চেস্টার বেনিংটনের শেষ দিনগুলো

0
39
চেস্টার বেনিংটন

লিখেছেন: কোরি গ্রো
অনুবাদ: রুদ্র আরিফ


২৬ মে ২০১৭, দুপুরে লিনকিন পার্ক ফ্রন্টম্যান চেস্টার বেনিংটন এমন এক পারফর্ম করেন, যেমনটা তার ক্যারিয়ারে আগে কখনো দেখা যায়নি। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সাউন্ডগার্ডেন ফ্রন্টম্যান ক্রিস কর্নেলকে সেদিন লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউড ফরেভার সিমেটারিতে চিরতরে শায়িত করা হয়। সেখানে জড়ো হওয়া শোতাহতদের উদ্দেশে বেনিংটন বলেন, ‘আমার নাম চেস্টার। ক্রিসের মতো একজন বন্ধু পাওয়া এবং তার পরিবারের সদস্য হিসেবে এখানে আমন্ত্রিত হতে পারা আমার জন্য ভীষণ সৌভাগ্যের।’

এরপর তিনি গাইতে শুরু করেন, হালেলুইয়া; গিটার বাজিয়ে তাকে সঙ্গ দেন লিনকিন পার্ক ব্যান্ডমেট ব্র্যাড ডেলসন।

রক মিউজিকের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যান্ডগুলোর একটির পাওয়ারহাউস ভোকাল হিসেবে ২০০০-এর দশকের শুরুতেই খ্যাতিমান হয়ে উঠতে থাকেন বেনিংটন। নিজের প্রকাশ তিনি ঘটিয়েছেন একটি রাগঝরা চিৎকারে। তবে সেদিন তার কণ্ঠ ছিল একদম আলাদা: বিলাপী, নিরানন্দ ও ভাঙা।

চেস্টার বেনিংটন
চেস্টার বেনিংটন। ২৬ মে ২০১৭, ক্রিস কর্নেলের শেষকৃত্যে গাইছেন ‘হালেলুইয়া’; পাশে ব্র্যাড ডেলসন

টুইটারেও কর্নেলের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছিলেন তিনি: ‘তোমার কণ্ঠে আনন্দ ও বেদনা, ক্রোধ ও ক্ষমাশীলতা, ভালোবাসা ও ঘৃণা একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমার ধারণা, আমাদের সবার বেলায়ই তা ঘটেছে। তুমি আমাকে সেটি বুঝতে সাহায্য করেছিলে।’

এর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই বেনিংটন নিজেও শোকের কারণ হয়ে উঠলেন। গলায় ফাঁস দিয়ে করলেন আত্মহনন। ২০ জুলাই সকালে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির পালোস ভার্দেস এস্টেটে নিজ বাসায় মৃতদেহ পাওয়া গেল তার; অথচ এর এক সপ্তাহ পরই, ২৯ তারিখে নর্থ আমেরিকান ট্যুরে বের হওয়ার সিডিউল ঠিক করা ছিল লিনকিন পার্ক-এর।

চেস্টার বেনিংটন। ফ্রন্টম্যান; লিনকিন পার্ক। জন্ম: ২০ মার্চ ১৯৭৬; মৃত্যু: ২০ জুলাই ২০১৭

৪১ বছর বয়সী এই গায়ক অ্যারিজোনায় নিজ স্ত্রী টালিন্ডা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন; কিন্তু ‘কাজ আছে’ বলে একাই ফিরেছিলেন ওই বাড়ি। (২০ জুলাই সকালে লিনকিন পার্ক-এর একটা ফটোশুটের সিডিউল ছিল।) ট্যাবলয়েড পত্রিকা টিএমজির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিনি যেখানে মারা যান, সেই বেডরুম থেকে একটি আংশিক খালি মদের বোতল জব্দ করেছে পুলিশ।

নেশাগ্রস্ততা ও অবসন্নতার সঙ্গে নিজ লড়াই নিয়ে সবসময়ই খোলামেলা কথা বলেছেন বেনিংটন; তবু এই আত্মহনন তার কাছের মানুষদের ভীষণ ধাক্কা দিয়েছিল। কর্নেলের স্মৃতিসভার পরের দিন বেনিংটন টুইটবার্তায় জানিয়েছিলেন, তিনি ‘ভীষণ সৃজনশীল অনুভব’ করছেন এবং লিখে ফেলেছেন ছয়টি নতুন গান। একই সময়ে তিনি তার বন্ধু ও গায়ক রেনে মাতা’কে বলেছিলেন, ‘আমাদের একসঙ্গে শক্ত হয়ে থাকতে হবে; বাঁচার জন্য অনেক কিছু রয়েছে আমাদের।’

ওয়ান মোর লাইট। স্টুডিও অ্যালবাম, লিনকিন পার্ক; ২০১৭

খুশি হওয়ার কারণও ছিল বেনিংটনের: মে মাসে প্রকাশ পাওয়া লিনকিন পার্ক-এর নতুন অ্যালবাম ওয়ান মোর লাইট জায়গা করে নিয়েছিল টপ চার্টগুলোর শীর্ষে, আর এ অ্যালবামের হেভি গানটি বেশ সমাদর পাচ্ছিল রক রেডিওতে। তাছাড়া, আরও ছিল লিনকিন পার্ক ট্যুর; সেখানে আসন্ন সেপ্টেম্বরে নিজের প্রাক-খ্যাত গ্রুঞ্জ ব্যান্ড গ্রে ডেজ-এর সঙ্গে বর্তমান ব্যান্ডের একটি পুনর্মিলনী ঘটানোর পরিকল্পনাও করে রেখেছিলেন তিনি।

গ্রে ডেজ ড্রামার এবং বেনিংটনের কিশোরকালের বন্ধু শন ডাউডেল বলেছেন, ‘সে তখন ছিল দুনিয়ার চূড়ায়।’ বলে রাখা ভালো, বেনিংটনের মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে তার সঙ্গে শেষবার কথা হয় ডাউডেলের।

(মিউজিশিয়ান) বিলি আইডলের সঙ্গে গিটার বাজানো স্টিভ স্টিভেন্স স্মৃতিচারণায় জানান, গত (২০১৬ সালের) অক্টোবরে সোবার মিউজিয়ানদের সংগঠন রক টু রিকভারির একটি অনুষ্ঠানের ব্যাকস্টেজে সবার সঙ্গে সম্ভাষণ বিনিময়কালে একটি নতুন পোষা কুকুরছানা সঙ্গে ছিল বেনিংটনের। ‘দরজায় গিয়ে সবাই যেন কুকুরটির সঙ্গে দেখা করে– তা নিশ্চিত করছিল সে। এ ছিল ভীষণ স্নেহজাগানিয়া ও ভীষণ চেস্টারধর্মী ব্যাপার,’ বলেন স্টিভেন্স।

জুন ও জুলাইয়ে লিনকিন পার্ক-এর ইউরোপিয়ান ট্যুরে বেনিংটন যেন তার ফর্মের চূড়ায় ছিলেন। ‘ব্যান্ডটিতে আমার সাড়ে ১৫ বছরের ইতিহাসে চেস্টারকে তখন সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও তাগড়া দেখেছি,’ বলেন গ্রুপটির ট্যুর ডিরেক্টর জিম ডিগবি। ‘স্বাস্থ্যগতভাবে সে সম্ভবত তার জীবনের সেরা অবস্থায় ছিল।’

মৃত্যুর দিনকয়েক আগে বেনিংটন স্টোন টেম্পল পাইলটস-এ তার ব্যান্ডমেট রবার্ট ডিলিওকে টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। (বলে রাখি, স্কট ওয়েইল্যান্ড ব্যান্ড ছেড়ে দিলে এখানে ফ্রন্টম্যান হিসেবে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গান গাইতেন বেনিংটন।) তার সেই টেক্সট মেসেজগুলো ছিল ‘প্রেমময়, ইতিবাচক, ভবিষ্যতের স্বপ্নভরা, বয়স বেড়ে যাওয়া ধরনের,’ স্মৃতিচারণায় জানান ডিলিও।

অন্যদিকে, মৃত্যুর আগের দিন গানস এন’ রোজেস-এর প্রাক্তন ড্রামার ম্যাট সোরাম’কে ই-মেইল করে বেনিংটন জানান, তাদের অল-স্টার কাভার ব্যান্ড কিংস অব ক্যাওস-এ আবারও পারফর্ম করতে চান।

তবে বেনিংটনের কয়েকজন বন্ধুর এখন মনে হয়, তারা বোধহয় এই গায়কের অন্ধকার দিকের লক্ষণগুলো ঠিকঠাক ধরতে পারেননি; নিজের অন্ধকার দিকটিকে তিনি ‘ডার্ক প্যাসেঞ্জার’ বলে ডাকতেন– টেলিভিশন সিরিজ ডেক্সটার-এর সিরিয়াল কিলার মুখ্যচরিত্রটির কাছ থেকে প্রেরণা নিয়ে জীবনের কাছে ধূর্তের মতো ফেরার প্রচেষ্টা বোঝাতে।

চেস্টার বেনিংটন

২০০৬ সালের দিকে রিহ্যাব বা মাদকনিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন বেনিংটন; এরপর তাকে বেশ ‘ভদ্র’ বলেই মনে হয়েছে। তবে বন্ধুদের দাবি, অ্যালকোহলে একেবারেই ব্ল্যাকআউট হয়ে গত আগস্টে টানা তিনদিন তিনি অনেকটাই অজ্ঞান ছিলেন; গত অক্টোবরেও তাকে মদপান করতে দেখা গেছে।

মৃত্যুর এক মাস আগে দীর্ঘদিনের বন্ধু রায়ান শাক’কে বেনিংটন বলেছিলেন, ছয় মাস ধরে ‘ভদ্র’ রয়েছেন তিনি; বেনিংটনের সাইড প্রজেক্ট ডেড বাই সানরাইজ-এ গিটার বাজাতেন রায়ান। অ্যালকোহলের সঙ্গে লড়াই চলছিল তার নিজেরও। তবে তাকেও বেনিংটন কিছু টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, যেগুলোতে অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত ছিল বলেই এখন মনে হয় শাকের: “মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে এক ঘণ্টার লড়াইয়ের বর্ণনা দিয়েছিল সে। এখন ব্যাপারটি ভাবতে গেলে শিউরে উঠি। সে আমাকে সবকিছু একদম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানাচ্ছিল– মদ খেতে ইচ্ছে করলে প্রথম এক ঘণ্টা সে যা যা করে: ‘আমি এটিকে প্রতিদিন আসলে ঘণ্টা-ঘণ্টা হিসেবে ভাগ করে নিয়েছি।’”

হ্যাভি। লিনকিন পার্ক

এ বিষয় নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে মিউজিক চয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন বেনিংটন। হেভি গানটির হিট হওয়ার নেপথ্য তাৎপর্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “জীবনে এক কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।… এমনকি যখন সবকিছু ঠিকঠাক থাকে, তখনো, সারাক্ষণই আমার ভীষণ অস্বস্তি হয়।… গানের শুরুর লাইন, ‘আই ডোন্ট লাইক মাই মাইন্ড রাইট নাউ’– আমার দিনে ২৪ ঘণ্টা এই অনুভূতিতেই কাটে। আমি যদি এরই মধ্যে আটকে পড়ে থাকি, তাহলে আমার পক্ষে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া খুবই কঠিন হবে। এমনটা হওয়া ঠিক নয়।”

শাকের বিশ্বাস, মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে ‘কিছু পরিমাণ মদ খেয়ে নিয়েছিল’ বেনিংটন। ‘কতটুকু খেয়েছিল, জানি না; তবে আপনি যখন একইসঙ্গে অ্যালকোহলিক ও নেশাগ্রস্ত এবং এর সঙ্গে লড়াইটি পুঙ্খাপুঙ্খভাবে কোনো বন্ধুকে জানাচ্ছেন, সে ক্ষেত্রে মদের পরিমাণে কিছু যায় আসে না। মুহূর্তেই মধ্যেই বোধবুদ্ধি হারাতে খুব বেশি মদের দরকার পড়বে না আপনার।’

কর্নেলের মৃত্যু বেনিংটনকে আত্মহননে প্রেরণা জুগিয়েছে– এমন জল্পনাতে খুব একটা পাত্তা দিতে নারাজ শাক ও ডাউডেল। যদিও দুই শিল্পীর মৃত্যু একইরকম– গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহনন; আবার কর্নেলের জন্মদিনেই আত্মহত্যা করেছেন বেনিংটন– এসবকে তারা [শাক ও ডাউডেল] স্রেফ কোয়েন্সিডেন্স হিসেবেই দেখেন। ‘এটি একটি অংশ হতে পারে হয়তো, তবে খুবই মামুলি অংশ,’ বলেন শাক। ‘আমার ধারণা, এটি অবচেতনে আপনার মাথায় ঢুকে যাওয়া স্রেফ আরেকটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এটি হয়তো আগুনের জ্বালানি জুগিয়েছে, কিন্তু আগুন তো আগে থেকেই জ্বলছিল।’

৬-৭ থেকে শুরু করে ১৩ বছর বয়স পর্যন্ত বয়সে বড় এক পুরুষ বন্ধুর যৌন নিপীড়ণের শিকার হতে হয়েছে চেস্টারকে। ‘আমাকে আচ্ছামতো পেটানো হতো; আর এমনসব কাজ করতে বাধ্য করা হতো– যেগুলো করতে মন চাইত না আমার,’ একবার বলেছেন তিনি। ‘এটি আমার আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দিয়েছিল।’


‘এত
বেশি মদ
খেতাম আমি,
যে, প্যান্টের মধ্যেই
হেগে দিতাম’

এই অভিজ্ঞতা বেনিংটনকে মাদক ও মদের দিকে ঠেলে দেয়। কিশোর বয়সে তিনি আফিম, অ্যাম্ফিটামাইনস, মারিজুয়ানা ও কোকেইন নিতেন। ‘এত বেশি মদ খেতাম আমি, যে, প্যান্টের মধ্যেই হেগে দিতাম,’ একবার বলেছেন তিনি। বেনিংটনের দাবি, মারাত্মক মাদক তিনি প্রথমবার নেন ১৯৯২ সালে, যখন স্থানীয় একটি গ্যাং এমন একটি জায়গায় আবির্ভূত হয়েছিল, যেখানে তিনি ও তার বন্ধুরা মাদকের প্রভাবে এত বেশি নেশাগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে, ওই গ্যাংকে পিটিয়ে তাদের কাছে থাকা সবকিছু ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।

নিজ অভিজ্ঞতাকে লিনকিন পার্ক-এর গানে ছড়িয়ে দিয়েছেন বেনিংটন, যেখানে তার আত্মা বের হয়ে আসার মতো চিৎকারের সঙ্গে মাইক শিনোডার র‍্যাপিং এবং ব্যান্ডের বাজনা এমন এক সাউন্ড সৃষ্টি করেছে, যা ২০০০-এর দশকের বেশির ভাগ সময়জুড়েই পপ চার্টগুলোতে করেছে রাজত্ব। ‘স্বতন্ত্র এক কণ্ঠস্বর ছিল তার, একইসঙ্গে নিস্তেজ ও হিংস্র,’ বলেছেন অভিনেতা ও ৩০ সেকেন্ডস টু মার্স ফ্রন্টম্যান জ্যারেড লেটো, যার সঙ্গে বেনিংটনের পরিচয় ঘটে ২০০০-এর দশকের ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে (২০১৪ সালে লিনকিন পার্ক-এর সঙ্গে ট্যুরও করেছে ৩০ সেকেন্ডস টু মার্স)। ‘যেন তার দুই কাঁধে বসে রয়েছে ফেরেশতা ও শয়তান। যখন সে গান গায়, ওই দুটি অস্তিত্বের মধ্যকার চাপা উত্তেজনা আপনি অনুভব করতে পারবেন। আমার ধারণা, এ কারণেই তার মিউজিকের সঙ্গে এত বেশি মানুষ নিজেদের সম্পৃক্ততা অনুভব করতে পারত; কেননা, ওই দুটি সত্তার মধ্যকার ভারসাম্য অর্জন করতে পেরেছিল সে।’

ক্রাউলিং। লিনকিন পার্ক

বেনিংটনের বেশিরভাগ গানই শিনোডার সঙ্গে যৌথভাবে লেখা। সেই গানগুলো কিছু আবেগাত্মক বিষয়ের মাধ্যমে তরুণদের লড়াইয়ের অ্যানথেমে পরিণত হয়েছিল। ‘যেমন ধরুন, ক্রাউলিংই সম্ভবত গানের কথা বিবেচনায় লিনকিন পার্ক-এর জন্য আমার লেখা সবচেয়ে আক্ষরিক গান,’ ব্যান্ডের মেগাসেলিং অভিষেক অ্যালবাম, ২০০০ সালের হাইব্রিড থিওরির ওই সিঙ্গেল প্রসঙ্গে বলেছিলেন বেনিংটন। ‘মাদক ও মদের প্রশ্নে নিজের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার অনুভূতি ফুটে রয়েছে এ গানে।’

তাকে যারা চিনতেন, তারা বলেন, বেনিংটন চাইতেন না তার লড়াইকে তার ব্যক্তিত্বের বিবেচনায় চিহ্নিত করা হোক। ক্ষণে ক্ষণে তিনি হয়ে উঠতেন একজন মজাদার তরুণ (স্ক্যাটোলজিক্যাল হিউমারের ভক্ত ছিলেন তিনি), আবার পরক্ষণেই হয়ে যেতেন গভীর রকমের সংবেদনশীল ব্যক্তি: একবার ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে কৌতুক করায় মঞ্চেই বেনিংটনের একের পর এক লাথি হজম করার স্মৃতিচারণা করেছেন শাক।

লিনকিন পার্ক-এর হয়ে কনসার্ট ওপেন করা ব্যান্ডগুলোকে বেনিংটন কখনো কখনো বলতেন, ‘পরেরবার আমরা তোমাদের হয়ে ওপেন করব।’ সোরামের মনে পড়ে, ক্রিসমাসের ঠিক পরপর অনুষ্ঠিত এক গিগে কী করে তিনি কিংস অব ক্যাওস সদস্যদের এমন কথা বলেছিলেন। শিকাগোতে ১২ ঘণ্টার ওপর শুয়ে কাটিয়েছিলেন বেনিংটন ও ডিলিও; আর ওই হলিডে সিজনে বাড়ি থেকে তাদের বের করতে গিয়ে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন এই ড্রামার। “ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের আমি বলেছিলাম, ‘ক্ষমা করো। খুবই দুঃখিত আমি। এতদূর যেতে রাজি হয়েছ বলে তোমাদের অনেক ধন্যবাদ,’” বলেন সোরাম। “আর চিরচেনা চেস্টার স্টাইলে ফিরতি ই-মেইলে সে জবাব দিয়েছিল, ‘অ্যানিটাইম, ব্রো।’ কোনো নখরামি নয়; কিছুই নয়।”

বাড়িতে, নিজের ছয় সন্তানের মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলেন বেনিংটন। তিনি প্রথম বাবা হন ২০ বছর বয়সে; প্রথম বিয়ে করেন ১৯৯৬ সালে। ভয়াবহ রকমের গ্যাঞ্জামপূর্ণ এক বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্কের ইতি ঘটে; সে সময় তিনি আবারও বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন; ‘আমি গলা পর্যন্ত মদ খেয়েছিলাম, যেন বাড়ি থেকে বের হওয়ার, কোনো কাজ করার শক্তি না থাকে শরীরে,’ স্মৃতিচারণায় বলে গেছেন তিনি। ‘নিজেকে চেয়েছিলাম মেরে ফেলতে।’

চেস্টার বেনিংটন। স্ত্রী টালিন্ডা ও সন্তানদের সঙ্গে

২০০৫ সালে টালিন্ডাকে বিয়ে করেন তিনি। এই দম্পতির এক ছেলে ও যমজ মেয়ে। বেনিংটনের বাসায় এক রাতে নৈশভোজের স্মৃতিচারণ করেছেন লেটো। ‘বাড়িতে ঢুকতেই দেখি যেন লোকারণ্য; এত বড় পরিবার আমি আগে কখনো দেখিনি,’ বলেন তিনি। ‘তার এত চমৎকার ও সমৃদ্ধশালী পারিবারিক জীবন রয়েছে, বিশেষত এত অল্প বয়সেই, আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। তার মধ্যে এর রেশ খুব একটা দেখিনি; কেননা, রোডেই [ট্যুরে] বেশি সময় কাটাতে হয়েছে তাকে।’

‘নিজের ছয় সন্তানের গল্প তাড়িয়ে তাড়িয়ে বলত সে সবসময়; তখন তার মুখে হাসির দৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ত; এই দ্বৈত ভূমিকায় বাবা হিসেবে কী ধরনের দুর্ভোগ তাকে পোহাতে হতো, তাতে কিচ্ছু যেন যেত-আসত না তার,’ বলেন জেডজেড টপ গিটারিস্ট ও প্রাইমারি লিড ভোকাল বিলি গিবন্স– যিনি গত বছর [২০১৬] কিংস অব ক্যাওস-এর হয়ে বেনিংটনের সঙ্গে ট্যুর করেছেন। ‘তার ট্যাটু-পার্লার বিজনেস ছিল আরেকটি দিক। লাস ভেগাস শপের জন্য সে আমাকে সিলভার জুয়েলারির ডিজাইন করে দিয়েছিল– যেখানে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডাবাজি করে কাটিয়েছি। সত্যিকারের এক আকর্ষণীয় সত্তা ছিল সে।’

জুলাইয়ের শেষ দিকে, লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ঘরোয়া শেষকৃত্য আয়োজনে বেনিংটনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন শাক; সেখানে লিনকিন পার্ক-এর জো হান ও শিনোদাকে পাশে নিয়ে একটি প্রশংসাপত্র পড়ে শুনিয়েছেন তিনি। (এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, এই লেখা লেখাকালে লিনকিন পার্ক-এর ওই সদস্যদের এবং টালিন্ডা বেনিংটনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্য যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি।)

চেস্টার বেনিংটন। কোনো এক কনসার্টে

বেনিংটনের মৃত্যু এখনো তার ভক্তদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এ খবর জানার পর তারা হতভম্ব হয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সুইসাইড প্রিভেনশন লাইফলাইন জানিয়েছে, ওই মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের পর তাদের হটলাইটে দিনপ্রতি ফোনকল আসা বেড়ে ১৪ শতাংশ।

বেনিংটনের মৃত্যুর ১০ দিন পর তার বাড়িটি একটি অস্থায়ী ৬ ফুটের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। নির্দিষ্ট জায়গায় এসে ফুল, ড্রয়িং, সাইন, গিটার পিক রেখে যান ভক্তরা। তারা যেন ‘সীমা’ পার না হন, সেজন্য বাড়ির বাইরে সার্বক্ষণিক থাকে পুলিশ প্রহরা।

মৃত্যুর খবরটা ‘যখন জানতে পারলাম, তখন আমি একটি জাদুঘরে; শোনামাত্রই আমার চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসছিল,’ বলেন ১৯ বছর বয়সী ভক্ত ব্রায়ানা ইয়াহ-ডিয়াজ। ‘যেন আমার কাছ থেকে নিজ শৈশবের একটা অংশ চলে গেল। আমার ভেতরে থাকা ছোট্ট বালিকার তখন (বেনিংটনের বাসার) সামনে এসে (তার প্রতি) শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো ছাড়া উপায় ছিল না।… তার প্রভাব আমি সবসময় মনে রাখব।’


‘প্রিয়
চেস্টার
বেনিংটন,
তুমি আমাদের
বহু মানুষের জীবন
বাঁচিয়েছ, অথচ তোমাকে
বাঁচাতে পারলাম না
আমরা– এ
বড় কষ্টের’

বেনিংটনের বাড়ির বাইরে রাখা একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে, ‘ওড়ো, মুক্তভাবে উড়ে বেড়াও! টেক্সাস থেকে তোমার প্রতি প্রাণখোলা ভালোবাসা।’ আরেকটিতে লেখা, ‘প্রিয় চেস্টার বেনিংটন, তুমি আমাদের বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছ, অথচ তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না আমরা– এ বড় কষ্টের…।’


কোরি গ্রো: সাংবাদিক; যুক্তরাষ্ট্র
সূত্র: রোলিং স্টোন; মাসিক ম্যাগাজিন, যুক্তরাষ্ট্র। ৪ আগস্ট ২০১৭
Print Friendly, PDF & Email
সম্পাদক : লালগান । ঢাকা, বাংলাদেশ।। মিউজিকের বই [অনুবাদ] : আমার জন লেনন [মূল : সিনথিয়া লেনন] ।। কবিতার বই : ওপেন এয়ার কনসার্টের কবিতা; র‍্যাম্পমডেলের বাথটাবে অন্ধ কচ্ছপ; হাড়ের গ্যারেজ; মেনিকিনের লাল ইতিহাস ।। সিনেমার বই [সম্পাদনা/অনুবাদ] : ফিল্মমেকারের ভাষা [৪ খণ্ড : ইরান, লাতিন, আফ্রিকা, কোরিয়া]; ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার; তারকোভস্কির ডায়েরি; স্মৃতির তারকোভস্কি; হিচকক-ত্রুফো কথোপকথন; কুরোসাওয়ার আত্মজীবনী; আন্তোনিওনির সিনে-জগত; কিয়ারোস্তামির সিনে-রাস্তা; সিনেঅলা [৩ খণ্ড]; বার্গম্যান/বারিমন; ডেভিড লিঞ্চের নোটবুক; ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ফেদেরিকো ফেল্লিনি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার ক্রিস্তফ কিয়েস্লোফস্কি; সাক্ষাৎ ফিল্মমেকার চান্তাল আকেরমান

জবাব দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here