘সবাই বেশ ভালো ব্যবহার করছিল। মঞ্চের উত্তেজনার ঘোর লেগে ছিল অনেকক্ষণ।’ অনেকে অবশ্য এর সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত পোষণ করেন। ট্যাপলিন মনে করেন, ক্ল্যাপটনের হেরোইনের নেশা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন রবিশংকর। খুশিতে পাগল হয়ে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ফিল স্পেকটর কনসার্টের সামনের সারিতে রেকর্ড করতে করতে নাচছিলেন। উঙ্গানোতে স্পেকটর দারুণভাবে ডু ডু রন র পারফর্ম করেছিলেন।

পরের দিনে পত্রপত্রিকায় কনসার্টটাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়, যেন অনেকটা ষাটের দশকের খাঁটি মিউজিকের নস্টালজিয়া আর খাঁটি মিউজিকের ক্যারিশমা। ‘বাংলাদেশ’ কনসার্টকে অনেকটা উডস্টকে হওয়া মিউজিক ফেস্টের সঙ্গেও তুলনা করা হয়। রোলিংস্টোন ম্যাগাজিন লেখে, ‘ষাটের দশকের ইউটোপিয়ান সত্ত্বা যেন এখনো জেগে আছে।’ মিজিক্যালি এনএমই ম্যাগাজিন একে সত্তর দশকের শ্রেষ্ঠতম রক শো হিসেবে আখ্যা দেয়। কনসার্টটি নিয়ে উত্তেজনা আর প্রত্যাশা ছাপিয়ে গিয়েছিল হ্যারিসনদের সেদিনের পারফরম্যান্স।

কনসার্ট সুষ্ঠভাবে হয়ে গেলেও এর পর থেকে জল ঘোলা হতে থাকে। এ থেকে সহজ শিক্ষা পাওয়া যায়– চ্যারিটি আর মিউজিক একসঙ্গে চললেও মাঝখান থেকে ট্যাক্স, বজ্জাত ম্যানেজার আর রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রির লোকজন মিলে একটা তালগোল পাকানো অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। কনসার্টের পরই হ্যারিসনের ওপর দায়িত্ব বর্তায়, কনসার্টের অ্যালবাম আর চলচ্চিত্রটা বের করা আর কনসার্টের অর্থ দুর্গত মানুষের হাতে সময়মতো পৌঁছানো।

প্রেস কনফারেন্সে যেভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেভাবে একটা ট্রিপল লাইভ অ্যালবাম ১০ দিনের মধ্যে অ্যাপল স্টুডিও থেকে বের করতে গিয়ে দেখা গেল, বাস্তবতা বেশ জটিল। দুটো পারফরম্যান্সই রেকর্ড প্ল্যান্টের ১৬-ট্র্যাকের মোবাইল ইউনিটে রেকর্ড করা হয়েছিল, আর পরের দিনই শুরু হয়েছিল মিক্সিং কাজ। এরমাঝে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার স্পেকটর আবার অ্যালকোহলের নেশায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি শুরু করলে সব দায়িত্ব পড়ে হ্যারিসনের ঘাড়ে।

এতজন শিল্পীর স্টেজ পারফরম্যান্স সোজা কথা নয়; তাছাড়া কিছু অংশ নতুন করে করার ছিল। বিশেষ করে লিওন রাসেলের লম্বা গানগুলো আর হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস। অন্যদিকে, দুবারেই হ্যারিসনের ওয়াহ-ওয়াহ ছিল একেবারে নিখুঁত। হ্যারিসন সব শিল্পীকেই জানিয়েছিলেন, কারও রেকর্ডের সাউন্ড পছন্দ না হলে তাকে যেন জানানো হয়। কেউই অবশ্য রেকর্ড নিয়ে আপত্তি তোলেননি। এক সপ্তাহের বেশি সময় রেকর্ড প্ল্যান্টে কাজ করার পর ফাইনাল মিক্সের জন্য লস অ্যাঞ্জেলেসের সানসেট সাউন্ডে পাঠানো হয় সেপ্টেম্বরে। এর মাঝে হ্যারিসন আর বয়েড ফিরে যান যুক্তরাজ্যে।

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এ জর্জ হ্যারিসনবব ডিলান। ছবি: গেটি ইমেজ

খারাপ কোয়ালিটির সাউন্ড আর স্পেকটরের পাগলামি সামলানো এক জিনিস; কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ এলো অডিও ইন্ডাস্ট্রি থেকে। ডিলানের রেকর্ড কোম্পানি কলম্বিয়া দাবি করল, তারা অ্যালবামটা প্রকাশ করবে। শেষ পর্যন্ত তারা রাজি হলো অধিকাংশ ডিস্ট্রিবিউশনের অধিকার আর প্রতি অ্যালবাম বিক্রির বিপরীতে ২৫ সেন্টের জন্য। একমাত্র তারাই এই কনসার্ট থেকে লাভ নিয়েছিল।

ক্যাপিটালের প্রধান আর হ্যারিসনের যুক্তরাস্ট্রে প্রতিনিধি ভাস্কর মেনন ৫ লাখ ডলার দাবি করে বসেন অ্যালবামটা ঠিকমতো বাজারে আনার জন্য। হ্যারিসন কিন্তু কড়াভাবে জানিয়ে দেন, যেহেতু এই কনসার্টে কোনো শিল্পী টাকা নেননি, আর অ্যাপল এ অ্যালবামের প্যাকেজিংয়ের কোনো টাকা নিচ্ছে না, তাই রেকর্ড কোম্পানিগুলোও ব্যতিক্রম হতে পারে না।

এই লম্বা টানাপোড়েনের মাঝেই অ্যালবামের মিক্সিং শেষ হতে হতে হ্যারিসন যুক্তরাস্ট্রে ফিরে এলেন। এবার, ২ অক্টোবর তিনি যুক্তরাজ্য ছেড়েছিলেন এসএস ফ্রান্সে। নিউইয়র্কের ফিফিথ এভিনিউয়ের প্লাজা হোটেল বসেই ঠিক হলো সবকিছু। অ্যালবামের কভারে নিউজ ফুটেজ থেকে নেওয়া শূন্য থালা পেতে বসে থাকা অভুক্ত, অপুষ্ট শিশুর ছবি ব্যবহার করার কথা ঠিক হলেও ক্যাপিটালের কর্মকর্তাদের কাছে ছবিটাকে বেশি দুঃখভারাক্রান্ত মনে হওয়ায় তারা সেটা বদলে প্রস্তাব করেন; অ্যালবামের সঙ্গে ৬৪ পৃষ্ঠার বুকলেটের ব্যাক কাভারের গিটার কেস ভরা খাবার আর ওষুধের ছবি আর নিচে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে পাওয়া অর্থের চেকের ছবি দেওয়া হয়। হ্যারিসন এটা জানতেন না। কপি দেখে বয়েডকে চিঠিতে হ্যারিসন লিখলেন, ‘প্রুফে তারা যেটা রেখেছিল, সেটা চিৎকার করে বলছিল– আমায় বদলে ফেলো। এখন সব ঠিক আছে; অভুক্ত বাচ্চাটার ছবিই থাকছে। শুধু সত্যটা পছন্দ করে না বলে এমন আজেবাজে কাজের কোনো মানেই হয় না।’

এরপর তিনি কাজ করা শুরু করেন কনসার্টের ভিডিও ফুটেজ নিয়ে, যেখান থেকে রবিশংকরের ৪৫ মিনিটের পারফরম্যান্স কেটে ১৫ মিনিট করে চলচ্চিত্রে জন্য উপযোগী করা হয়। এই সব কিছুর মাঝে তিনি চেষ্টা করছিলেন অ্যালবাম বের করার। ২৩ নভেম্বর ডিক ট্রেভর শোতে সরাসরি ভাস্করকে ’বাস্টার্ড’ বলেন তিনি। আরও বলেন, দরকার হলে কলম্বিয়া রেকর্ডকে বাদ দিয়েই অ্যালবাম বের করা হবে, পারলে তারা যেন মামলা করে!

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অ্যালবামের কভার

প্রকাশ্যে এমন অপমানিত হয়ে মেনন বলেছিলেন, “হ্যারিসন মনে হয় পুরো ব্যাপারটা জানেন না। কিছুটা সমঝোতা করে ক্যাপিটাল রেকর্ডস অ্যাপলকে ডিসেম্বরে অ্যালবাম বিক্রির অগ্রীম হিসেবে ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের চেক দেয়। এর মাঝে সুসম্পর্কটা নষ্ট হয়ে গেছে; আর অনেকে পাইরেটেড বুটলেগ অ্যালবাম বাজারে ছেড়ে দিয়েছে– যার ফলে হ্যারিসন বিজ্ঞাপন করতে বাধ্য হলেন– ‘একটা অভুক্ত শিশুকে বাঁচান, বুটলেগ না কিনে অ্যালবাম কিনুন’!” তিনি দেখলেন, সবাই তার সুনামের সুবিধা নিচ্ছে; যার ফলে প্রায় চার মাস পরও টাকাটা পাঠানো যাচ্ছে না। এই অভিজ্ঞতা হ্যারিসনের ওপর প্রভাব ফেলে পরের ২-৩ বছর।

অবশেষে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ অ্যালবাম প্রকাশ পায় সুন্দর প্যাকেজে: তিন অ্যালবামের বক্স সেটে যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর, আর যুক্তরাজ্যে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। খুচরা মূল্য ছিল যথাক্রমে ১২.৯৮ ডলার ও ৫.৫০ পাউন্ড। এত দাম নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়; যার ব্যাখ্যায় বলা হয়– কর, সারচার্জ এড়িয়ে উদ্বাস্তুদের কাছে টাকা পৌঁছাতে হলে এর কমে অ্যালবাম বিক্রি করা সম্ভব ছিল না। অক্টোবরে হ্যারিসন যুক্তরাজ্য ট্রেজারির প্যাট্রিক জেঙ্কিনসের সঙ্গে দেখা করেন যেন কর মুক্তি পাওয়া যায়; তবে তার সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

ডিক ক্যাভেট শো’তে ভাস্কর মেননের সঙ্গে হ্যারিসনের ঝগড়ার গোড়াতে পানি ঢেলেছিলেন ক্লেইন। নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় উঠে আসে অ্যালবামপ্রতি ১.১৪ ডলার হিসেব না মেলার কথা, আর এর মাধ্যমে ক্লেইন আসলে নিজের পকেট ভারি করতে চেয়েছিলেন অ্যালবাম বিক্রির টাকা থেকে। 

শেষমেশ, সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর-ব্যবস্থা। ‘ব্যাপারটা একেবারে সহজ-সরল নয়,’ জোনাথন ক্লাইড ২০১১ সালে আমাকে বলেছিলেন। ক্লাইড-হ্যারিসনের ডার্ক হর্স মিউজিক্যাল লেবেল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর সত্তর-দশক আর এখনো এই কনসার্টের আন্তর্জাতিক ব্যাপারস্যাপার সামলে আসছে। “কনসার্টটা আসলে হুট-হাট করেই হয়ে গেছে, আর ভুল হয়েছে যে, কাকে দান করা হবে– সেটা আগে থেকে ঠিক করা হয়নি। জর্জ আসলে ভেবেছিলেন, ‘আমার কনসার্টটা করতে হবে, আর ভুক্তভোগী মানুষের হাতে টাকাটা পৌঁছে দিতে হবে;’ কিন্তু কার মাধ্যমে সেটা দেওয়া হবে, সেই ভাবনা এলো কনসার্ট শেষ হবার পর। হ্যারিসন রেড ক্রস আর ইউনিসেফের সঙ্গে যোগাযোগ করেন কনসার্টের পর। ঠিক করা হয়, ইউনিসেফই কাজটা করবে। কিন্তু এর মধ্যে আইআরএস (আমেরিকান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা) এসে তাদের করের টাকা নিয়ে যায়। কারণ, কনসার্ট পরিবেশনের সময় দাতা-গ্রহীতার বিষয়টা পরিষ্কার ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপারটা হ্যারিসনকে হতাশ করে; আসলে রাগিয়েই তোলে। সবাই আসলে এভাবেই শেখে। পরবর্তীকালে বব গেলডফ ‘লাইভ এইড’ কনসার্ট করার সময় উপদেশ চাইলে জর্জ বলেছিলেন, ‘আগে থেকে সব দেখেশুনে ঠিকঠাক করে নিও।’ ১৯৭১ সালে চ্যারিটি কনসার্ট কীভাবে করতে হবে, সেটা কেউই জানত না।”

তবে কনসার্টের কর মওকুফের ব্যাপারে আগে থেকে চিন্তা না করাটা ছিল ম্যানেজার ক্লেইনের একটা বিরাট ভুল, যিনি নিজেও একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। এর মানে হলো, সত্তরের দশকে এই অ্যালবাম আর চলচ্চিত্র থেকে পাওয়া টাকা চলে গেছে আইআরএস-এর এস্কো অ্যাকাউন্টে, যার পরিমাণ ১৯৭৮ সালে হারিসন মোটামুটিভাবে ধরেছিলেন আট থেকে দশ মিলিয়ন। ‘তবে আইআরএস-এর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত ঝামেলা মিটে গেলে টাকাটা বাংলাদেশ পৌঁছেছিল,’ বলেন ক্লাইড।


বাস্তবিক
অর্থে এই
কনসার্ট কী
অর্জন করতে পেরেছে?

বাস্তবিক অর্থে এই কনসার্ট কী অর্জন করতে পেরেছে? এক রাতে ২৪৩,৪১৮.৫ ডলার– যেটা ১১ দিন পরেই ইউনিসেফকে দেওয়া হয়। তবে রেকর্ড আর চলচ্চিত্রটা বহু বছর পরেও ছিল আর্থিকভাবে সফল। বেশি দামের পরেও এই ট্রিপল অ্যালবাম বেস্ট সেলার হয়েছিল। ‘বিলবোর্ড ২০০’ তালিকায় ছয় সপ্তাহ পরেও এটা ২ নম্বরে ছিল, আর ব্রিটেনে এটা ছিল হ্যারিসনের দ্বিতীয় চার্টের শীর্ষে পৌঁছানো অ্যালবাম।

সব সমালোচনাতেই প্রশংসা করা হয়েছে এই সদিচ্ছার। সবাই ভালো কিছুই খুঁজে পেয়েছিল এই কনসার্টের গানগুলোতে: শুরুর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, বিল প্রেস্টনের জোই ডি ভেররি, হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস-এ হ্যারিসনের গিটার সলো, ডিলানের দ্বিতীয়বার স্টেজে আসা, ক্ল্যাপটন আর হ্যারিসনের হোয়াইল মাই গিটার জেন্টলি উইপস-এ গিটার ডুয়েল…। ‘হ্যারিসন আর স্পেকটর পেরেছিলেন লাইভ কনসার্টের আবেগ আর সূক্ষ্ম মিউজিক্যালিটিকে রেকর্ডে ধরে ফেলতে,’ এমনটা লিখেছিলেন রিচার্ড উইলিয়ামস, মেলডি মেকার ম্যাগাজিনে লেখা সমালোচনায়। এনএমই লিখেছিল, “ইনডোরে সম্ভবত সবচেয়ে দারুণ রকএন্ডরোলের ঘটনা ছিল ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।”

১৯৭৩ সালের মার্চে এই অ্যালবাম গ্র্যামি পুরস্কার জেতে বছরের সেরা অ্যালবাম হিসেবে; যদিও রবিশঙ্কর আর খানের সেদিনের পারফরম্যান্সে তেমন সাড়া ছিল না, কিন্তু অ্যালবামটি হ্যারিসনের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে পশ্চিমে পরিচিত করার উদ্দেশ্যটা সফল করে ফেলে।


হ্যারিসন
মারা যাবার
আগে ব্যক্তিগতভাবে
‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’
আবার করার স্বপ্ন দেখতেন;
কিন্তু সেটা আর
হয়ে ওঠেনি

২০০১ সালে হ্যারিসন মারা যাবার আগে ব্যক্তিগতভাবে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আবার করার স্বপ্ন দেখতেন; কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ২০০৫ সালে এই কনসার্টের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ডিভিডিতে প্রকাশ পায়, যার সঙ্গে সিডিও বের হয়। প্রায় সেই সময়ই জর্জ হ্যারিসন ফান্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিসেফের উদ্যোগে, তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের পরামর্শে। ওই অ্যালবাম থেকে আয় আর ডিরেক্টর সল সুইমারের কনসার্ট ডকুমেন্টারি থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১৭ মিলিয়ন ডলার ইউনিসেফ পেয়েছিল, যা বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দুর্গত অঞ্চল, যেমন এঙ্গোলা থেকে শুরু করে রোমানিয়াতে ব্যয় করা হয়।

মিউজিক্যালি ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ বের হবার কমাস পরেই, ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য ভার্সনে ৩০ হাজার দর্শক ওভালে জড়ো হয়েছিলেন, যেখানে দ্য হু, ফেসেস, মট দ্য হুপলস পারফর্ম করেছিল। এর পর থেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে, যেমন ১৯৮৫ সালে দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য ‘লাইভ এইড’ আর শখানেকের বেশি চ্যারিটি কনসার্ট হয় এর অনুপ্রেরণায়।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এর মাধ্যমে উদীয়মান একটি জাতি– যেটি সহিংসতা আর দারিদ্র্য-পীড়িত, বিশ্বে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বরে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। হ্যারিসন এ দেশে কখনো আসতে না পারলেও রবিশংকর বলেন, ‘আমি তিনবার বাংলাদেশে গিয়েছি। তারা আমাকে আর জর্জকে আসলেই অনেক ভালোবাসে।’


বিটলস
ব্যান্ডের সবচেয়ে
চুপচাপ মানুষটাই সবচেয়ে
কাজের কাজটা করতে পেরেছিলেন’

২০২১ সালে এসে, ৫০ বছর পরে, সেই কনসার্ট সত্যিকার অর্থেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সহানুভূতিশীল, সচেতন বিশ্ব-নাগরিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে; সব স্বার্থপরতা, ধান্দাবাজি, শঠতার মাঝে অন্ধকারে জ্বলন্ত আলোক-শিখা হয়ে। ভিলেজ ভয়েস পত্রিকা যথার্থই লিখেছিল, ‘বিটলস ব্যান্ডের সবচেয়ে চুপচাপ মানুষটাই সবচেয়ে কাজের কাজটা করতে পেরেছিলেন।’

জর্জ হ্যারিসন। প্রতিকৃতি: আলেকসান্দর ফেদোরভ

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ অনেকে অংশ নিলেও এটা যেন ব্যক্তি জর্জ হ্যারিসনের মাপকাঠি। তার সমসাময়িক অনেক কিংবদন্তিও এত নৈপুণ্যের সঙ্গে এটা করতে পারতেন না। যেমনটা বলেছেন জন ট্যাপলিন, “জিমি পেজ কিংবা মিক জ্যাগার অনেক বড় তারকার হলেও ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করতে পারতেন না। এমনকি জন লেননও না।”


গ্রেইম থমসন: সাংবাদিক; যুক্তরাজ্য। তার লেখা বই: 'জর্জ হ্যারিসন: বিহাইন্ড দ্য লকড ডোর'
সূত্র: জিকিউ; ম্যাগাজিন, যুক্তরাজ্য। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১
Print Friendly, PDF & Email

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here