‘পল, বন্ধু আমার’ অথবা প্রয়াত বেজিস্ট স্মরণে ভোকালিস্টের আর্তনাদ

0
46
স্লিপনট

লিখেছেন: কোরি টেইলর
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ

অনুবাদকের নোট
পল গ্রে [৮ এপ্রিল ১৯৭২–২৪ মে ২০১০]। আমেরিকান হেভি মেটাল ব্যান্ড ‘স্লিপনট’-এর প্রতিষ্ঠাতা বেজিস্ট। ৩৮ বছর বয়সে অকালপ্রয়াত। তার প্রতি এক শোকগাথা ব্যান্ডটির লিড ভোকালিস্ট ও লিরিসিস্ট কোরি টেইলরের [৮ ডিসেম্বর ১৯৭৩–]


পল গ্রে

বিনোদনমূলক পার্কের রাইড অপছন্দ ছিল পল গ্রে’র। এ এক ঘটনাই বটে! রোলার কোস্টার কিংবা ফেরিস হুইল কিংবা এ রকম যা কিছু আপনাকে অনিয়ন্ত্রিত বমির দিকে ঠেলে দিতে পারে, সেগুলোর অনুরাগী ছিল না সে। ডিজনি কিংবা নট’স বেরি ফার্ম বা সিক্স ফ্ল্যাগস– এমনতর থিম পার্কের কোনোটিতে যাওয়ার সুযোগ যখন আসত স্লিপনট-এর সামনে, সে চোখ ঘুরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানিয়ে দিত অরুচি। এ কারণে, এবং যেহেতু রাইডের একজন বিরাট ভক্ত হিসেবে আমার নামডাক আছে, তাই সব সময় একটি ব্যাপার আমি নিশ্চিত করতাম; তা হলো, ওকে নিজের পাশে বসানো।

১৯৯৯ সালে আমরা যখন সেলফ-টাইটেলড অভিষেক অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি, প্রডিউসার রস রবিনসন বললেন, আমাদের সবাইকে তিনি ডিজনিল্যান্ডে নিয়ে যাবেন। আমিও ইন্ধন দিলাম। কেননা, সেখানে আগে কখনো যাইনি; তা ছাড়া, স্টুডিও থেকে একটা ব্রেক নেওয়ার জন্য একেবারেই ছিলাম প্রস্তুত। তাই নিজের জুতো পরে, ভ্যানে থাকা ব্যান্ডের বাকি সদস্যদের জন্য ইতোমধ্যে অপেক্ষা করছিলাম। পল ততটা আগ্রহী ছিল না। তবে সে জানত, ব্যান্ডের জন্য এ হতে যাচ্ছে এক দারুণ সময়। ফলে কোট পরে ও ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সে পা বাড়াল ‘জগতের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা’টির দিকে।

ফেব্রুয়ারিতে ডিজনিল্যান্ড রীতিমতো ভুতুরে শহরে রূপ নেয়। সেদিন সেখানে ছিল সম্ভবত ১০০ জনের মতো; ফলে ইচ্ছেমতো প্রতিটি রাইডে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। আর, আমি নিশ্চিতভাবেই পল’কে রেখেছিলাম নিজের একদম পাশে… পল যেহেতু খুব বেশি ছুটতে পারত না, তাই কাজটি সহজ ছিল। পল’কে সব সময়ই আপনারা দেখেছেন মঞ্চে ছুটে আসতে; কেননা সব সময়ই সে সবার পরে আসত। ওভাবে পড়িমরি ছুটে আসার দরকার অবশ্য তার ছিল না; কেননা, সে তার ‘নিজের সময়মতো’ই আসত।

অল হোপ ইজ গন। স্লিপনট। অফিসিয়াল অডিও

পল’কে নিজের পাশে নিয়ে, আমরা স্পেস মাউন্টেনে লাফিয়ে উঠেছিলাম। ওখান থেকেই ফূর্তির শুরু। আমরা দুজন কারে বসে, মেটাল সেফনি বার’টি টেনে নামিয়ে দিয়ে, কারের ভেতরে নিজেকের আটকে নিয়েছিলাম। আর মুহূর্তেই চেহারায় উৎকণ্ঠার ছাপ ফুটিয়ে তুলে একটি রসিকতা শুরু করে দিয়েছিলাম আমি। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভেঙে পড়বে বলে মনে হয় না?’

চোখে-মুখে পুরো আতঙ্ক ছড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল সে: ‘তু-তু-তুমি কী বলতে চাও?’

আমি বার’টি নিয়ে এমন দুষ্টুমি করতে শুরু করেছিলাম, যেন সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ‘এটা… এটা ঠিকমতো আটকিয়েছে বলে মনে হয় না! দেখো! দেখো এটাকে আমি কীভাবে নাড়াতে পারছি?’

পল ঘামতে শুরু করেছিল। রাইডের অ্যাটেনডেন্টকে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছিল: ‘ওই লোকটা কই গেল? ওই ফালতু লোকটা কোথায়? আমরা তো পড়ে যাব মনে হয়!’

দুর্ভাগ্যক্রমে, নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সেই লোক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ‘গো’ বাটন চাপার জন্য। পলের মাথা বিগড়ে যাচ্ছিল। লোকটির মনোযোগ আকর্ষণের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো শুরু করেছিল সে। এই ফাঁকে, হো-হো করে হেসে ওঠার উদ্রেক হলেও তা আমি চাপা দিয়ে প্রস্তুতি নিলাম, একজন মানুষের পক্ষে যত জোরে চিৎকার করা সম্ভব, সেই শব্দ শোনার জন্য।


পলের
কণ্ঠস্বর
ততক্ষণে ওর
আতঙ্কের আর্তচিৎকারের
কারণে অনেকটাই
ফেঁসফেঁসে হয়ে
গেছে

রাইড চলতে শুরু করল আর আমরা ডুবে গেলাম অন্ধকারে। ‘হরর মুভি ফিমেল ভিকটিম’ রেঞ্জে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পলের চিৎকার যথাসম্ভব মৃদুই ছিল। এরপর তা আমার কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার জোগার; আর তাতে বোর্ডে থাকা সবাই ভড়কে গেল। ভাগ্য ভালো, পুরো রাইডে আমাকে সম্ভবত বিশ্রিভাবে হাসতে শুনেছিল সে। একেকটি কোণায় রাইড যাওয়ামাত্রই সে আরও জোরে চিৎকার করতে থাকল। অবশেষে আমরা যখন সমাপ্তিতে পৌঁছলাম, পলের কণ্ঠস্বর ততক্ষণে ওর আতঙ্কের আর্তচিৎকারের কারণে অনেকটাই ফেঁসফেঁসে হয়ে গেছে।

আমি হাসতে হাসতে ওকে সাহায্য করলাম কার থেকে বের হতে; তারপর আমরা খানিকটা টলতে টলতে শীতল বাতাসের স্পর্শে গেলাম।

আমরা দৌড়ে গেলাম ম্যাটারহর্নের দিকে; আর, সবকিছু আবার নতুন করে শুরু হলো! আমরা কারে বসলাম। আমি বার টানলাম। ‘এটা কি ভেঙে গেছে?’ ‘ওই ফালতু লোকটাকে কেউ খুঁজে আনো!’ চিৎকার! অট্টহাসি! মাথা ঘোরানো! তারপর আবার পরবর্তী রাইড।

দ্য ভাইরাস অব লাইফ। স্লিপনট। অফিসিয়াল অডিও

সেটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি। আর, যদিও পল এক সেকেন্ডের জন্য আমাকে ‘ঘৃণা’ করেও থাকে, তবু ওই দিন নিয়ে এবং কী ধরনের মজা আমরা করেছিÑ তা নিয়ে আমি আর সে সব সময়ই কথা বলতাম।

পল’কে মনে পড়ে খুব।

নিজের ওপর এমন ছাপ ফেলে– এমনতর কারও সম্পর্কে আপনার পক্ষে কী বলা সম্ভব? আপনার কাছে ওই মানুষের তাৎপর্য কী– সেই গল্প কীভাবে শুরু করতে পারবেন? ভাবামাত্রই আপনাকে অজস্র স্মৃতি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলবে, যেমন করে নর্দমার দিকে ছুটে চলে পানি। যে বন্ধুকে আপনি এত বেশি মিস করেন, তাকে ঘিরে কথা অন্যদের শোনানো সব সময়ই বেশ কঠিন। এটি আপনাকে বিবিধ স্বার্থপর পথে টেনে নেবে; আর সেখানে দেখা মিলবে স্বয়ং সেই মানুষটির এক প্রতিচ্ছবি।

পল গ্রে’কে নিয়ে এত বেশি ঘটনা রয়েছে, কোত্থেকে শুরু করা যায়, তা কখনোই জানা থাকবে না আপনার। আমার চেয়েও স্মার্ট একজন মানুষ একদা বলেছিলেন, ‘আমরা কীভাবে মারা যাই– তা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলে; কীভাবে বাঁচি– আমি বরং সেই গল্প শোনাতে চাই।’ আমি আমার বন্ধু পলের বেলায় সেটাই করব।

স্লিপনট
পল গ্রেকোরি টেইলর

পল সম্ভবত আমাদের সবার মধ্যে সবচেয়ে অস্থির ও সবচেয়ে দুষ্ট ছিল। প্র্যাকটিক্যাল জোকস পছন্দ করত সে, বিশেষত সেই কৌতুকের মধ্যে যদি ওর নিজের উপস্থিতি থাকত; আর তা ছিল দারুণ। কেননা, এমন এক অট্টহাসিতে সে ফেটে পড়ত, যার শব্দে চারটি কিংবা আরও বেশি রুম ভরে যাওয়া সম্ভব। এ ছিল এক সংক্রামক হাসি, যা অনিবার্যভাবে আপনাকেও ওর সঙ্গে হাসিয়ে তুলত; আপনি আপনি একবার হাসতে শুরু করলেই ওকে থামানো হয়ে পড়ত মুশকিল!

মারাত্মক রসবোধ ছিল ওর। এমনকি আপনি যখন ওকে একবার থামানোর চেষ্টা করতেন, সে তখন এমন রসিকতা করতে শুরু করত, আপনার পুরোদস্তুর বেকুব বনে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকত না। পল কখনোই বিব্রত হতো না। অথচ আমাদের অনেকেই জীবনকে এত গুরুতরভাবে দেখি, একে হাসির সঙ্গে উপভোগের করার কথা ভুলে যাই। অন্যদিকে, কী চলছে– তা পাত্তা না দিয়েই, দারুণ হাসিতে মেতে ওঠতে ভালোবাসত পল।

তার মানে এই নয়, ওর মধ্যে কোনো সিরিয়াস দিক ছিল না। নিজের পরিবারের সঙ্গে যদি গোলমেলে ব্যাপার থাকে আপনার, তাহলে পলের মাঝে নিজেকে এমন একজন মানুষের সঙ্গে বোঝাপড়ার অবস্থায় খুঁজে পাবেন, যার বিশ্বস্ততার কোনো সীমা নেই। আমাদের সঙ্গে কিংবা ওর অন্য যেকোনো বন্ধুর সঙ্গে যখনই কেউ কোনো গোলমাল বাঁধাত, পল তার সঙ্গে বিবাদ লাগিয়ে দিত। সে ছিল একটা যাচ্ছেতাই রকমের ‘খানকির ছেলে’; খুবই শক্ত নখের অধিকারী!

আমাদের সবার চেয়ে ওর বেড়ে ওঠা ছিল সবচেয়ে কঠিন; লস অ্যাঞ্জেলেসে বেড়ে উঠেছিল সে। নিজের সঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি অ্যাটিটিউট আইয়োয়ায় বয়ে এনেছিল; আর তা দিয়ে আমাদের সবাইকে ভরিয়ে তুলত। ক্লাউন’স ক্লাবের একটি শিল্পকর্ম ভেঙে ফেলেছিল বলে এক লোককে এক রাতে চুলের মুঠি ধরে টেনে আনতে দেখেছিলাম ওকে। এরপর ওই লোককে সে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল রাস্তায়; আর বলে দিয়েছিল, ওখানে যেন আর কোনোদিন তাকে না দেখে।


এই
গ্রহের
মতো বিশাল
আকারের হৃদয় ছিল
ওর

তবে অন্যের প্রয়োজনে নিজের গায়ের জামাটা আক্ষরিক অর্থেই খুলে দেওয়ার লোকও ছিল পল। আর এ কারণেই, বিনিময়ে অনেক মানুষই ওকে সুরক্ষা দিতে ছিল সদাপ্রস্তুত। পলের দরকার– এমন কিছু এনে দিয়ে ওকে সমর্থন জোগাতে এক পায়ে খাড়া, জগতজুড়ে এমন মানুষের সংখ্যা ছিল প্রচুর। নিজের বন্ধুদের খেয়াল রাখত সে; এমনকি সেজন্য নিজেকে যদি কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার দরকার পড়ত, তবু। আপনাকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য ওকে যদি কিছু সময়ের জন্য হাঁটু গেড়ে বসাও লাগত, তবু পল তা-ই করত। এই গ্রহের মতো বিশাল আকারের হৃদয় ছিল ওর।

মিউজিকের প্রসঙ্গ যখন আসত, তুখোড় কিছু হাজির করত পল। অন্যদের চেয়ে অনেক কিছুতেই আলাদা ছিল সে: ডিটেইলের প্রতি ওর মনোনিবেশ; হুকসের প্রতি ওর কানের সজাগতা; কোনো রিফের প্রতি ওর মনোভাব; একটি রিফের বিভিন্ন বৈচিত্র্য শোনার ব্যাপারে ওর সক্ষমতা– যার ফলে রিফ’টিকে কখনোই পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হতো না; গান কিংবা প্যাসেজের ব্যাপারে ওর দৃষ্টিকোণ; একটি গানের কোন জিনিসটি সেরা– সেটি বের করে আনার ক্ষেত্রে ওর একাগ্রতার জোর… এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া সম্ভব।

ডেড মেমোরিস। স্লিপনট। অফিসিয়াল মিউজিক ভিডিও

আপনার যখনই মনে হবে পলের কাছ থেকে সবটুকু শোনা হয়ে গেছে, তখনই সে একটি কার্ভবল দিয়ে আপনাকে আঘাত করে বসবে, মেলোডির ঠিক যেমন সংমিশ্রণের দেখা পাই আমরা ডেড মেমোরিস ট্র্যাকটিতে। যখনই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম, আমাদের সম্ভারে আর কোনো আইডিয়া অবশিষ্ট নেই, তখন সে কোরাস রিফ’টি হাজির করেছিল, অল হোপ ইজ গন ট্র্যাকে। নিজস্ব স্টাইল ও নিজস্ব জীবনপথ ছিল ওর; আর ওর নিজের কাজটি আদতে ভুল ছিল– এমন অনুভূতি ওকে দেওয়ার সাধ্য কারও ছিল না। দ্য ভাইরাস অব লাইফ ট্র্যাকটি ওর সঙ্গে যৌথভাবে লেখার কথা আমার মনে পড়ে। সে আমাকে বলেছিল, ‘রিফ যখন আসে, তখন তুমি কিছু একটা ধ্বংস করে দিতে চাও– ব্যাপারটা আমার বিশ্রি লাগছে।’


প্রচণ্ড
মাথাগরম
লোক
ছিল

পল’কে আমি দেবতা হিসেবে দেখাতে চাই না। সে একজন মানুষ ছিল। ছিল একেবারেই মনুষ্য ঝামেলা সম্পন্ন একজন মানুষ। প্রচণ্ড মাথাগরম লোক ছিল। ওকে শান্ত করতে বেশ সময় লেগে যেত। সে প্রায় সব সময়ই দেরি করে আসত। পল যে সময়মতো আসবে না, এটা আপনি ঘড়ি ধরে বলে দিতে পারতেন। ওর জন্য আমাদের সবাইকে অপেক্ষা করতে হতো; তাতে আমরা প্রত্যেকেই ক্রমাগত রাগতে থাকতাম, আর এক পর্যায়ে পৌঁছে যেতাম ওকে দেখামাত্রই ওর ওপর চিৎকার করে ওঠার অবস্থায়। তারপর সে যতক্ষণে দেখা দিত, ততক্ষণে রাগ গলে পানি হয়ে যেত আমাদের, আর আমরা হেসে ওঠতাম। একটা সিগারেট পুরোটা শেষ করার পর তবেই সে মাস্ক পরে নিত, আর আমরাও পরে নিতাম। আমাদের সবার মনে ততক্ষণে এমন এক ফুরফুরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ত, রাগের কথা ভুলেই যেতাম।

স্লিপনট
স্লিপনট

গাড়িচালক হিসেবে সে সম্ভবত দুনিয়ার সবচেয়ে বাজে। ওর সঙ্গে গাড়িতে ওঠতে আমরা কেউই কখনো চাইতাম না। গাড়ি চালানো অবস্থাতেই নিজের মিউজিক ডিভাইস ঠিকঠাক করত কিংবা সিগারেট ধরানোর চেষ্টা করত সে, আর ওই মুহূর্তে রাস্তার প্রতি মনোযোগ উবে যেত ওর। আর আচমকাই আপনি টের পেতেন, গাড়িটি দিব্যি ঘণ্টায় ৯০ মাইল গতিতে ছুটছে কিংবা চক্কর খাচ্ছে পাশের লেনে… কিংবা উভয়ই। আমার জানাশোনা মানুষদের মধ্যে ওর কাছেই জরিমানার রশিদ ছিল সবচেয়ে বেশি, এবং ওর লাইসেন্সই বাতিল হয়েছিল সবচেয়ে বেশিবার। তবু পল ছিল পলই; ঠিকই লাইলেন্স ফেরত নিয়ে আসতে পারত। এমন বহু পুলিশের দেখা আমি পেয়েছি, যারা পল’কে স্রেফ মৌখিকভাবে সতর্ক করেই ছেড়ে দিয়েছে, কোনো জরিমানা করেনি; আমার একেবারেই বিশ্বাস হতো না ওইসব মুহূর্তে কাউকে জরিমানা না করে ছাড়া সম্ভব। আর এ ছিল পলের চমৎকারিত্বের আরেকটি সাক্ষ্য।


একজন দারুণ, ত্রুটিপূর্ণ,
খুঁতযুক্তভাবে নিখুঁত
ভাই ছিল
পল

আমি আমার বন্ধুর এইসব কা-কীর্তি খুব মিস করি। ওর দরদ ছিল অদ্ভুত। ওর ব্যক্তিত্ব ছিল উষ্ণ ও অবিশ্বাস্য। ওর বুদ্ধিমত্তা ছিল ব্যাপক। যেভাবে সে কোনোকিছু নিয়ে কথা বলত কিংবা তর্ক করত, তা ছিল দেখার মতো সুন্দর। হ্যাঁ, ওর মধ্যে শয়তানিও ছিল প্রচুর; আর দুনিয়াকে দেখার ছিল উদার দৃষ্টি। একজন দারুণ, ত্রুটিপূর্ণ, খুঁতযুক্তভাবে নিখুঁত ভাই ছিল পল। ওর পক্ষে এক মুহূর্তেই আপনার সবচেয়ে সেরা বন্ধু ও আপনার সবচেয়ে জঘন্য শত্রুতে পরিণত হওয়া ছিল সম্ভব। তবে সে ছিল একজন মৌলিক মানুষ। সে ছিল আমার মৌলিক মানুষ।

জানি, আমার মতোই স্লিপনট-এর অন্য সদস্যরাও ওকে ভীষণ মিস করে। ওকে নিয়ে কথা বলাটা কখনো কখনো আমাদের জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়ে; কেননা, মনে হয়, এ যেন গতকালের ঘটনা। সম্ভবত এভাবেই আপনি আপনার জীবনে কোনো মানুষের প্রভাবকে বিচার করবেন: হারানোর বেদনা আপনার আবেগকে গ্রাস করে ফেলবে। আমাদের এই পাগলাটে ব্যান্ডে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা চালানো গুটিকয়েক মানুষের একজন ছিল পল। এর কারণ, ব্যান্ডকে ও আমাদেরকে সে অন্তর থেকে ভালোবাসত।

ওর শূন্যতা পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা আমরা করছি; কিন্তু সেই শূন্যতা এতই ব্যাপক, অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। প্রচুর মানুষের ওপর প্রচুর প্রভাব ফেলা এমন একজন মানুষকে হারানোর শূন্যতা আপনি কীভাবে পূরণ করতে পারবেন? পল এমনই একজন। এখনো এমন অনেকের সঙ্গেই আমার দেখা হয়, যাদেরকে সে সাহায্য করেছিল কিংবা যাদের জীবনে একটি নির্দিষ্ট পন্থায় রেখেছিল পরশ। আমার এই বন্ধু চিরতরে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওকে আমি পুরোপুরি বাহবা জানাতে পারিনি; অথচ এখন ওকে এ কথা জানাতে পারব না।

স্লিপনট
পল গ্রে

এমন একটি দিনও নেই, যেদিন ওর কথা আমার মনে পড়ে না। যখন রাস্তায় থাকি, যখন লাইভ শো করি, আমাদের একসঙ্গে কাটানো দিনগুলো মনে পড়ে যায়। যখন বাসায় থাকি, বাড়িটি ও ছবিগুলো মনে করিয়ে দেয়– কতগুলো দারুণ ও বাজে মুহূর্ত আমরা কাটিয়েছি একসঙ্গে। যখন মিউজিক শুনি, ওর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে ওর কিংবা আমার গাড়িতে বেজে ওঠা নতুন ও পুরনো সুরগুলো শোনার কথা। মনে হতে থাকে, যেন ছোট্ট বাচ্চাদের মতো আমরা দুজন কী দারুণভাবেই না একসঙ্গে মেতে ওঠতাম।

আমার ধারণা, ওর সম্পর্কে আমার সার্বিক স্মৃতিকে এভাবে লালন করা সম্ভব: ওর প্রাণশক্তি আর ওর রোমাঞ্চ। এমনকি যখন আপনি মিউজিকের কিংবা অন্য কোনো দিক থেকে ব্যান্ডটির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা ‘অনুভব’ করবেন না, তখন সে ছিল যেন দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা চিয়ারলিডার। ওর সঙ্গে একবার আলাপ করার পর আপনি ঠিকই লাফিয়ে ওঠবেন আবারও ব্যান্ডের হয়ে পারফর্ম করতে কিংবা ট্যুরে যেতে কিংবা রেকর্ডিংয়ে বসতে। যখনই আমার পরিশ্রান্ত লাগে, তখনই সে কথা মনে করি। মনে রাখি, এই জিনিসই আমি, সে ও স্লিপনট-এর বাকি সবাই মিলে একসঙ্গে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম।


প্যাশন,
মিউজিক,
ক্রোধ ও শিল্পে
চালিত এক ক্যারিয়ার
দাঁড় করিয়েছিলাম আমি ও সে

পল গ্রে’র সঙ্গে ১৩ বছর মিউজিক করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মানুষটির কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি; এখনো ওর আদর্শ ও পদ্ধতিগুলোকে কাজে লাগাই। ওর সঙ্গে দুনিয়াভ্রমণ চলতে থাকে আমার। তাতে এমন কিছুর দেখা পেয়ে যাই, যা অনেকেই তাদের একজীবনে দেখার আশাও করে না। প্যাশন, মিউজিক, ক্রোধ ও শিল্পে চালিত এক ক্যারিয়ার দাঁড় করিয়েছিলাম আমি ও সে। তাতে উত্থান-পতন ছিল ঠিকই, তবে এর প্রতিটি মুহূর্তই সে ভালোবাসত। জানি, আমিও বাসতাম।

ওর সঙ্গে যদি আর একটিবার কথা বলার সুযোগ পেতাম, সবকিছুই বলে দিতাম ওকে। সবচেয়ে বড় কথা, ওকে ধন্যবাদ জানাতাম। শুধু একজন অনুপ্রেরণাদায়ী ও ব্যান্ডমেট হিসেবেই নয়, বরং আমার বন্ধু হওয়ার কারণেও ধন্যবাদ দিতাম ওকে।

ওর প্রসঙ্গে একটি কথা আপনাদের উদ্দেশ্যে বলতে, নিজের ভালোবাসার মানুষকে আপনি চিরকালের জন্য কাছে পাবেন না। ব্যাপারটি কখনো কখনো বেশ কঠিন; কেননা, আমরা সবাই তো মানুষ, আর আমাদের এটাই নিয়তি। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনোকিছু কিংবা কাউকে কেড়ে নেওয়া না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা আসলেই বুঝতে পারি না সেটি কিংবা সে আমাদের জীবনে কী ছিল। আমি বুঝতে পারিনি; ভেবে নিয়েছিলাম, সারাজীবনই ওকে পাব। ওর সঙ্গে কাটানো যেকোনো মুহূর্ত যদি ফিরে পেতাম! যেকোনো একটা মুহূর্ত। ডিজনির সময়টি; মিউজিক সেশনগুলো; বাসে দীর্ঘ ভ্রমণ; গাড়িতে জ্যামিং; বার্বিকিউ কিংবা বিমানবন্দরে একসঙ্গে হেঁটে যাওয়া…।

স্লিপনট
কোরি টেইলর

পল’কে ভালোবাসি– সে যেমন ছিল এবং এখনো যেমন রয়েছে আমার কাছে– এ কথা ওকে বলার একটি মুহূর্তও সুযোগ যদি পেতাম, সেজন্য যেকোনো মূল্য দিতেই আমি রাজি। এই দুনিয়ায় আমার অনুতাপ খুবই সামান্য। আর এ হলো আমার সবচেয়ে বড় অনুতাপ।

এই দুনিয়া আর কোনোদিনই তোমার মতো আরেকজন খ্যাপা ‘মাদারচোদে’র দেখা পাবে না, পল গ্রে। তোমার মতো এমন দুর্দান্ত আর কোনো মানুষের সঙ্গে কখনোই পরিচয় ঘটবে না আমার।

এই দুনিয়া তোমাকে মিস করে, ভাই আমার। এই ব্যান্ড তোমাকে মিস করে। তোমার পরিবার ও বন্ধুরা তোমাকে মিস করে। তোমার বিদেহী আত্মা যদি আমাদের কথা শুনতে পায়, তবে জেনে রেখো, তোমাকে আমরা সবাই ভী-ষ-ণ ভালোবাসি।


সূত্র: কেরাং!; মিউজিক ম্যাগাজিন; যুক্তরাজ্য। ১৬ মে ২০১৫ সংখ্যা
Print Friendly, PDF & Email