জন বনহ্যাম: রক দুনিয়ার বিধ্বংসী ড্রামার [১]

0
68
জন বনহ্যাম

লিখেছেন: ওয়েন ব্ল্যাঞ্চার্ড
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

জন বনহ্যাম । ৩১ মে ১৯৪৮–২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৮০; যুক্তরাজ্য

‘বজোঁ নেই। জেপলিন খতম!’ যুক্তরাজ্যের বার্কশায়ারের প্যাংবর্ন অঞ্চলে থাকা জিমি পেজের মিল হাউস থেকে মর্মভেদি খবরটি ছড়িয়ে পড়েছিল ৪ দশকেরও বেশিকাল আগে। দিনে দিনে ঘটনা ও ফ্যান্টাসির জ্বালানিতে জন বনহ্যামের স্মৃতি পরিণত হয়েছে কিংবদন্তিতে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বনহ্যামকে ঘিরে স্মৃতিগুলোর প্রতিটি অংশই ইতিবাচক। গোল্ডেন গ্রুভ, সেনসেশনাল চপ আর তুখোড় বিগ-সাউন্ড সৃষ্টিকারী মানুষ ছিলেন তিনি।

বার্মিংহ্যামবাসী বন্ধু ও অনুরাগীরা তাকে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধাচিত্তে বুক ফুলিয়ে স্মরণ করেন। তাদের কাছে তিনিই রক ড্রামিংয়ের নামান্তর ও উন্নতশির। মৃত্যুর এতকাল পরও তিনি রয়ে গেছেন ‘একমাত্র’জন হিসেবে। হ্যাঁ, দিনে দিনে তার চেয়েও বেশি ফাস্টার, লাউডার ও আরও বেশি টেকনিক্যাল ড্রামার নিশ্চয়ই এসেছেন; তবে দিনের শেষে সবাই বনহ্যামের প্রতিই নত করে মাথা।

গুড টাইমস, ব্যাড টাইমস । লেড জেপলিন । অফিসিয়াল অডিও

লেড জেপলিন-এর সেল্ফ-টাইটেলড অভিষেক অ্যালবামের গুড টাইমস, ব্যাড টাইমস গানটির স্ল্যাম-ডাউন ইন্ট্রো থেকে শুরু করে আজীবন রক অ্যান্ড রোল চত্বর মাতিয়ে গেছেন তিনি। ফাংকি ফিল, গ্রুভ-পুশিং কাউবেল, ট্রিপলেট কিক ওয়ার্কের পাশাপাশি ঋজু দেহভাষায় তার ড্রামিং ছিল বিস্ময়কর রকমের টাটকা ও বিধ্বংসী রকমের দাপুটে।

জিমি পেজের উদ্যোগে তার ড্রামস এখন দারুণ এক প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু হয়ে রয়েছে। তাই যখনই কমিউনিকেশন ব্রেকডাউন গানের ওয়াইড-ওপেন রাইডের গর্জন, কিংবা ডেজড অ্যান্ড কনফিউজড গানের থ্রু-দ্য-বার ফিল আপনাকে গভীরবোধে নিয়ে যাবে, তখন শ্রোতা হিসেবে নাটকীয়তার এক স্পর্শগ্রাহ্য বোধ আপনি অনুভব করবেন। এ আর ‘রক অ্যান্ড রোল’ নয়; স্রেফ রক। হার্ড রক। এমনকি হেভি মেটালও।

লেড জেপলিন-এর অভিষেক যদিও টার্নটেবল হয়ে রয়েছে, তবে হটেস্ট এই নতুন ব্যান্ড এ মহাবিশ্বে নিজেদের প্রকৃত জানান দিয়েছিল লেড জেপলিন টু অ্যালবামের মাধ্যমে। সেখানে হোল লোটা লাভ গানের স্টর্মিং গ্রুভ থেকে মবি ডিক গানের শো-স্টপিং ড্রাম সলো এবং রেম্বল অন গানের রকাস রিফ-ও-রামায় দিকপরিবর্তনের সাক্ষ্য মেলে।


রক
ড্রামিংকে
এর আগে কখনোই
এত দারুণ শোনায়নি

এ স্রেফ পুরনো কোনোকিছুকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর ব্যাপার ছিল না। বরং একেবারেই নতুন কিছুর সন্ধান দিয়েছিলেন বনহ্যাম। রক ড্রামিংকে এর আগে কখনোই এত দারুণ শোনায়নি। কেউ কেউ হয়তো এ ব্যাপারে দ্বিমত জানাবেন, তবু বলি, রক ড্রামিং পরবর্তীকালেও এরচেয়ে দারুণ শোনায়নি আরও কখনোই।

সাজানো-গোছানোর দিনগুলো

এ আলাপের শুরুতেই ১৯৬০-এর দশকের প্রথম ভাগে ফিরে গিয়ে দেখা যাক, সঠিক সময়ে সঠিক জায়গার সঠিক ড্রামার হয়ে ওঠার পথে বনহ্যামের এক দশকের মিউজিক্যাল ক্রান্তিকালটি কেমন ছিল। ১৯৫০-এর দশকে ব্রিটেনের ট্রেডিশনাল জ্যাজ অ্যান্ড ড্যান্স ব্যান্ডগুলো আমেরিকান রক অ্যান্ড রোল এবং রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ব্যান্ডগুলোকে পথ দেখিয়েছে– ‘বিটলম্যানিয়া’ ও ‘সুইংগিং সিক্সটিজ’-এর মঞ্চে দ্য শ্যাডোস ব্যান্ডের স্কিফল ও ইনস্ট্রুমেন্টাল হিটগুলোর মাধ্যমে।

দ্য শ্যাডোস ব্যান্ডের দুই ড্রামার– টনি মিহ্যান ও ব্রায়ান বেনেট– উভয়েই ছিলেন ব্রিটিশ ড্রাম হিরো। অন্যদিকে, চার্লি ওয়াটস, কিফ হার্টলি, জন হাইসম্যান, টনি নিউম্যান, মিকি ওয়েলার, জিঞ্জার বেকার, আইন্সলি ডানবার ও মিচ মিচেল– এরা ছিলেন এমন তরুণ ‘জ্যাজারস’– যারা ক্ষণে ক্ষণে ব্লুজ ও রকের দুনিয়ায় আসা-যাওয়া করতেন। জেন ক্রুপা, এলভিন জোনস, বাডি রিচ, জো মোরেলো, ডেভি টাফ– এই আমেরিকান জ্যাজ গ্রেটরা ছিলেন তাদের হিরো; ফলে ‘টিং-টিং-অ্যা-টিং’ সুইং রাইড প্যাটার্নের দাপট ছিল তখন। ড্রাম টিউনিং ছিল হাই, আর তাতে টোন ও টাচ ছিল অত্যাবশ্যক।

১৯৬৪ সালে সেশন কিং-খ্যাত ববি গ্রাহাম এবং দ্য বিটলস-এর রিঙ্গো স্টার ছিলেন রেডিওতে শোনানো গানগুলোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে রকিং দুই ড্রামার। ডেভ ক্লার্ক ফাইভ ব্যান্ডের তুমুল জনপ্রিয় গান গ্ল্যাড অল ওভারডু ইউ লাভ মি এবং দ্য কিংক ব্যান্ডের হিট গান ইউ রিয়েলি গট মিঅল অব দ্য ডে অ্যান্ড অল অব দ্য নাইট-এ গ্রাহামের স্ল্যামিং বিটগুলো একটি ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, এই হিট ট্র্যাকগুলো সুইং-স্টাইল রাইড প্লেয়িং থেকে স্ট্রেট এইটথসে পদাপর্ণের চিহ্নই শুধু ধরে রাখেনি, সে সময়ের বাধ্যতামূলক ‘বুম-টাটা-বুম-টা’ পপ বিটকেও সরিয়ে দিয়েছে এক পাশে।

কিন্তু বনহ্যাম?

‘জন আসলে ব্রিটিশ ড্রামারদের অনুরাগী ছিলেন কি না, আমি নিশ্চিত নই; তবে তিনি টনি মিহ্যান ও ব্রায়ান বেনেটের, এবং ক্লেম ক্যাটিনির সেশন ওয়ার্কের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবেই প্রভাবিত হয়েছিলেন,’ বলেন মূলত কিংবদন্তি ষাটের দশকের চার্ট টপারস দ্য মুভ-এর, এবং কিছুকাল ব্ল্যাক স্যাবাথ-এর ড্রামার বেভ বেভান। ‘জন আর আমি, বাকি আমেরিকানদের মতোই নিজেদের মধ্যে মিউজিক্যাল রুচি সাধারণত ভাগাভাগি করে নিতাম।’ কোনো জ্যাজ? ‘তিনি জ্যাজার ছিলেন কি না, মনে নেই; যদিও ডেভ ব্রুবেকের টেক ফাইভ-এর একটি সংস্করণে আমি একটি ৫/৪ ড্রাম ব্যবহার করেছিলাম; আর সেটা তার মনে ধরেছিল।’

ক্রিম ব্যান্ডে যোগ দিতে জিঞ্জার বেকার দ্য গ্রাহাম বন্ড অর্গানাইজেশন ছেড়ে দিলে সেখানে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন জন হাইসম্যান। মিচ মিচেল যখন জিমি হেনড্রিক্সের সঙ্গে যোগ দেন, তখন জর্জ ফেমের সঙ্গে মিচের জায়গায় জুটি বাঁধেন তিনি। এরপর নিজের গ্রাউন্ডব্রেকিং জ্যাজ-রক ইউনিট কলোজিয়াম-এর যাত্রা শুরু করানোর আগে জন মায়ালের ব্লুজব্রেকারস-এ জ্যাজের জাদু ছড়ান হাইসম্যান। বলে রাখা ভালো, তার ইউনিটের অনেক জ্যাজারই লেড জপলিন কিংবা বনহ্যামের প্রতি অতটা উদার ছিলেন না।


মনে হলো, কোনো
অনাবিষ্কৃত
তল্লাটে ঢুকে পড়েছি

‘ডাইহার্ডরা এটি স্রেফ ধরতে পারেনি, এবং একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় তো নয়ই। তবে ব্লুজ-রকপ্রেমী হিসেবে আমি জানতাম, লেড জেপলিন ও জনের সব তুখোড় অনুরাগীই এ ব্যাপারে উদার ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময়ই জ্যাজ বিটের ক্ষেত্রে খানিকটা ঝামেলা অনুভব করতাম; এটি ছিল এক ধরনের গতানুগতিকতায় বাঁধা, আর কোনো প্রতিষ্ঠিত মাস্টারের কাজ নিজের মতো পুনর্সৃষ্টি করতে গেলে সবসময়ই জ্যাজ মিউজিশিয়ানদের সমালোচনার মুখে পড়তে হতো। যখনই আমি এইটথ-নোট ফিল অন্বেষণ শুরু করলাম, তখনই নিজেকে মুক্ত মনে হলো আমার। মনে হলো, কোনো অনাবিষ্কৃত তল্লাটে ঢুকে পড়েছি,’ বলেন হাইসম্যান।

বার্মিংহামের সূচনাপর্ব

নিজের বন্ধুর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়েন ব্ল্যাক স্যাবাথ-এর বিল ওয়ার্ড। ‘জনের সঙ্গে পরিচয়ের একেবারেই শুরুর দিকের স্মৃতি বলতে মনে পড়ে ১৯৬৪ সালের দিকের কথা। আমাদের দেখা হয়েছিল ওরচেস্টারশায়ারের ওমবার্সলির দ্য ওয়ার্ফ পাবে। তিনি তখন দ্য ক্রাউলিং কিং স্নেকস গ্রুপের হয়ে সে যুগের জনপ্রিয় গানগুলোর পাশাপাশি ব্লুজ ও আর-অ্যান্ড-বি বাজাচ্ছিলেন। তার রিদম ছিল নিখুঁত; প্রতিটি গানকেই নিজের মতো সাজিয়ে দুর্দান্ত বাজনা উপহার দিচ্ছিলেন। মর্নিং ডিও এর একটি অসামান্য উদাহরণ। নিশ্চয়ই এই গানের অরিজিনাল ভার্সনসহ সবগুলো ভার্সনই আমি শুনেছি, তবে জন বনহ্যামের নেতৃত্বে দ্য ক্রাউলিং কিং স্নেকস-এর ভার্সনটির কোনো তুলনা চলে না।’

স্মৃতিচারণায় ওয়ার্ড আরও বলেন, ‘বিবিসি লাইট জ্যাজ অর্কেস্ট্রার ড্রামার মাইক ইভানসের মালিকানাধীন, বার্মিংহ্যাম শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দোকান– ড্রাম সিটিতে গেলে মাঝে মধ্যেই আচমকা দেখা পেতাম বনহ্যামের; সঙ্গে আরও কয়েকজন তুখোড় ড্রামার– যারা বার্মিংহ্যামকে নিজেদের বাড়ি গণ্য করতেন।’


তার
বেস ড্রামের
ভাষা যেন সবার
সঙ্গেই জমাতে পারত আলাপ

‘মাঝে মধ্যে এইসব ভিজিট পরিণত হতো মিনি-ক্লিনিকে। মাইককে তাকে ‘পার্ডি’ হয়ে উঠতে দেখেছি আমি। আমার ধারণা, সবার কাছেই নিজেকে সেই বার্নার্ড পার্ডি করে তুলতে পেরেছিলেন তিনি– যার হাই-হ্যাট ওয়ার্ক ছিল অতুলনীয়। বনহ্যাম বসে বসে প্রাণখুলে বাজাতেন। তার বেস ড্রামের ভাষা যেন সবার সঙ্গেই জমাতে পারত আলাপ, তবু তার মতো করে কারও মধ্যে তেমন আবেদন জাগাতে পারেনি।’

‘বহু ধরনের ড্রামিং স্টাইলই তখন ছিল; তবে সেগুলো কোনো না কোনোভাবে শেষ পর্যন্ত মাইকের ড্রাম শপে গিয়ে থামত। আমরা তখন জানাশোনায় ছিলাম ঋদ্ধ, মিউজিকের প্রশ্নে ছিলাম সুস্বাস্থ্যবান।’ তবে ওয়ার্ড স্বীকার করে নেন, ‘১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে আমি বুঝে ওঠতেই পারিনি, জন আসলে কী করছেন।’

‘তাকে বহু অনুষ্ঠানেই হরদম বাজাতে দেখে ভাবতাম, নিশ্চয়ই তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছেন, গানটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন। অস্বাভাবিকভাবে অবশ্য, বেশ কিছু পানশালায় বাজানোর পর তিনি যার সঙ্গেই বাজান না কেন, তার সঙ্গেই নিজের বিটগুলোকে একটা সমান্তরালে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলেন। অবশেষে আমি বুঝতে পারলাম, তিনি পেরেছেন। নিজের কাছে তিনি সবসময়ই ছিলেন নম্বর ওয়ান, এমনকি যদি কারও কাছে তা মনে না হয়, তবু।’

ট্রেপেজডিপ পার্পল-এর বেজিস্ট ও ভোকালিস্ট গ্লেন হিউস তার নতুন প্রজেক্ট ব্ল্যাক কান্ট্রি কমিউনিয়ন-এ ড্রামার হিসেবে নিয়েছেন জনের ছেলে জ্যাসন বনহ্যামকে। জনের স্মৃতিচারণায় তিনি বলেন, ‘জনকে আমি প্রথম বাজাতে দেখেছি ১৯৬৮ সালে। আমার বেবি ব্যান্ড ফাইন্ডারস কিপারস-এর সঙ্গে মঞ্চে লাফিয়ে উঠেছিলেন তিনি, বার্মিহামের রাম রানারে। ড্রাম কিট নিয়ে দেখিয়েছিলেন দারুণ ভেল্কি। ততদিনে আমি রেডিচ শহরের বিগ ব্লক ব্যান্ড নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। এর বছর কয়েক পর তিনি ট্রেপেজ-এ আমার সঙ্গে যোগ দেন; আমরা তখন প্রচুর শো করেছি। দুর্দান্ত এক ড্রামার ছিলেন তিনি!’

ওয়ার্ড জানান, একই সঙ্গে উচ্চনাদী ও অনেকটাই হাতুড়ি পেটানোর মতো করে ড্রামসে পেটাতে থাকা বনহ্যামের প্রতিভা ছিল প্রাকৃতিক ও তিনি ছিলেন একদম স্বশিক্ষিত। ‘অনেকটাই পাশবিক ও কেওয়াজপূর্ণ অবয়বের আড়ালে তিনি ছিলেন আসলে একজন আদুরে ও শিক্ষাপ্রিয় মানুষ, এবং আধা-জল-খেয়ে-লাগা ড্রামারস ম্যান। ড্রামিং ঘিরে তার জ্ঞানের সীমা-পরিসীমা ছিল না। এই বনহ্যামকেই আমি চিনতাম।’

জন বনহ্যাম
জন বনহ্যাম; ১৯৬৯

বন্ধুদের চোখে আরও…

১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে জেফ বেক ও জিমি পেজের দ্য ইয়ারবার্ডস ব্যান্ডের সাইকেডেলিয়া সিঙ্গেল হ্যাপেনিংস টেন ইয়ারস টাইম অ্যাগো প্রকাশ, দ্য বিটলস-এর বহুল আলোচিত রিভলভার অ্যালবাম মুক্তি, এবং ক্রিম ও হেনড্রিক্সের সাফল্য বস্তুত ব্রিটিশ পপ ও রকের শক্তিমত্তার প্রকৃত সম্ভাবনার একেকটি উদাহরণ হয়ে ওঠে। তবে এ বেলা ব্রিট ব্লুজ ব্যান্ড চিকেন শ্যাক, জন মায়ালের ব্লুজব্রেকারস ও পিটার গ্রিনের ফ্লিটউড ম্যাকও রাখে দারুণ ভূমিকা।

‘হাফ-টাইম ব্লুজ বাজানোর ক্ষেত্রে বনহ্যাম ছিলেন অন্যতম প্রেরণা,’ বলেন ওয়ার্ড। ‘তার গ্রুভস ছিল বরাবরই দারুণ; ট্রিপলেট ও পলিরিদমসের মাধ্যমে চার স্নারের মধ্যকার শূন্যতাকে তিনি ভরিয়ে তুলতেন; আর প্রতিটি বিট এমন দুর্দান্তভাবে বাজাতেন, শুনে দর্শক-শ্রোতা হয়ে ওঠত হতবিহ্বল,’ ষাটের দশকের মিউশিয়ানশিপের উল্লেখ টেনে বলেন হাইসম্যান।

‘সে সময়ে মিউজিশিয়ানরা ছিলেন নিজ নিজ অধিকারের মর্যাদাপূর্ণ। তাদের লাইফস্টাইল নয়, বরং মিউজিকে তাদের বাজানোর দক্ষতাকেই গুরুত্ব দিত মিডিয়া। উদাহরণ হিসেবে মিউজিক পেপার মেলোডি মেকার-এর ১৯৭০ সালে প্রকাশিত একটি সংখ্যার কথা বলতে পারি; সেখানে ফ্রন্ট পেজের তিনটি খবর ছিল: জিমি হেনড্রিক্স মারা গেছেন; ক্রিস ফারলোকে ভোকালিস্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে (আমার ব্যান্ড) কলোজিয়াম; ব্রিটেনে পৌঁছাল হ্যারি জেমস ও তার বিগ ব্যান্ড।’

সবকিছুই নিখুঁত ছিল, তা বলছি না; তবে আগে যা কিছু ঘটেছে, সব উলট-পালট করে দিয়েছিল দ্য বিটলস, মিউজিক দুনিয়ায় হাজির করেছিল সিরিয়াস বিষয়আশয়। এদিকে, লন্ডনের আশেপাশের স্টুডিওগুলোতে জিমি পেন ও জন পল জোনস সে সময়ে দ্য কিংকসদ্য হু থেকে শুরু করে ডনোভ্যান ও ডাস্টি স্প্রিংফিল্ড পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যান্ডের সদস্যদের নিয়ে ফার্স্ট-কল সেশনের রেকর্ডিং করেছিলেন। এরপর দ্য ইয়ার্ডবার্ডস-এ যোগ দেন পেজ। জেফ বেকের গিটার মঞ্চজুড়ে হেভিয়ার অ্যাপ্রোচে ডেজস অ্যান্ড কনফিউজড-এর মতো গানগুলো বারুদ ছড়াতে থাকে।

ব্যান্ডে একজন নতুন গায়ক ও ড্রামারের দরকার অনুভব করলে পেজ হাজির হন বার্মিংহামে– যেখানে একদার উজ্জ্বল আলো ছড়ানো শিল্পাঞ্চলীয় অতীতের বর্তমান বিমর্ষ আকাশের নিচে শত শত ধোঁয়াচ্ছন্ন পাব ও ক্লাব গড়ে উঠেছে তখন। গায়ক হিসেবে হিপি-ব্লুজ-ওয়েইলিং রবার্ট প্ল্যান্টকে বেছে নেন তিনি। আর ড্রামার হিসেবে দাপুটে বনহ্যামের নামটি প্রস্তাব করেন প্ল্যান্টই। পেজ তাকে ভালোভাবেই চিনতেন।

ঘটতে যাচ্ছে কিছু একটা

মেলোডি মেকার-এর ১২ অক্টোবর ১৯৬৮ সংখ্যার এক শিরোনামে বলা হয়, ‘দ্য নিউ ইয়ার্ডবার্ডকে ঢেলে সাজাতে টিকে রয়েছেন শুধু জিমিই।’ নিজের নতুন ব্যান্ডটি প্রসঙ্গে তরুণ গিটারিস্টের মন্তব্য ছিল, “এটি মূলত ব্লুজ; তবে ফ্লিটউড ম্যাক-স্টাইলের নয় সে সময়ে গিটারিস্ট পিটার গ্রিনকে নিয়ে গড়া ওই ব্যান্ড ছিল কঠোর রকমের একটি ব্লুজ ব্যান্ড]। ‘প্রগ্রেসিভ ব্লুজ’ টার্মটি আমার পছন্দ নয়; তবে দ্য ইয়ার্ডবার্ডস শেষ পর্যন্ত কম-বেশি সে ধরনেরই। নিজের পছন্দমতো মিউজিক করতে পারবেন, লোকে সেটা শুনবেও– ব্যাপারটা কিন্তু দারুণ।”

সে বছরের শুরুর দিকে অসামান্য ড্রামার মিকি ওয়েলারকে সঙ্গে নিয়ে দ্য জেফ বেক গ্রুপ ব্যান্ডটি তাদের অভিষেক অ্যালবাম ট্রুথ-এ হেভি ব্লুজ-রকের বারুদ ছড়িয়েছিল, সেখানে আরও ছিলেন জিমি পেজ, জন পল জোনস, এবং অতিথি পারফরর্মার হিসেবে দ্য হুর কিথ মুন। এর পরবর্তী, হেভি ফলোআপ অ্যালবাম বেক-ওলায় টনি নিউম্যান হাজির করেছিলেন আতঙ্কজাগানিয়া ফাংকিস, সঙ্গে এলভিস প্রিসলির জেল হাউস রক অল শ্যুক আপ-এর দাপুটে উপস্থাপনায়।


লন্ডনজুড়ে
তখন ছড়িয়ে
পড়ল একটি প্রকৃত
আওয়াজ। সেটি আপনার
শিরদাঁড়ায় কাঁপুনি
ধরিয়ে দিতে
সক্ষম

চির বিচক্ষণ পেজেরই কনসেপ্ট ছিল সেটি। নিউম্যান বলেন, ‘নিউ ইয়ার্ডবার্ডস যখন প্রথম দিকে ইউরোপে ফিরে এলো, লন্ডনজুড়ে তখন ছড়িয়ে পড়ল একটি প্রকৃত আওয়াজ। সেটি আপনার শিরদাঁড়ায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিতে সক্ষম; কেননা, আমরা জানতাম, একেবারেই নতুন কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।’

দ্য জেফ বেক গ্রুপলেড জেপলিন-এর ম্যানেজার পিটার গ্র্যান্ট তখন লেড জেপলিন সদস্যদের প্রায় নিয়মিতই দ্য জেফ বেক গ্রুপ-এর পারফরম্যান্স দেখাতে নিয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, ‘দেখে যাও, ওরা কী করছে; এই ব্যান্ডের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়… হা-হা-হা…। অথচ আমাদের গ্রুপের তিন বাদক ও একজন গায়ক করছেন হেভি ব্লুজ রক– যে কনসেপ্টের বিস্তার ঘটবেই, সে কথা জানা ছিল পিটারের।’

লেড জেপলিন-এর শুরুর দিকের একটি পারফরম্যান্সে বাডি মাইলস, বাডি গাই, জ্যাক ব্রুস, এবং জন হাইসম্যানের কলোজিয়াম অংশ নিয়েছিল। ‘কলোজিয়াম-এর চেয়েও বেশি সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা রাখা অন্যতম ব্যান্ড ছিল লেড জেপলিন; কেননা, এটির ছিল শোম্যানশিপ এবং তুলনামূলক সরল গান। কলোজিয়াম-এর আবির্ভাব ঘটেছিল একটি ভিন্ন গ্রহ থেকে; তবে তার মানে, জন ও ব্যান্ডটিকে সাধুবাদ জানাতে সক্ষম ছিলাম আমি। আসলে আমি ছিলাম তাদের অনুরাগী। তাদের রেকর্ডগুলো কিনতাম। তবে আমি নিজে করতে চাই, এমন কিছু এদের মধ্যে কখনো দেখতে পাইনি।’

বনহ্যামের প্রভাব

একসঙ্গে ট্যুর করার স্মৃতি মনে করে ভ্যানিলা ফিউজ-এর কারমিন অ্যাপিস বলেন, ‘জন ছিলেন নতুন ও টাটকা; ছিলেন আগ্রাসন ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তার সিক্সটিনথ-নোট রাইট-ফুট ট্রিপলেট শুনে আমি যেন উড়ে যেতাম! বলতেন, তিনি নাকি এটা প্রথম ভ্যানিলা ফিউজ অ্যালবাম থেকেই পেয়েছেন। সে কথা শুনে আমি খানিকটা দ্বন্দ্বে পড়ে গিয়েছিলাম। কেননা, এমন কিছু নিজে করেছি বলে আমার মনে পড়েনি। অথচ একবার ঠিকই করেছিলাম; সেটি তিনি নিজেই আমাকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। আর তা আত্মস্থ করে তিনি নিজ ট্রেডমার্ক ট্রিপলেট বাজনা সৃষ্টি করেছিলেন। দারুণসব হাত, পা ও অনুভূতি ছিল তার। বলতেন, আমিই নাকি তার আইডল। তবে তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালের দিকের সমকালীন ড্রামারদের বাজনাও শুনতেন।’

তার অন্যতম সমকালীন ড্রামার ছিলেন অ্যাডাম ফেইথ অ্যান্ড দ্য রুলেটস, সত্তরের দশকের প্রগ-রকার আর্জেন্ট, আশির দশকের দ্য কিংকস-এর পুনরুত্থানসঙ্গী এবং ২০১০ সালে আবারও আর্জেন্ট-এর হয়ে মঞ্চে ফেরা রব হেনরিট। ‘অ্যাডাম ফেইথের সঙ্গে টিভিতে প্রচুর শো করেছি আমি। ছিলাম নিজেকে দেখিয়ে বেড়ানো এক ফ্ল্যামবোয়ান্ট প্লেয়ার। শুনেছি, বনহ্যামের তা পছন্দ হয়েছিল; বলে গেছেন, তিনি নাকি আমার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন।’

ডাইয়ার মেকার । লেড জেপলিন । অডিও

বিলি জুয়েলের অনেক হিট গানে যার ড্রামিং জুগিয়েছে রসদ, সেই লিবার্টি ডিভিটো বলেন, ‘জন বনহ্যাম ছিলেন একটি হেভি মেটাল ব্যান্ডে কাজ করা একজন আর-অ্যান্ড-বি ড্রামার। ডাইয়ার মেকার গানে কারমিনের সঙ্গে তিনি বাজিয়েছেন হেভি সাউন্ড, হোয়াট ইজ অ্যান্ড হোয়াট শ্যুড নেভার বি গানে রজার হকিংসের আর-অ্যান্ড-বি ফিল ও অনুভূতি দিয়েছেন ছড়িয়ে; আবার ফুল ইন দ্য রেইন-এ নিজের বিকাশ করানো জ্যাজ অনুভূতি কিংবা আরও বেশি সুইং জুড়ে দিয়েছেন পার্ডি-স্টাইলের সাফলের মাধ্যমে।’

ফুল ইন দ্য রেইন । লেড জেপলিন । অডিও

অ্যাপিস বলেন, ‘মোটাউন, অ্যাটলান্টিক ও স্ট্যাক্সের গ্রেট আর্টিস্টদের পছন্দ করতেন জন। আরও পছন্দ করতেন লিটল রিচার্ড, বো ডিডলির মতো রক-অ্যান্ড-রোলারদের।’ বনহ্যাম ও বেভান– দুজনেরই পছন্দ ছিল আমেরিকান রক-অ্যান্ড-রোল। ‘মনে পড়ে, আমি আর জন একমত হয়েছিলাম: আর্ল পলমাল ও হ্যাল ব্লেইনই রক-অ্যান্ড-রোলের সেরা দুই ড্রামার,’ বলেন বেভান। ‘এডি কোচরানের সামথিং এলস গানে পলমারের ড্রামিং নিঃসন্দেহে বজোঁকে লেড জেপলিন-এর রক-অ্যান্ড-রোলের ইন্ট্রু বাজাতে প্রভাবিত করেছিল।’

জন বনহ্যাম
লেড জেপলিন

তিনি আরও বলেন, ‘ফিল স্পেকটার তার প্রোডাকশনগুলোতে যে হিউজ ড্রাম সাউন্ড অর্জন করেছিলেন, সেটির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমরা।’ তাহলে লেড জেপলিন-এর বিগ ড্রাম সাউন্ড আইডিয়াটি আসলে কোত্থেকে এসেছিল? ‘আমার ধারণা,’ বলেন হাইসম্যান, ‘চারপাশের যেকোনো শব্দকে খেয়াল করার সহজাত শ্রবণশক্তি ছিল বনহ্যামের। আমি ড্রাম বাজানো শিখেছি– তখনো বেশিদিন আগের কথা নয়, তবে একটি ব্যান্ডে বাজাতাম। আমার ধারণা, জন এমনটাই করেছিলেন।’

তবে স্ট্রেট এইটথ-নোটের শক্তিও ছিল বনহ্যামের। সেদিকে ইঙ্গিত করে রেড হট চিলি পিপারস-এর ড্রামার চ্যাড স্মিথ বলেন, ‘স্ট্রেট-এইটথ নোটের যে ডটেড রাইড প্যাটার্ন, সেটি নিঃসন্দেহে প্রয়াত অসামান্য ড্রামার আর্ল পলমারের সৃষ্টি। তিনিই এটা প্রথম বাজিয়েছেন।’ তবে সেই আমেরিকান সেশন কিংয়ের কাছ থেকে পাওয়া রক অ্যান্ড রোলের ইন্ট্রুকে আরও বড় মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিলেন বনহ্যাম।


দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি, আসছে... 
Print Friendly, PDF & Email