জেনিস জপলিন: বারুদ ঝরানো এক দাপুটে সত্তা

0
51
জেনিস জপলিন

মূল: অ্যালিস একোলস
ভূমিকা ও অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের ভূমিকা:
প্রথম নারী রকস্টার হিসেবে খ্যাত তিনি। ছিলেন আমেরিকান সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড ‘বিগ ব্রাদার অ্যান্ড দ্য হোল্ডিং কোম্পানি’র [১৯৬৫-] লিড ভোকাল। ব্যান্ড ছেড়ে সলো ক্যারিয়ারের দিকেও হেঁটেছিলেন। কিন্তু মাত্র ২৭ বছর বয়সেই মাদকের ওভারডোজ তাকে চিরতরে কেড়ে নেয়। পৃথিবীকে চিরবিদায় জানানোর আগে, কণ্ঠস্বর ও পারফরম্যান্সের দাপটে গড়ে তুলে গেছেন এক দারুণ মিথ। সাইকেডেলিক রক, সোল, ব্লুজ এবং ব্লুজ রক ধারার এই ভোকাল, গীতিকার ও গিটারিস্টের জীবনের ওপর অন্যতর আলোকপাত ফেলে আমেরিকান ইতিহাসবিদ অ্যালিস একোলস লিখেছেন ‘স্কারস অব সুইট প্যারাডাইস: দ্য লাইফ অ্যান্ড দ্য টাইমস অব জেনিস জপলিন’। জেনিস ও তার সময়কে খানিকটা বোঝার জন্য সেই গ্রন্থের ভূমিকা পর্বের সংশ্লিষ্ট অংশবিশেষ হাজির করা হলো এখানে…


জেনিস জপলিন
ভোকাল; যুক্তরাষ্ট্র
[১৯ জানুয়ারি ১৯৪৭–৪ অক্টোবর ১৯৭০]


জেনিস জপলিন যখন ছোট শিশু, এক রাতে তার মা খেয়াল করলেন, তিনি ঘুমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেছেন। তার মা চিৎকার করে ওঠলেন, ‘জেনিস, তুমি কী করছ? কই যাও?’

নিশ্চিতভাবেই জপলিন পরিবারের জন্য নিজেদের এই খেয়ালী কন্যাকে ভবিষ্যতে আরও বহুবার করা এমনতর প্রশ্নের এটি ছিল একটিমাত্র; তবে সে রাতে জেনিস স্রেফ বলেছিলেন, ‘বাড়ি যাচ্ছি। আমি বাড়ি যাচ্ছি।’ সেই শিশু বয়সেই জেনিস যেন বুঝে গিয়েছিলেন, এ বাড়িতে তিনি মানানসই নন; টেক্সাসের পোর্ট আর্থার নামে তৈল শোধনাগার শহরটি তার ‘একমাত্র বাড়ি’ হতে পারে না।

স্লিপওয়াকিং থেমেছিল জেনিসের, কিন্তু বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, চলনশীলতা কখনোই থামাননি তিনি।

মাঝরাতে একা একা বাড়ি থেকে ছোট্ট শিশুর বেরিয়ে যাওয়া– এরচেয়ে মানানসই কোনোকিছু যেন অস্থিরচিত্ত জীবন ও মিউজিকের অধিকারী এই গায়িকার একটি অপেক্ষাকৃত অধিক মর্মভেদী ও সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি হতে পারে না। তার অবিশ্বাস্য রকমের প্রাচীরভেদী কণ্ঠের গানে এই অস্থিরচিত্তের সন্ধান পাবে যেকেউ।


জেনিসের
একেকটি ব্লুজ
ছিল নিজের ভয়াবহ
একাকিত্ব-সহ জীবনের বহু
অবিচারের অপ্রস্তুতবোধ ও নৈরাশ্যের
প্রতি স্ল্যাশ-অ্যান্ড-বার্ন আক্রমণ,
বাজখাই চিৎকার ও
আর্তনাদ

কোনো নোট স্রেফ ঠিকঠাক গেয়ে ওঠার বালাই ছিল না জেনিসের; বরং নিজের কণ্ঠকে তিনি এমনভাবে অনুশীলন করিয়েছেন, যেন সাউন্ড শুনে মনে হয়– একইসঙ্গে দুটি নোট গাইছেন তিনি। বেশিরভাগ হোয়াইট বা শ্বেতাঙ্গ ব্লুজ মিউজিয়ান যেখানে ক্লাসিকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আস্থাশীল সমর্পণ করেছেন নিজেদের; সেখানে জেনিসের একেকটি ব্লুজ ছিল নিজের ভয়াবহ একাকিত্ব-সহ জীবনের বহু অবিচারের অপ্রস্তুতবোধ ও নৈরাশ্যের প্রতি স্ল্যাশ-অ্যান্ড-বার্ন আক্রমণ, বাজখাই চিৎকার ও আর্তনাদ।

শেষ পর্যন্ত, জেনিসের কাছে বাড়ি মানে ছিল এমন এক জায়গা– যেটির দেখা ক্ষণিকের জন্য পেয়েছেন বলে মনে হলেও আসলে কোনোদিনই তিনি খুঁজে পাননি; সেটি বরং তার জীবনজুড়ে রয়ে গিয়েছিল অদ্ভুতভাবে অধরা। জনৈক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে ডাকতেন ‘ষাটের দশকের সবচেয়ে নিশ্চিত ও সর্বাধিক প্রচারিত গৃহহীন ব্যক্তি’ বলে; এ কথাতেই তার নিঃসঙ্গতা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে জেনিসের বিচ্ছিন্নতা ছিল কোনো ব্যক্তিগত বিচ্ছেদের চেয়েও বেশি কিছু; এটি ছিল সেই প্রজন্মের একটি চেনা অভিজ্ঞতা। ‘যত পরিবর্তন আমরা ঘটিয়েছি, সবগুলোতেই ছিলেন তিনি,’ জেনিসের মৃত্যুকালে বলেছিলেন (সমসাময়িক আমেরিকান গায়ক) জেরি গার্সিয়া। আরও বলেছিলেন, ‘সবগুলো যাত্রাতেই তিনিও ছিলেন যাত্রী। তিনি ছিলেন আমাদের বাকি সবারই মতো– ফালতু সব জায়গায় ত্যক্ত-বিরক্ত, প্রলম্বিত।’

মিল খুঁজতে গিয়ে গার্সিয়া হয়তো অতিরঞ্জনই করেছেন; তবু জেনিসের জার্নি নিশ্চিতভাবে শুধু তার একার ছিল না। বিটনিক [বিট জেনারেশন বা মুভমেন্টের অনুসারী] হতে চাওয়া আরও অনেকের সঙ্গে জেনিস বছরের পর বছর কাটিয়েছেন রাস্তায়, (আমেরিকান লেখক) জ্যাক কেরোয়াকের দেখানো পথে; ছুটে গেছেন কাউন্টারকালচারের দিকে।

সারা দেশ চষে বেড়িয়ে, যাযাবরের মতো জীবন কাটানো বোহেমিয়ান শিশুরা যেভাবে ‘নোঙর’ ফেলত, (আমেরিকান সাংবাদিক) টম ওলফ সেটিকে আমেরিকার ‘সেবাকেন্দ্রিক প্রান্তে জিপসির মতো’ বলে অভিহীত করেছেন। খানিক সময়ের জন্য তারা এমন জায়গায় থিতু হতো, যার উদাহরণ আমেরিকার ভাঙন ধরা আন্তঃনগর এলাকা– স্যান ফ্র্যান্সিস্কোর হাইট-অ্যাশবারি– যেখানে জেনিস ষাটের দশকের মধ্যভাবে অবতরণ করেছিলেন।

জেনিস জপলিন

তার বাবা-মা যেখানে আমেরিকান ইতিহাসের বৃহত্তম মাইগ্রেশন– দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর শহুরে দলবদ্ধ প্রস্থানের অংশ, জেনিস ও তার স্কুলপলাতক বন্ধুরা সেখানে নিজেদের বাবা-মায়েদের পরিত্যাগ করে আসা শহরগুলোতে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে উল্টোপথে মাইগ্রেশন করার অগ্রদূত। বস্তিতে জীবনধারণে বাধ্য হওয়া অভিবাসী প্রজন্মগুলোর বিপরীতে তারা বরং নিজেদের ‘আমেরিকান ড্রিমে’র পেছনে, ‘বস্তিভরা আমেরিকায়’ হিপি হয়ে ওঠার জন্য পথে বাড়িয়েছিলেন পা।

তাদের কাছে, তাদের সামনে থাকা ‘বিট’দের মতোই, পদদলিতদের সঙ্গী করে বিপরীত মনোভাব ও আত্মপরিচয় হয়ে উঠেছিল পঞ্চাশের দশকের কোমলতা, গতানুগতিকতা ও হাইপারডোমেস্টিসিটিকে প্রতিরোধ করার তরিকা। আমেরিকার অতুলনীয় প্রাচুর্যের মাধ্যমে জীবনের একটি পন্থা লিখিত হয়ে গিয়েছিল তাদের, তবে তাতে ছিল এই দৃঢ়বিশ্বাসের পূর্বাভাস, যে, সম্পদ ও আয়েশ আসলে আত্মিক ও আবেগিক দারিদ্রের বংশবিস্তার ঘটায় এবং সব ধরনের অকৃত্রিমতা ও আত্মিকতাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে। ‘টাকা কথা বলে না, খোদার কসম,’ গানে গানে তাচ্ছিল্য করে ঠিক যেমনটা বলেছিলেন বব ডিলান।


ছিন্নমূল,
সম্পৃক্ততাহীন
ও বেপরোয়া জেনিস
ছিলেন একেবারেই যথাযোগ্য
“নোবডি’স গার্ল”– যে অবস্থান
একইসঙ্গে মুক্তির ও বেদনাবোধের

ছিন্নমূল, সম্পৃক্ততাহীন ও বেপরোয়া জেনিস ছিলেন একেবারেই যথাযোগ্য “নোবডি’স গার্ল”– যে অবস্থান একইসঙ্গে মুক্তির ও বেদনাবোধের। গতি কামনা করতেন তিনি; নিজের কাছ থেকে, এবং নিজেকে জর্জরিত করা সবকিছুর কাছ থেকে। পোর্ট আর্থারে তার আসন্ন বছরগুলোর মর্মপীড়া থেকে সেটি ছিল একটি উদ্দীপনাময় উন্মত্ততা।

স্টারডম বা তারকাখ্যাতি জেনিসের জীবনের সব ধরনের গতি এনে দিয়েছিল; তবে এটি তাকে একইসঙ্গে ভয়াবহরকমের একাকিত্বও এনে দেয়: হোটেল রুম, ড্রেসিংরুম, বিমানবন্দর ও পানশালাগুলোর ভেতর জীবন এক ঝাপসা রূপে ধরা দেয় তার কাছে। ইচ্ছেমতো কথিত ‘উগ্র’ পোশাক পরে, গোলাপি ও নীল পালকে বুনো সাজে সেজে, প্রবল ঝুনঝুন শব্দ করা ব্রেসলেটে হাতভর্তি করে জেনিস হয়ে উঠেছিলেন আকর্ষণের এক আলাদা ও সদাহাজির বিষয়বস্তু। তবে তাকে হরদমই উপহাস ও অপমানেরও শিকার হতে হয়েছে।

যদিও সমাজের দিকে সোজা নিজের নাক গলিয়ে দিতেন তিনি, তবু ভীষণভাবে চাইতেন, যেন তাকে লোকে পছন্দ করে; এমনকি যাদের নিজে তাচ্ছিল্য করতেন, তারাও। অন্তরঙ্গ সম্পর্কগুলোর কারণে নিজ স্বাধীনতাকে আপস করতে বাধ্য হওয়ায় যদি তিনি ক্ষুব্ধ হয়েও থাকেন, তবু নিজের একান্ত কোনো মানুষ না থাকার বেদনাও তাকে যারপরনাই পুড়িয়েছে।

নিজ সময়ের অন্য সব বিদ্রোহীর মতো জেনিসও আত্মপরিচয়ের সব চলতি ক্যাটাগরিকে করেছিলেন প্রত্যাখ্যান। তার দুনিয়ায় বর্ণবাদী এবং কখনো কখনো এমনকি যৌনতাকেন্দ্রিক ক্যাটাগরিগুলোও ছিল স্ট্রেটজ্যাকেটের মতো অবজ্ঞেয়। জেনিস অবশ্য সর্বোচ্চমাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় নিরীক্ষার পথ বেছে নিয়েছিলেন; নারী ও পুরুষ– উভয়ের সঙ্গে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে নিজেকে তিনি ‘প্রথম সাদাকালো ব্যক্তি’ হিসেবে দাবি করতেন, এবং ছেলেদের মতোই যত্রতত্র মদ খেতেন ও হৈচৈ করতেন।

তার সব ধরনের স্বাধীনতার ভেতর ছিল বুনো আনন্দ; তবে এর দাম তাকে বেশ ভালোভাবেই দিতে হয়েছে। অ্যাবিউজ থেকে সুরক্ষিত থাকার প্রচেষ্টায় জেনিস নিজেকে একজন টাফ-গার্লের অবয়বের ভেতর উপস্থাপনের মাধ্যমে বিদ্রোহ ফুটিয়ে তুলতেন ঠিকই, তবু তাকে নিরন্তরভাবে জ্বালাতন ও অবমাননার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।


‘একজন
দর্শক-শ্রোতা
আমাকে যতটুকু
ভালো অনুভূতি দেয়,
কোনো পুরুষ কখনোই
সেটি দিতে
পারেনি’

‘সঠিক পুরুষটি’কে খুঁজে পেলে তার সঙ্গে ঝুলে পড়ে কোনোমতে জীবন কাটিয়ে দেওয়াতেই সন্তুষ্টি খুঁজে নেওয়া ছিল যে সময়ে মেয়েদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা, সেই সময়ে নিজ আকাঙ্ক্ষাগুলোর কারণে অনেক যন্ত্রণা সইতে হয়েছে জেনিসকে। তিনিও চাইতেন ‘সঠিক পুরুষ’টিকে খুঁজে পেতে; কিন্তু তার চাওয়া ছিল এরচেয়েও বেশি। একাধিকবার তিনি স্বীকার করেছেন, ‘একজন দর্শক-শ্রোতা আমাকে যতটুকু ভালো অনুভূতি দেয়, কোনো পুরুষ কখনোই সেটি দিতে পারেনি।’ কিন্তু তার পথটি ছিল অনির্দিষ্ট, এবং তিনি সেই পথে অস্থিরচিত্তে এগিয়ে গেছেন।

জেনিস হয়তো একজন বিদ্রোহী ছিলেন (ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে ব্রা না পরা প্রথম ছাত্রী এবং আরও নানা কিংবদন্তি রয়েছে তার নামে), তবে পঞ্চশের দশকের গোঁড়ামি তিনি পুরোপুরি ভেঙে দিতেও ছিলেন না সক্ষম। সত্য হলো, আক্ষরিক অর্থে– এমনকি সবচেয়ে সংকল্পবদ্ধ বিদ্রোহীদের কথাও যদি ধরি– কেউই পঞ্চাশের দশকের আঁচড় থেকে পালাতে পারেননি।

জেনিসের বিদ্রোহী সত্তাকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে যে জিনিস, তা হলো– তিনি নিজ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি আগুয়ান ছিলেন; আধুনিক নারীবাদ যে ধরনের প্রত্যাখ্যানগুলোর পুনর্জাগরণের ডাক দেয়– কথিত গুড গার্ল হতে না চেয়ে সেইসব প্রত্যাখ্যান তিনি বহু আগেই করে ফেলেছেন। ১৯৬৭ সালে জেনিস যখন সংবাদশিরোনাম হতে শুরু করেন, তখনো নারীদের প্রথম লিবারেশন গ্রুপগুলোর আবির্ভাব ঘটেনি; তখনো নারীদের জন্য ক্যারিয়ার ও পরিবার একেবারেই অপরিবর্তনীয় ছিল। আর, নারী-পুরুষের সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে, তখনো কাউন্টারকালচার সত্যিকারের কাউন্টার হয়ে ওঠেনি।

একজন সফল পপ গায়িকা হয়ে ওঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করার পর জেনিসকে যথেষ্ট কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল ঠিকই, তবে তিনি এমন একটি সংস্কৃতির ভেতর নিজের জন্য জায়গা করে নেওয়ারও চেষ্টা চালাচ্ছিলেন– যেখানে একজন নারীর জন্য অনুমোদিত একমাত্র ভূমিকা ছিল নিজ পুরুষের ‘ওল্ড লেডি’ হয়ে ওঠা।

জেনিস হয়তো “নোবডি’স গার্ল”ই ছিলেন, তবে কোনো ‘নোবডি’র জন্য প্রাণ দেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত, পোর্ট আর্থারের এই ‘পিগ’ই হয়ে উঠেছিলেন রক দুনিয়ার প্রথম নারী সুপারস্টার– নিজে সবসময় যেটিতে স্বস্তি পেতেন, ঠিক তার উল্টো ভাগ্য ছিল এটি তার জন্য।

বস্তুত, নিজের আইডল (আমেরিকান গায়িকা) বেসি স্মিথের মতো জেনিস ছিলেন ব্লুজ মিউজিকের একেবারেই কেন্দ্রস্থলের ‘বিস্ময়কর প্রতিচিত্রে’র এক দারুণ উদাহরণ– যা ‘নোবডি’কে ‘সামবডি’তে পরিণত করেছিল। জীবনের এক প্রতিবিম্বিত মুহূর্তে জেনিস একদা ভেবেছিলেন, ‘কী আজব ও উদ্ভট সব ঘটনা’ তার জীবনকে ‘এই জায়গায়’ নিয়ে এসেছে। স্বভাবতই নিজেদের মেধাকে লঘু করে নিয়ে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, “প্রতিটি ফালতু বোধগম্য জিনিস এটিকে একত্রিত রূপ দিয়ে এই বিস্ময়কর ব্যক্তিকে, এই ‘চিক’কে গড়ে তুলেছে– যিনি এই একটি জিনিসেই ছিলেন দারুণ– তা হলো– পুরুষ, স্রেফ এই একটা ফালতু জিনিসেই।”

বিগ ব্রাদার অ্যান্ড দ্য হোল্ডিং কোম্পানি

তিনি ‘চলতি পথে হারিয়েছেন অনেক কিছু,’ আর বলতেন, ‘সেটি কোনোদিনই হয়তো ফিরে পাব না।’ তবু কখনো হাল ছাড়েননি। ‘জানি, আমি হাল ছাড়ব না,’ জোর দিয়ে বলতেন। ভয়ানক সব হারানোর বেদনা জেনিসকে সইতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো কিংবা নিজ মর্মান্তিক মৃত্যু– কোনোটিই তার অর্জন কিংবা সদা প্রাণোচ্ছল মেজাজকে খাটো করতে পারেনি।

জেনিস জপলিনের আগে জেনিস নামে আরেকজনের আবির্ভাব ঘটেছিল– জেনিস মার্টিন। ১৯৫৬ সালে ১৫ বছর বয়সী জেনিস মার্টিন ‘উইল ইউ, উইলিয়াম’ গানের মাধ্যমে টপ-টেন হিট গানে জায়গা করে নিয়েছিলেন। গানটির প্রকাশক আরসিএ রেকর্ডস [আমেরিকান রেকর্ড লেবেল]। ১১ বছর বয়স থেকে গান পারফর্ম করা মার্টিনকে চুক্তিবদ্ধ করার মাস কয়েক আগেই আরসিএ আরেক রেকর্ড লেবেল– সান রেকর্ডকে তখনকার হিসেবে অবিশ্বাস্য রকমের টাকা– ২৫ হাজার ডলার দিয়েছিল এলভিস প্রিসলির চুক্তির জন্য।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরসিএ’র কোনো এক কর্মকর্তার মাথায় আইডিয়া আসে: এলভিসের সাফল্যকে ক্যাশ করার জন্য ‘ফিমেল এলভিস’– মার্টিনকে দলে বেড়ানো। বলে রাখা ভালো, মার্টিনের ক্ষেত্রে ‘ফিমেল এলভিস’– উপাধিটি এলভিস ও তার ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কার অবজ্ঞাসূচক হিসেবেই অনুমোদন দিয়েছিলেন!

শুরুতে ফর্মুলাটি কাজে লেগেছে বলেই মনে হয়েছিল। ‘মাই বয় এলভিস’-এর রকেবিলি টোনে আবারও টপ-১০-এ জায়গা করে নিয়েছিলেন মার্টিন। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তিনি কখনোই নিজের যোগ্যস্থান খুঁজে পাননি। তিনি যখন শিশু, তার কণ্ঠে রক’এন’রোলের কারুকাজকে কান্ট্রি গানের শ্রোতাদের কাছে আদুরে মনে হলেও তিনি তরুণী হয়ে উঠলে সেটি অশ্লীলতা ও অশোভনের মধ্যে ডুবে যায়। মার্টিনের দাবি, আরঅ্যান্ডবি ও রক’এন’রোলের প্রতি তার ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তাকে কান্ট্রি গানের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

একজন রক’এন’রোলার হিসেবে তার ক্যারিয়ার কেন হোঁচট খেয়েছিল, সেটির কিছু প্রমাণ তাকে নিয়ে করা আরসিএ’র প্রোমো শটে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। উদ্যমী ও গিটার-স্ট্রামিং মার্টিনের দেখা মেলে সেখানে; আর তাতেই বোঝা যায়, একজন ‘ফিমেল এলভিস’ অন্য যে কারও পক্ষে হওয়া সম্ভব হলেও তার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। নিজস্ব তাচ্ছিল্য থেকে শুরু করে দীর্ঘ, ফোলানো, কালো রঙা চুল পর্যন্ত– এলভিসের নিজস্ব যা কিছু ছিল, তাতে তাকে রাস্তার ভুল দিক থেকে আসার একজন বালক বলে মনে হতো; আর মার্টিনকে মনে হতো যেন সবমিলিয়ে পাশের বাড়ির মেয়েটি।

সত্যি হলো, তাকে ‘ফিমেল এলভিস’ করে তুলে বাজার ধরার যে প্রচেষ্টা, সেটি ব্যর্থ হয়েছিল। এলভিস যেভাবে অনায়াসে তারকাখ্যাতি অর্জন করেছিলেন, হোক কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা শ্বেতাঙ্গ– পঞ্চাশের দশকের বালিকাদের পক্ষে সে রকম যৌন উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে জায়গা করে নেওয়া কখনোই সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, এটি ছিল যুদ্ধোত্তর আমেরিকা– যেখানে মেয়েদের সেক্সি হিসেবে গণ্য করা হতো, সেক্সুয়াল হিসেবে নয়। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৫৮ সালে আরসিএ যখন জানতে পারল, মার্টিন ১৫ বছর বয়সেই গোপনে বিয়ে করেছেন এবং এখন তিনি অন্তঃসত্তা, তার সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে দিলো।

১৯৫০-এর দশকের রক’এন’রোল ছিল বস্তুত একটি বয়েজ ক্লাব। (আমেরিকান গায়ক) ক্যারোল কিংয়ের জীবনের ওপর আংশিক ভিত্তি করে বানানো গ্রেস অব মাই হার্ট [১৯৯৬] সিনেমায় দেখা যায়, আরেকটি প্রতিভা অন্বেষণের মাধ্যমে তরুণী গায়িকা-গীতিকারটির ক্যারিয়ারের অবনতি ঘটে– যে নিজেকে একটি ইন্ডাস্ট্রি সিক্রেটের মধ্যে ঠেলে দেয়: প্রতিটি লেবেল কোম্পানির ইতোমধ্যেই নিজেদের একজন করে গায়িকা রয়েছে, এটি তাকে বেকুব বানানোর পরিকল্পনারই অংশ। কিং কিংবা নিউইয়র্কের অন্য গীতিকাররা গার্ল গ্রুপগুলোর জন্য হিট গান সৃষ্টির আগ পর্যন্ত এভাবেই চলছিল।

যদিও গার্ল-গ্রুপ ফেনোমেনাটির শুরু হয়েছে দ্য চ্যান্টেলস-এর ‘মেবি’ [১৯৫৮] গানটির মাধ্যমে একটি অভিনবত্ব হিসেবে (১০ বছর পর ওই গান কভার করেছিলেন জেনিস), ষাটের দশকের শুরুর দিকে গার্ল গ্রুপগুলো রক’এন’রোলে নারীদের জন্য একটি অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে। তবে তাদের গানগুলো যদি ব্যাপকমাত্রায় জনপ্রিয় হয়েও থাকে, তবু গায়িকারা রয়ে গিয়েছিলেন অখ্যাত (ডায়ানা রোজের কথা অবশ্য ভিন্ন)– নিজ শ্রোতাদের কাছে নামহীন ও অবয়বহীন; কেননা মিউজিক্যাল অ্যাসেম্বলি লাইনে তাদের জন্য অসংখ্য কাটা ছড়িয়ে রেখেছিল রেকর্ড কোম্পানিগুলো।

জোয়ান বায়েজ, অডিটা, এবং পিটার, পল অ্যান্ড ম্যারি গ্রুপের ম্যারি ট্রেভার্সের মতো ফোকসিংগাররা নারীদের জন্য একটি শেকল খোলার অবস্থা তৈরি করেছিলেন। সিম্পলিসিটির কারণে ‘ফোক মিউজিক করা খুবই সহজ ছিল,’ ইয়ার্কি করে এমনটাই বলেন (কানাডিয়ান গায়িকা) জনি মিচেল, ‘এটি ছিল ছয় মাস মেয়াদী পেশা’, এবং সত্তরের দশকে পাংক মিউজিক যা করেছে, তেমনি সে সময়ে ফোক মিউজিক বস্তুত আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠে নারীদের প্রেরণা জুগিয়েছে– কোনো গিটার, ইউকুলেলে কিংবা অটোহার্প হাতে তুলে নিয়ে মঞ্চে গিয়ে দাঁড়াতে। নিশ্চয়ই ফোক মিউজিক কোনো ‘ঘাড় নত করার’ মিউজিক ছিল না– রক’এন’রোলকে যে অভিধায় একদা অভিহীত করেছেন (ব্রিটিশ মিউজিশিয়ান) কিথ রিচার্ডস।

বায়েজ ও অন্যান্য নারী ফোকসিংগার তাদের গানে বুদ্ধিমত্তা ও অকপটতা ফুটিয়ে তুলেছেন; তবে তাদের পারফরম্যান্সে যৌনতার উত্তাপের জায়গা ছিল সামান্যই। বিপরীত দিকে, ইটা জেমস ও টিনা টার্নারের মতো কৃষ্ণাঙ্গ আরঅ্যান্ডবি গায়িকারা সেক্সুয়াল এনার্জিতে ছিলেন ভরপুর, তবু বেশিরভাগ শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানের কাছেই তারা ছিলেন একেবারেই অখ্যাত।

১৯৬৭ সালে মন্টেরি পপ ফেস্টিভ্যালে জেনিস যখন রক ব্যান্ড বিগ ব্রাদার অ্যান্ড দ্য হোর্ল্ডি কোম্পানির সঙ্গে মঞ্চে ঝড় তুললেন, শ্বেতাঙ্গ রকের দুনিয়া এ রকম কিছু এর আগে কোনোদিন দেখেওনি, শোনেওনি। রক ব্যান্ড জেফারসন এয়ারপ্লেন-এর লিড সিংগার গ্রেস স্নিক সেই স্মৃতিচারণা করে বলেছেন, ‘জেনিস ছিলেন ভীষণ দাপুটে ও ভীষণ আলাদা; তার ভেতর থেকে সব ধরনের আবেগ ঝরে পড়ছিল।’ দর্শকদেরকে শ্বাসরুদ্ধকর বিস্ময়ের ঘোরে ফেলে রেখে নিজের পথে এগিয়ে গিয়েছিলেন জেনিস।


জেনিস
‘একদম কাঁপিয়ে
দিয়েছেন, আর প্রতি
মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল যেন
আরেকটু হলেই মাইক্রোফোনটি
ভেঙে ফেলবেন কিংবা গিলে ফেলবেন

তার সেই পারফরম্যান্সকে সম্ভবত (আমেরিকান গায়ক) রে চার্লসের পর কারও এমনতর পারফরম্যান্স– এমনটাই মনে করেন রক ক্রিটিক রবার্ট ক্রিস্টগাউ। তবে ‘নিট প্যান্টসুটের নিচে থাকা’ জেনিসের বাম স্তনবৃত্তও তাকে সমানভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছিল, ‘যেখান থেকে চোখ সরানো একেবারেই অসম্ভব’– এমন প্রলাপও বকেছেন ক্রিস্টগাউ! তিনি বলেন, জেনিস ‘একদম কাঁপিয়ে দিয়েছেন, আর প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল যেন আরেকটু হলেই মাইক্রোফোনটি ভেঙে ফেলবেন কিংবা গিলে ফেলবেন।’

এর এক বছর পর কলম্বিয়া (রেকর্ড কোম্পানি) থেকে বিগ ব্রাদার-এর অ্যালবাম চিপ থ্রিলস যখন প্রকাশ পায়, জেনিস ততদিনে রক মিউজিকে রাজত্বকারী সুপারস্টারদের একজনে পরিণত হয়ে গেছেন। তার বিস্ময়কর রকমের উত্থান আসলে যুদ্ধোত্তর যুগের সংস্কৃতির বাঁধা-ধরা ক্যাটাগরিগুলো থেকে আমেরিকার সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয় ঠিকই, তবে এটি একইসঙ্গে, সবচেয়ে বড় কথা তার অতুলনীয় প্রতিভা ও উচ্চাশার প্রমাণপত্রও জাহির করে। তিনি যেন স্রেফ প্রকৃতি তাড়িত ছিলেন।

পঞ্চাশের দশকের একটি জাতির ভেতর উঠে আসা জেনিসের অপ্রচলিত সেক্সুয়ালিটি বস্তুত দুর্নিবার হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল; বিশেষত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তার একটি ক্রুদ্ধ প্রতিলিপির অশেষ জোয়ার ছুড়ে দেওয়া সহকারে। পারফরম্যান্সকে অর্গাজমের সঙ্গে তুলনা করতেন জেনিস, যেন অভিশপ্ত নাবিকের মতো; আর পোশাক পরতেন কোনো সাইকেডেলিসাইজড হুকারের মতো। প্রিয় পাঠক, অবস্থান তৈরির কথা ভুলে যান; বরং জেনে রাখুন, জেনিস ছিলেন একটি আক্রমণশীল আর্মির মতো, তিনি রক’এন’রোলের আকাঙ্ক্ষিত ভূমি এমনভাবে দখল করছিলেন, যেভাবে এর আগে কখনোই কোনো শ্বেতাঙ্গ নারীকে করতে দেখা যায়নি।

জেনিস আসলে রক’এন’রোলের দুনিয়াকে সম্পূর্ণভাবে পুনর্নিমাণ করে দিয়েছিলেন– এমনটা ভাবতে পারলে নিশ্চয়ই দারুণ লাগত; কিন্তু তিনি তা করেননি– এটির একরোখা সেক্সিজম আগে থেকেই বজায় ছিল। বর্তমান সময়ে নারী মিউজিশিয়ানদের জনপ্রিয়তার দিকে নজর রেখে এ কথা ভুলে যাওয়া একেবারেই সহজ, যে, রক’এন’রোল আসলে শুধুমাত্র সদ্যই নারীদের জন্য একটি তুলনামূলক অনুকূল জায়গায় পরিণত হয়েছে।

জেনিস একলা হাতে রক মিউজিকের লৈঙ্গিক ব্যবধান গুচিয়ে দিয়ে যাননি– এ কথা ঠিক; তবে আজব ব্যাপার হলো, যাদের মিউজিক এখনো এফএম রেডিওগুলোতে প্রায় নিয়মিত বাজে, সেই জিমি হেন্ডরিক্স ও জিম মরিসনের মতো ছিলেন না জেনিস; বরং অকালমৃত্যুর পরপরই খুব দ্রুত তার গানগুলো বাজানোও বন্ধ হয়ে যায়। তবে কৌতুহলজাগানিয়াভাবে তিনি যখন অনুপস্থিত ছিলেন, তার স্টাইলকে তখন কোনো রকম ক্রেডিট না দিয়েই শুষে নেওয়া হয়, এবং একদিক থেকে তার ইনফ্লুয়েন্সকেও করে রাখা হয় অনুল্লেখিত।

বস্তুত (আমেরিকান) গায়িকা ডেবি হ্যারি বিষয়টি খেয়াল করেছেন, ‘লোকেরা (জেনিসকে) অনুসরণ করে, অথচ তারা তাকে যে (অনুসরণ করছে)– সেটা নিজেরাও জানে না।’ হ্যারি উল্লেখ করেন, ঘটনা হলো, যারা জেনিসকে ‘অনুসরণ করছে’– তারা মূলত হেভি-মেটাল হেয়ার ব্যান্ডের ছেলেগুলো, যা কি না এই ঋণের প্রতি স্মৃতিভ্রংশেরই সাক্ষ্য দেয়। মূলত হেভি-মেটাল ভোকালাইজিংয়ের জপলিনধর্মী বৈশিষ্ট্যের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ভার (ব্রিটিশ রক ব্যান্ড) লেড জেপলিন-এর (গায়ক ও গীতিকার) রবার্ট প্ল্যান্টের; অথচ আমার জানা মতে, নিজের একজন অনুপ্রেরণা হিসেবে জেনিসের নাম তিনি কোনোদিনই স্বীকার করেননি।

অন্যদিকে, নারী রকারদের কাছে জেনিসের স্টাইল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দূরের জিনিস হয়েই রয়ে গেছে; তার পারফরম্যান্সের ভেতর যে যন্ত্রণা ও ম্যাসোচিজম বা আত্মনিগ্রহ ছিটকে বের হতো, সেটির প্রতি তারা বোধহয় আতঙ্কিত কিংবা অস্বস্তি অনুভব করেন।

রক দুনিয়া নিজ অক্ষমতা সত্ত্বেও জেনিসের জোরাল ইনফ্লুয়েন্সের প্রভাব ঠিকই অনুভব করতে পেরেছিল, ঠিক যেমনটা পেরেছিল বৃহত্তর সংস্কৃতি। শ্বেতাঙ্গ নারীদের সৌন্দর্য সম্পর্কে চলতি ধারণাকে বাড়িয়ে তুলেছিলেন জেনিস, ঠিক যেমনটা ৪০ বছর আগে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের বেলায় বাড়িয়ে তুলেছিলেন বেসি স্মিথ। জিমি হেন্ডরিক্স যেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ভালো নাম হিসেবে ‘বাজে চুলের’ চলন ঘটিয়েছেন, তেমনি জেনিস এমন অনেক শেতাঙ্গ কিশোরীর কাছে ‘ফ্রিজি, ইলেকট্রিক’ চুলের ফ্যাশন ছড়িয়ে দিয়েছেন– যারা এর আগে চুল সোজা করার জন্য প্রতিদিন আয়রন নিয়ে বসে থাকতে বাধ্য হতো। গরম ওভেনে ওয়েট মপ ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো যে চেহারা জেনিস অর্জন করেছিলেন, সেটি সপ্তাহান্তে বিউটি সেলুনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে আমেরিকান নারীদের মুক্তি দিয়েছে।

জেনিস জপলিন, শৈশবে

ষাটের দশকের রক ক্রিটিক লিয়ান রোক্সন তার স্মৃতিচারণায় গার্ডলস ও ব্রা থেকে নারীর মুক্তি এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে জেনিসের প্রভাব স্মরণ করেছেন। ‘আমেরিকার যেকোনো জায়গায় কোনো কনসার্ট কিংবা ফেস্টিভ্যালে গেলে আপনি এমন (গার্ডলস ও ব্রা না পরা) মেয়েদের দেখা পাবেন, যেন এরা জেনিসের কন্যা, তাদের রুক্ষ ও দাগওয়ালা মুখ মেকআপ ও অন্যান্য সিনথেটিক প্রলেপ থেকে অবজ্ঞাপূর্ণভাবে মুক্ত; তাদের চুলের ইলেকট্রিসিটি যেন ইতিবাচকভাবে ট্রায়াঙ্গুলার; তাদের পোশাক লম্বা, ঢিলা ও যাযাবরদের মতো; তাদের পরনে নেই কোনো প্যান্টিগার্ডলস, এবং তাদের স্তনবৃত্তও ব্রা-মুক্ত।’

এলভিসের মতো জেনিসও যে সীমারেখার মধ্যে বড় হয়েছেন, সেগুলোকে করেছেন অস্বীকার। কৃষ্ণাঙ্গদের স্টাইলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই দুজন– জেনিস ও এলভিস– শেতাঙ্গদের যৌন সংবরণ ও কৃষাঙ্গদের বিমিশ্রতার ব্যাপারে চলতি ধারণা প্রকাশ করা রঙের রেখাকে উল্টে দিয়েছেন। এলভিস যেভাবে শেতাঙ্গ বালকদের কাছে একটি দলত্যাগী পুরুষত্ব হাজির করেছেন, ঠিক সেভাবেই জেনিস নিজের যৌন উত্তেজক স্টাইলের মাধ্যমে শেতাঙ্গ মেয়েদের সম্ভাবনার পরিধিকে বাড়িয়ে তুলেছেন।


জেনিস
ছিলেন ‘একজন
দেবদূতের মতো– যিনি
এসে শ্বেতাঙ্গ বালিকাদের জন্য
এমন একটি রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন,
যে রাস্তা ধরে এর
আগে হাঁটেনি
কেউ

যার আর্তনাদ ছড়ানো কণ্ঠস্বর জেনিসকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল, সেই ইটা জেমস বলেছেন, জেনিস ছিলেন ‘একজন দেবদূতের মতো– যিনি এসে শ্বেতাঙ্গ বালিকাদের জন্য এমন একটি রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিলেন, যে রাস্তা ধরে এর আগে হাঁটেনি কেউ।’

নিশ্চিতভাবেই শ্বেতাঙ্গ হিসেবে জেনিস ও এলভিস তাসের নিজ গাত্রবর্ণের সুবিধাও ভোগ করেছিলেন। এটি আমেরিকান শো বিজনেসের একেবারেই সবচেয়ে পুরনো কাহিনির ব্যাপার– যেটি বুঝতে হলে উনবিংশ শতকের ব্ল্যাকফেস মিন্সট্রলসির কাছে ফিরতে হবে; তবে জেনিস নিজের আফ্রিকান-আমেরিকান দায়কে এলভিসের তুলনায় একেবারেই ভিন্নভাবে সামলিয়েছেন। এলভিস যেখানে হরদম বলতেন, তার রেকর্ড বা অ্যালবাম কেনার এবং জুতো পালিশ করে দেওয়ার অধিকার কৃষ্ণাঙ্গদের রয়েছে; সেখানে জেনিস আসলে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের প্রচারণা চালাতেন, এবং এমনকি বেসি স্মিথের একটি সমাধিস্তম্ভ গড়ার জন্য নিজের টাকা খরচও করেছেন; ‘আমাকে বাতাস দেখিয়েছেন তিনি এবং সেটিতে নিজ প্রাণ ভরে নেওয়ার দিয়েছেন শিক্ষা,’ বেসি সম্পর্কে এমনটাই বলতেন জেনিস।

১৯৬০-এর দশকে বর্ণভিত্তিক সম্মাননা নিতে রাজি না হওয়া একমাত্র মিউজিশিয়ান নিশ্চয়ই ছিলেন না জেনিস। তিনি যেখানে ইটা জেমসকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, সেখানে মোটাউন [রেকর্ড লেবেল] আর্টিস্ট মারভিন গে’র স্বপ্ন ছিল ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা হয়ে ওঠোর। জিমি হেন্ডরিক্স, মাইকেল ব্লুমফিল্ম, স্টিভি ওয়ান্ডার, পল বাটারফিল্ড, দ্য রোলিং স্টোনস’ও স্লাই স্টোন– এরা ছিলেন সেইসব গুটিয়েক শিল্পী, যাদের মিউজিক খুবই সচেতনভাবে বর্ণবাদী ক্যাটাগরিকে অস্বীকার করে গেছে। ষাটের দশকের বিশ্বসংগীতে এরা কেউই স্বজাতীয় পরিচয়কে জোরাল করে তোলেননি। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের একটি ‘ভালোবাসার কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে নাগরিক অধিকার আন্দোলনকর্মীদের বেশ ভোগান্তির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে সে সময়। এমনকি ‘ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতারা– হিউ নিউটন ও ববি সিলও– নিজেদের দলের টেন-পয়েন্ট প্রোগ্রামগুলোতে (কৃষ্ণাঙ্গ) আরেথা ফ্রাঙ্কলিন কিংবা অটিস রেডিংয়ের গানের চেয়ে বরং (শ্বেতাঙ্গ) বব ডিলানের ‘ব্যালাড অব অ্যা থিন ম্যান’ বেছে নিতে বেশি পছন্দ করতেন।

এই অতুলনীয় মিউজিক্যাল ক্রসফার্টালাইজেশন অবশ্য বেশিদিন টিকেনি; সেই দশকের শেষ হতেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক– উভয় ক্ষেত্রেই বর্ণভিত্তিক সীমারেখাগুলো এমনসব পন্থায় কোনঠাসা হয়ে পড়ে, যা দীর্ঘায়ু পেলে জেনিসের মিউজিক্যাল অপশনগুলোকে সংকীর্ণ করে দিতে পারত!


জেনিস জপলিন

জেনিস জপলিনের অ্যালবাম

‘বিগ ব্রাদার অ্যান্ড দ্য হোল্ডিং কোম্পানি’ ব্যান্ড
বিগ ব্রাদার অ্যান্ড দ্য হোল্ডিং কোম্পানি
[১৯৬৭]
চিপ থ্রিলস [১৯৬৮]
লাইভ অ্যাট উইন্টারল্যান্ড ‘৬৮ [মরণোত্তর; ১৯৯৮]
লাইভ অ্যাট দ্য ক্যারোসেল বলরুম ১৯৬৮ [মরণোত্তর; ২০১২]

সলো অ্যালবাম
আই গট ডেম ওল’কজমিক ব্লুজ অ্যাগেইন মামা!
[১৯৬৯]
পার্ল [১৯৭১]

Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here